যুদ্ধ, প্রাক-যুদ্ধ কিংবা চরম বৈরিতায় অর্থনীতি যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তা নতুন করে বলা শুধুমাত্র বাহুল্যই নয়, স্রেফ অপ্রয়োজনীয়। আধুনিক বিশ্বে এসব পরিস্থিতিতে বিবাদমান পক্ষগুলোর মাঝে চলমান বাণিজ্য হোঁচট খায়, তাতে লাগতে শুরু করে ভাটার টান। প্রতিবেশীর পাশাপাশি চির প্রতিদ্বন্দ্বী ভারত ও পাকিস্তানের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। পালওয়ামা আক্রমণের পর ভারত আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ের মাধ্যমে সন্ত্রাস কারবারী হিসেবে চিহ্নিত করে পাকিস্তানকে শুধুমাত্র রুদ্ধ করার চেষ্টাতেই থেমে থাকছে না, মোদি সরকার নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর শুল্ক বৃদ্ধির মাধ্যমে প্রতিপক্ষের অর্থনীতিকে অসমর্থ করে তোলার চেষ্টাটাও চালিয়ে যাচ্ছেন। আর এতে এমন ভাবার কারণ নেই যে, পাকিস্তান বসে আছে সুবোধ বালকের মতো। বিপক্ষকে ঘায়েল করতে তারা বেছে নিয়েছে ভিন্ন কৌশল।
পাকিস্তানের ব্যবসায়ীদের কপালে এরইমধ্যে বেশ বড় আকারের ভাঁজ পড়তে শুরু করেছে। পাকিস্তান থেকে আমদানিকৃত সকল পণ্যের ওপর ভারত ২০০ শতাংশেরও বেশি বহিঃশুল্ক আরোপ করেছে। ফলে ভারতে তাজা ফল, সিমেন্ট ও সুতা রপ্তানি করা ব্যবসায়ীরা মূলত পড়েছে মহাবিপদে। উচ্চ বহিঃশুল্কের কারণে ভারতের সঙ্গে তাদের রপ্তানি কার্যক্রমই বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। ২০১৭-১৮ সালে ভারতে রপ্তানিকৃত পাকিস্তানি পণ্যের মূল্য ছিল৩,৪৮২.৩ কোটি রুপি। বহিঃশুল্ক বৃদ্ধি শেষপর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হবে ক্ষদ্র ব্যবসায়ীরা। বিশেষজ্ঞদের অভিমত, অস্বাভাবিক ধরনের বহিঃশুল্ক বৃদ্ধির ঢেউয়ে এরইমধ্যে তারা দোল খাচ্ছে।
ভারতীয় সিমেন্ট আমদানিকারকরা ইতোমধ্যে পাকিস্তানি ব্যবসায়দেরকে দেওয়া অনেক অর্ডার বাতিল করেছে। পাকিস্তান-ভিত্তিক পত্রিকা ডেইলি ডন জানিয়েছে, ভারতীয় সিমেন্ট আমদানিকারকরা বহিঃশুল্ক বৃদ্ধির পর পাকিস্তানি রপ্তানিকারকদের কন্টেইনার ফিরিয়ে নেওয়ার কথা বলেছে। একজন আমদানিকারকের উদ্ধৃতি দিয়ে পত্রিকায় লেখা হয়েছে, ‘সিমেন্টভর্তি প্রায় ছয়শ থেকে আটশ কন্টেইনার করাচি বন্দরে আটকে রয়েছে। আরো অসংখ্য কন্টেইনার গভীর সমুদ্রে রয়েছে কলম্বো ও দুবাইয়ের উদ্দেশ্যে। পাকিস্তান ও ভারত, উভয় দেশের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনায় সোজা কথায় চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন পাকিস্তানের সিমেন্ট ব্যবসায়ীরা। ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশংকা পর্যন্ত করছেন তারা। ভারতে পাকিস্তানি সিমেন্টের চাহিদা তুঙ্গে উঠেছিল মোদি সরকার বন্যা-আক্রাস্ত কেরালার জন্য ৫ হাজার কোটি টাকার পুনর্বাসন প্রকল্প ঘোষণার পর থেকেই। পাকিস্তান বর্তমানে বছরে ১১২.৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের ফলমূল রপ্তানি করে ভারতে। প্রতিবেশী এই রাষ্ট্রে সিমেন্ট বিভিন্ন প্রকার রাসায়নিক, সার, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য পাঠিয়ে বছরে আয় করে যথাক্রমে ৭৮.৩, ৬০.৪ ও ৩৯.৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। তবে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০১৪-১৫ সাল থেকেই এই দুই দেশের মধ্যে আমদানি ও রপ্তানি কমছে। কেবল আট্টারি-ওয়াগা সীমান্ত দিয়েই ২০১৪-১৫ সালে ভারত ২১১৭ কোটি রুপির পণ্য রপ্তানি করেছিল। ২০১৮-১৯ এ তা নেমে আসে ১৩১ কোটি রুপিতে। একই সীমান্ত দিয়ে তাদের আমদানিও কমেছে। ২০১৪-১৫ সালে আমদানিকৃত পণ্যের মূল্য ছিল ২,৩৬৮ কোটি রুপি। সেখানে ২০১৮-১৯ এ তা নেমে আসে মাত্র ৭২১ কোটি রুপিতে। পাকিস্তান ওয়াগা সীমান্ত দিয়ে ১৩৮ রকমের পণ্য আমদানির অনুমতি দেয়।
কেবলমাত্র আমদানিই নয়, ভারতীয় ব্যবসায়ীরা পাকিস্তানে তাদের পণ্য রপ্তানিও বন্ধ রেখেছে। মধ্যপ্রদেশের ঝাবুয়া জেলার পেটলাবাদ তেহসিল নামক স্থানের চাষীরা ইমরান খানের দেশে টমেটো রপ্তানি না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পাকিস্তানি ব্যবসায়ীদের কাছে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের পাশাপাশি খুবই লাভজনক একটি পণ্য হচ্ছে টমেটো। ভারতের টমেটো এনে তারা তিনগুণ লাভ করতে পারে। একসময় পাকিস্তানে টমেটো রপ্তানির জন্য পেটলাবাদকে বলা হতো ‘তীর্থস্থান’। কিন্তু ২০১৬ সালে উরি আক্রমণের পর থেকেই পেটলাবাদের টমেটোর পাকিস্তান যাত্রা ক্রমান্বয়ে কমতে থাকে।
ভারত ও পাকিস্তানের বাণিজ্যিক ভারসাম্য এখন পর্যন্ত পাকিস্তানের অনুকূলে। পালওয়ামা আক্রমণের পর ভারত পাকিস্তানকে দেওয়া এমএফএন (মোস্ট ফেভারড ন্যাশন) স্ট্যাটাস উঠিয়ে দেয়। যার ফলশ্রুতিতেই সহ্যসীমার বাইরে বহিঃশুল্ক আরোপ করতে পারেছে। ডব্লুটিও’র প্রতিটি সদস্য একে অপরকে এমএফএন সুুবিধা দিতে বাধ্য। কিন্তু মজার বিষয় হচ্ছে, ভারত ১৯৯৬ সালে পাকিস্তানকে এমএফএন সুবিধা প্রদান করলেও ডব্লুটিও’কে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে আজও ভারতকে সে সুবিধা প্রদানে রাজি হয়নি পাকিস্তান।
—বিজনেস টুডে অনুসরণে
