অভিনয় 

আপডেট : ২১ জানুয়ারি ২০২২, ০৫:২৩

আশেপাশে কত ছেলে পরীক্ষায় নকল করল, কিছুই হলো না। অথচ বহিষ্কার হয়ে গেলাম আমি। একেই বোধহয় ভাগ্য বলে। পরীক্ষা শেষ হতে না হতেই খবরটা মৌসুমীর কানে পৌঁছে গেল। মৌসুমী ধমক দিয়ে বলল, ‘আজকে নকল করতে গেলি ক্যানো? দেখলি না আজ কড়াকড়ি! আজ বাদ দিতি!’

কিন্তু বাদ দিলে আমার পাস হবে কী করে? আমার কোনো প্রশ্নের উত্তরই ঠিকমতো পড়া নেই। পরীক্ষার আগে বই খুলে দেখি গাদা গাদা প্রশ্ন। রেখে দিয়েছিলাম। নকলের ভরসায়। এসএসসিও তো ভালো রেজাল্টে পাস করে গেছি নকলের জোরে। বন্ধুরা বলে আমি নাকি বেশ কৌশলী, যাকে বলে টেকনিক্যাল। পড়ি না লিখি না অথচ ভালোমতো পাস করে যাই! 

আসলে আমি একটা ফাউল টাইপের ছেলে। এটা আমি যেমন জানি, বন্ধুরাও জানে। আমি গাঁজা খাই, বিভিন্ন ধরনের নেশা করি, বন্ধুদের সঙ্গে বসে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা মারি। রাস্তায় মেয়েদের দেখলে গলা চুলকায়, টিজ করি। আর যেটুকু সময় ঘরে থাকি মৌসুমীর মুখটা নিয়ে গবেষণা করি।

ধনী বাপের একমাত্র মেয়ে সে। অথচ কী নিপুণ কৌশলে আমি তাকে পটিয়ে রেখেছি। আমার প্রেমে সে গদগদ। সে আমাকে নিখাঁদ ভালো মানুষ মনে করে। এই জায়গাতেই বন্ধুরা আমার সঙ্গে পেরে ওঠে না। ঈর্ষা করে। আমি কীভাবে কীভাবে যেন সবকিছু ম্যানেজ করে ফেলি। মৌসুমী কিছুই টের পায় না। মাঝে মধ্যে সে আমাকে টাকা-পয়সাও দেয়।

আমি বহিষ্কার হওয়াতে আমার বাসার লোকজন তেমন একটা উদ্বিগ্ন হলো না। চিন্তিতও না। যেন তারা জানতই আমি একদিন পরীক্ষায় বহিষ্কৃত হব। এত দিন কেন হইনি, সেটা ভেবেই তারা হয়তো অবাক হতো।

কিন্তু মৌসুমী? শুধুমাত্র ঐ বহিষ্কারের দিনই সে আমার সঙ্গে ঠিকমতো কথা বলেছে। বোধহয় সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য। তারপর থেকেই সে আমাকে এড়িয়ে চলছে। আমি বুঝতে পারছি। আমার অনুভবশক্তি প্রখর। যারা ধান্দাবাজি করে খায় তাদের অনুভবশক্তি প্রখর হয়। তারা খানিকটা ভবিষ্যৎও দেখতে পারে। আমিও আমার ভবিষ্যৎ স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি।

মৌসুমী কি আমার কাছ থেকে ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে? ইদানীং সে একটা ছেলের সঙ্গে ঘুরছে। আমারই বন্ধু হ্যাবা টাইপের বদরুল। বদরুলটা পড়াশোনা ছাড়া আর কিছু বোঝে না। কী করে যেন পরীক্ষায় ওদের দু’জনার সিট পাশাপাশি পড়েছিল। 

বহিষ্কার হওয়ার পর এখন প্রতিদিন সকালে আমি খেয়েদেয়ে বেরিয়ে পড়ি। এদিক সেদিক ঘুরে বেড়াই। যে যেখানে যেতে বলে চলে যাই। তারপর দুপুরে আবার ফিরে আসি। 

আজ দুপুরে যখন হাত-মুখ ধুয়ে খেতে বসেছি মা তখন মাছের তরকারিটা পাতে তুলে দিতে দিতে বলল, তোর মামার অসুখ নাকি খুব বেড়েছে। আরিফ রইসুলের কাছে মোবাইল করেছিল। বিকেলের ট্রেনেই যেতে বলেছে। খেয়েদেয়ে রেডি হয়ে নে।

আহা রে মামা! অসুখ বাড়ানোর আর সময় পেলে না! আমার প্রেমের যখন টানাপড়েন চলছে তখন আজরাইলও মামার আত্মা নিয়ে টানাপড়েন শুরু করেছে দেখি!

পরের দিন মামা মারা গেলেন। অগত্যা আমাকে আড়াইদিন মামাবাড়িতে থাকতেই হলো।

ফিরে এসে শুনি মৌসুমী কোচিং করতে রাজশাহী গিয়েছে। সঙ্গে বদরুল। বদরুলের সঙ্গে তার নাকি খুব লটরপটর শুরু হয়েছে। হাসান বলল, বদরুল নাকি পরীক্ষায় তার খাতা ওপেন করে দিয়েছিল। মৌসুমী দেখে দেখে লিখেছে। 

হায় রে মৌসুমী! আমার সিট যদি তোর পাশে পড়ত আমি কি আর খাতা ওপেন করে দিতাম না! না-হয় আমার হাতের লেখা একটু খারাপই ছিল। তাই বলে বদরুলের সঙ্গে চলে যাবি! রাজশাহীতে কোচিং তো নামেই। অন্ধকারে শুয়ে শুয়ে ভাবছিলাম আমার বোধহয় একটু দুঃখ হবে। অন্ধকারের নিঃসঙ্গতায় আমার চোখেও জল আসবে। কিন্তু তেমন কিছুই অনুভব করলাম না। কষ্ট হলো না। মনের কোথাও কোনো যন্ত্রণা টের পেলাম না। কল-কব্জা তাহলে ঠিকই আছে। 
বিগড়াইনি।

শুয়ে শুয়ে তাই ভাবছিলাম আমার মন বোধহয় আগেই জেনে গিয়েছিল মৌসুমী একদিন চলে যাবে। ঠিকই চলে যাবে। আমার মন বলছে, আমি যে দুই নাম্বার মাল মৌসুমী তা আগেই জানত। তারপরও সবদিক সামলে কি অপার মহিমায় আমার সঙ্গে নিখুঁত অভিনয় করে গেছে। আমিও কি ভালো ছেলে সাজার কম অভিনয় করেছি? কিন্তু অভিনয়ে কে জিতল? মৌসুমী না আমি? বুঝতে পারছি না।

 

ইত্তেফাক/জেডএইচডি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন