মঙ্গলবার, ১৬ আগস্ট ২০২২, ১ ভাদ্র ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

যে কারণে ওঠানামা করে তেলের দাম

আপডেট : ১৫ জানুয়ারি ২০২২, ০৮:২৬

প্রচেষ্টার তো আর কমতি নেই। যে যার মতো করে যথাসাধ্য পরিশ্রম করে যাচ্ছে। সবুজ জ্বালানির উৎস খুঁজতে গিয়ে সবাই ব্যস্ত। লক্ষ্য একটাই—জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতিনির্ভরতা কমিয়ে আনা। প্রচলিত জ্বালানি তেল ফুরিয়ে গেলে কী হবে, ভবিষ্যতের এই অজানা আশঙ্কা থেকেই এর বিকল্প অনুসন্ধান করা হচ্ছে হন্যে হয়ে। প্রথম বাণিজ্যিক তেলকূপ খনন করা হয়েছিল আজারবাইজানের অ্যাশেরন উপদ্বীপে এবং সেটি ১৮৬৭ সালে। এর ১২ বছর পর অর্থাৎ ১৮৫৯ সালে পেনিসিলভেনিয়ার টাইটাসভিল-এ উদ্দেশ্যমূলভাবে তেলকূপ খননের মাধ্যমে সূচিত হয়েছিল মার্কিন তেলশিল্প। ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্রে খননকাজ শুরু হলেও লক্ষ্যবস্ত্ত ছিল লবণজল। সব বিবেচনাতেই তেল আবিষ্কারের ঘটনাটা ছিল নিছক আকস্মিক।

গোড়ায় কেরোসিন ও প্রদীপের তেলের চাহিদা ছিল সবচেয়ে বেশি। ব্যাপক উৎপাদনক্ষম সর্বপ্রথম বাণিজ্যিক কূপটি খনন করা হয়েছিল ১৯০১ সালে; দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় টেক্সাসের স্পিন্ডেলটপ নামক স্থানে। সেখানে প্রতিদিন উৎপাদিত হতো ১ লাখ ব্যারেলেরও বেশি তেল। এর সমপরিমাণ তেল উৎপাদন করতে পারত না যুক্তরাষ্ট্রের বাকি সব কূপ মিলেও। অনেকেই যুক্তি দেখান যে, ১৯০১ সালের ঐ দিনটিতেই আধুনিক তেলের যুগ সূচিত হয়েছিল, যেদিন বিশ্বের প্রধান জ্বালানি উৎস হিসেবে কয়লার স্থানটি দখল করে নিয়েছিল তেল। জ্বালানিতে তেলের ব্যবহার অব্যাহত থাকাতেই বিশ্ব জুড়ে আজ এ পণ্যটির এত বিশাল চাহিদা। অর্থনীতি সম্পর্কে ন্যূনতম খোঁজখবর রাখা যে কারো মনেই প্রশ্ন জাগতে পারে, তাহলে বিপুল চাহিদার এই তরল বস্তুটির মূল্য নির্ধারিত হয় কীভাবে? উচ্চ চাহিদার বৈশ্বিক পণ্য বনে যাওয়ার কারণেই এর দামের ওঠানামায় পৃথিবীর অর্থনীতিতে বিশাল প্রভাব পড়ে, যেটি কি না নিঃসন্দেহে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তেলের মূল্যে প্রভাব ফেলা দুটি প্রধান নিয়ামক হচ্ছে সরবরাহ ও চাহিদা এবং বাজার আচরণ।

চাহিদা ও সরবরাহের ধারণাটি একেবারে সোজাসাপ্টা। যখন চাহিদা বাড়ে (কিংবা সরবরাহ কমে যায়) তখন মূল্য বেড়ে যায়। অন্যদিকে চাহিদা কমে গেলে (অথবা সরবরাহ বেড়ে গেলে) দাম পড়ে যায়। এটি জলবৎ তরলং। কিন্তু নয়, তেলের প্রশ্নে অর্থনীতির এ মৌলিক নিয়ম হোঁচট খায়। জোগান ও সরবরাহের ভিত্তিতে এখানে দামের অঙ্ক মেলানো দুষ্কর। আন্তর্জাতিক তেলের বাজারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবারই এ বিষয়টি জানা যে, নির্দিষ্ট এ পণ্যটির প্রকৃতপক্ষে মূল্য নির্ধারিত হয় ফিউচার্স মার্কেটে। সহজভাবে বুঝতে চাইলে এটি বস্তুত একটি নিলাম বাজার। যেখানে অংশগ্রহণকারীরা পণ্য কেনাবেচা করে। ভবিষ্যৎ চুক্তিও এখানে সম্পন্ন হয়। আর ফিউচার্স কন্ট্রাক্ট হচ্ছে একটি বাধ্যতামূলক চুক্তি, যেটি একজনকে ভবিষ্যতে পূর্বনির্ধারিত দিনে এবং পূর্বনির্ধারিত মূল্যে ব্যারেলপ্রতি তেল কেনার ক্ষমতা প্রদান করে। এখানে ক্রেতা ও বিক্রেতাকে সুনির্দিষ্ট তারিখে অবশ্যই চুক্তির শর্তাদি মানতে হবে।

ফিউচার্স ব্যবসায়ী আবার দুই প্রকার—হেজার ও স্পেকুলেটর। স্পেকুলেটর বা অনুমানকারীরা ঝুঁকি গ্রহণ করে। ফিউচার্স মার্কেটে মূল্যের পরিবর্তন থেকে তারা লাভ করতে চায়। হেজার ফিউচার্স মার্কেটকে ব্যবহার করে মূল্য পরিবর্তনের বিপক্ষে নিজেকে সুরক্ষিত রেখে ঝুঁকি এড়ানোর কাজে। স্পেকুলেটরের কাজ হচ্ছে শুধু মূল্যের গতি অনুমান করা। কার্যত তার পণ্যটি কেনার কোনো ইচ্ছে থাকে না। শিকাগো মার্কেন্টাইল এক্সচেঞ্জের তথ্যানুসারে ভবিষ্যৎ বাণিজ্যেও বেশির ভাগ সম্পন্ন হয় স্পেকুলেটরদের দ্বারা। যে কারণে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে ভবিষ্যৎ চুক্তির ক্রেতাদের দখল ৩ শতাংশের কম।

তেলের বাজার নির্ধারণের আরেকটি বড় নিয়ামক হচ্ছে আশঙ্কা। ভবিষ্যতের একটা পর্যায়ে তেলের চাহিদা নাটকীয়ভাবে বেড়ে যাবে এমন খবর ছড়িয়ে পড়লে তেলের বর্তমান বাজার দরও ওপর দিকে উঠতে থাকে দুরন্ত গতিতে। আর এ সুযোগেই ব্যবসার ধান্ধা খুঁজে নেয় হেজার ও স্পেকুলেটররা। বিপরীত চিত্রটাও দেখা যায়, নিকট ভবিষ্যতেই তেলের চাহিদা অনেক কমে যাবে, এমন খবরে তেলের বর্তমান বাজার দর পড়তে থাকে লাফিয়ে লাফিয়ে। উভয় পরিস্থিতিতেই ফিউচার্স কন্ট্রাক্টের হিড়িক পড়ে। তার মানে দামের ওঠানামা বাজার মনস্তত্ত্বের পরও বিশেষভাবে নির্ভর করে। আরো বহুবিধ কারণ উল্লেখ করা যায়।

২০২০ সালের বসন্তে অর্থনৈতিক মন্দার কারণে তেলের দাম পড়ে যাওয়াকে ওপেক এবং তার মিত্ররা বাজার স্থিতিশীল রাখতে ঐতিহাসিক উৎপাদন কর্তনে রাজি হওয়া সত্ত্বেও দাম নেমে গিয়েছিল ২০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে। এর প্রধান কারণ হচ্ছে—চুক্তিতে সবাই স্বাক্ষর করলেও দেখা যায় কেউ কেউ একটু বেশি লাভের আশায় লুকিয়েও অনেক দেশ তেল বিক্রি করে দেয়।

তেলের সঙ্গে শোধনাগারের বিষয়টিও বিশেষভাবে জড়িত। অপরিশোধিত তেল দিয়ে তো আর কাজ চালানো যায় না। শোধনাগারের সংখ্যার সঙ্গে তেলের দামের রয়েছে গভীর সম্পর্ক। একটি উদাহরণ দিলেও বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয়ে যাবে। যেমন, যুক্তরাষ্ট্র আগে প্রতি এক দশকে একটি শোধনাগার নির্মাণ করত। কিন্তু ১৯৭০-এর দশক থেকে এই গতিতে ভাটা পড়ে। তাছাড়া পণ্যের মূল্য চক্রও তেলের মূল্যে যথেষ্ট প্রভাব ফেলে।

ইনভেস্টোপিডিয়া অনুসারে

ইত্তেফাক/এএইচপি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

৯১ শতাংশ এসএমই গ্রাহক ব্যাংক ঋণের সুবিধাবঞ্চিত: গবেষণা

বর্তমান সংকট রোগের উপসর্গ মাত্র: দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য

খোলাবাজারে ডলার ১২০ টাকায় উঠেছে

কর ফাঁকি ও অর্থপাচার রোধে ‘কমন রিপোর্টিং স্ট্যান্ডার্ড’ অবলম্বন করুন: টিআইবি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

জুলাইয়ে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ১৫ শতাংশ

নতুন নতুন শর্ত আরোপ: অর্ধেকের বেশি কমেছে সঞ্চয়পত্র বিক্রি 

ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের আরো ৪০০ কোটি টাকা ঋণ দেবে এসএমই ফাউন্ডেশন

বিশ্ব অর্থনীতি নিয়ে আরও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে : আইএমএফ