জলাভূমি হ্রাসের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ ও সংরক্ষণে জাতিসংঘের আয়োজনে কাস্মিয়ান সাগরবর্তী ইরানের রামসার শহরে ১৯৭১ সালের ২ ফেব্রুয়ারি একটি কনভেনশন অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৯৭ সালের ২ ফেব্রুয়ারি থেকে বিশ্ব জলাভূমি দিবস পালিত হয়ে আসছে। জলাভূমি হ্রাসের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া এবং জলাভূমিতে উদ্ভিদ ও প্রাণীকুলের প্রতিবেশ ব্যবস্থা যথাযথভাবে সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় সচেতনতা ও উদ্যোগ গড়ে তোলার উদ্দেশ্যেই দিবসটি বিশ্বব্যাপী পালিত হয়।
বাংলাদেশ প্রকৃত অর্থে নদ-নদী, খাল-বিল ও হাওড়-বাঁওড় সমৃদ্ধ একটি দেশ। এখানে জলাভূমির সংখ্যা ৩৭৩। যার মোট আয়তন ৮,৫৮,৪৬০ হেক্টর। এই জলাভূমির রয়েছে বিশেষ গুরুত্ব। বাংলাদেশের সুন্দরবন ও টাঙ্গুয়ার হাওরের জলাভূমি আন্তর্জাতিক মর্যাদা লাভ করেছে। জলাভূমি আমাদের দেশের জীববৈচিত্র্য, মত্স্য, জলজ উদ্ভিদ, ফল ও খাদ্য শস্যের আধার। নিছক মাছের আবাসস্থল নয়, এখানে জন্মানো জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণী পরিবেশ সুরক্ষায় ভূমিকা রাখছে। আমাদের কৃষিকাজ জলাভূমির পানির ওপর নির্ভরশীল। জলাভূমির পানি শোধনাগার, মত্স্য ও প্রাণীকুলের আবাসস্থল। জলাভূমি ভূ-গর্ভের প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করে। কিন্তু দ্রুত নগরায়নে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে আমাদের দেশের অধিকাংশ জলাভূমি। আর শহরের জলাভূমি ভরাটের মাত্রা সবচেয়ে বেশি।
জলাভূমির অপব্যবহারে ইতোমধ্যে অনেক জলাভূমি হারিয়ে গেছে। বিকাশমান নগরায়ন ও শিল্পায়নের কারণে জলাভূমিগুলোর শ্রেণি পরিবর্তন হয়ে আবাসিক ও বাণিজ্যিক অবকঠামোয় রূপান্তরিত হচ্ছে। বাংলাদেশের সংবিধানের ১৮ (ক) অনুচ্ছেদে জলাভূমি সংরক্ষণ ও দেখাশোনার জন্য ভিন্ন ভিন্ন কর্তৃপক্ষের ওপর দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে। কিন্তু দিনের পর দিন জলাভূমি মার্কেট, প্রতিষ্ঠান ও আবাসিক হাউজিং প্রকল্পে রূপ নিচ্ছে। এখানে সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত দপ্তর বা সংস্থাগুলোর দায়সারা দায়িত্ব পালনের কারণে গ্রাম ও শহরে বিদ্যমান জলাভূমি প্রায় হারিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া উন্মুক্ত প্রাকৃতিক জলাশয়গুলোতে নিয়ন্ত্রণ বাঁধ দেওয়ার কারণে সেগুলো ডোবা ও নালায় পরিণত হচ্ছে। ফলে মত্স্য ও জলজ প্রাণীর বিচারণ ও প্রজনন ক্ষেত্র সংকুচিত হয়ে পরিবেশের ওপর ফেলছে বিরূপ প্রভাব। বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচ খালের মতো অবকাঠামোর জন্য গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র পাবন ভূমিতে প্রায় ২ কোটি হেক্টর জলাভূমি বিলীন হয়ে গেছে।
১৯ শতকের শুরুতে যে চলনবিলের আয়তন ছিল ১০৮৫ বর্গকিলোমিটার, ১৯০৯ সালে এসে দাঁড়ায় ৩৬৮ বর্গকিলোমিটারে। বর্তমানে মাত্র ৮৫ বর্গকিলোমিটারে সারা বছর কমবেশি পানি থাকে। বাংলাদেশে পানি ব্যবহারের বর্তমান অবস্থা জাতীয় পানি নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। জলাভূমির জন্য আলাদা কোনো ব্যবস্থাপনা নেই। পানির ব্যবস্থাপনায় জলাভূমির ব্যবস্থাপনা চলছে। তবে এভাবে চলতে থাকলে অল্প দিনে জলাভূমি বিলীন হয়ে যাবে। রামসার কর্তৃপক্ষ গত বছর জলাভূমি দিবসের প্রেক্ষাপট বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছিলেন, ১৯০০ সাল থেকে এ পর্যন্ত বিশ্বের ৬৪ শতাংশ জলাভূমি ধ্বংস হয়ে গেছে। ফলে এসব জলাভূমির ওপর নির্ভরশীল মানুষ ও জীববৈচিত্র্যের জীবনযাত্রা দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
জলাভূমি রক্ষায় স্থানীয়, আঞ্চলিক ও জাতীয় পর্যায়ে জলাভূমি চিহ্নিত করা, নির্বাচিত জলাভূমি সংরক্ষণ ও উন্নয়নের ব্যবস্থা করা, জলাভূমি ব্যবহারের ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণে সর্বস্তরে টেকসই ব্যবস্থা চালু করতে হবে। এর জন্য গণসচেনতা বাড়তে হবে জলাভূমির বিষয়ে। ইতোমধ্যে সরকারিভাবে জলাভূমি অপব্যবহার রোধের নেওয়া হয়েছে নানা উদ্যোগ। জলাভূমি উন্নয়নে সংশিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে অর্পিত দায়িত্ব পালন নিশ্চিত করতে হবে। তাছাড়া জলাভূমি রক্ষার জন্য অত্যাবশ্যক রাজনৈতিক ও সামাজিক সমন্বয়। মানুষের জন্য জলাভূমির ভূমিকা সব সময় বিবেচনায় রাখতে হবে। জলাভূমির দেশ হিসেবে এটা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
খুলনা
