বৃদ্ধ, পৌঢ় থেকে তরুণ-তরুণী সবাই মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে থাকত মঞ্চের দিকে। যাত্রাশিল্পীদের সেই অভিনয়, নাচ-গান যেন ভোলার নয়। কিন্তু ঐতিহ্যবাহী সেই যাত্রাদলগুলো হারিয়ে যাচ্ছে।
আকাশ সংস্কৃতির বেপরোয়া আগ্রাসন ও নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে সিরাজগঞ্জের এসব যাত্রাদল এখন নেই বললেই চলে। এ কারণে বড় দুর্দিন চলছে এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত শতশত শিল্পী ও কলাকুশলীদের জীবনযাত্রায়। বাধ্য হয়ে অনেকেই তাদের পেশা পরিবর্তন করছেন। বয়সের ভারে ন্যুব্জ কেউ কেউ উদ্বিগ্ন দিন পার করছেন। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সিরাজগঞ্জ জেলায় যাত্রাদলের সংখ্যা ছিল প্রায় ১৮টি। প্রতিটি যাত্রাদলের সদস্য সংখ্যা ছিল ৬০ থেকে ৭০ জন। এর মধ্যে শিল্পী ৪০-৫২ জন, পুরুষের সংখ্যা ২৫-৩৫ জন, নারী ১২-১৫ জন। শিশুশিল্পী কমপক্ষে দুই/তিন জন। অবশিষ্টরা দলের বিভিন্ন দায়িত্বে নিয়োজিত সাংগঠনিক কর্মকর্তা ও কর্মচারী।
যাত্রাদলের একজন প্রবীণ প্রমোট মাস্টার রায়গঞ্জের খন্দকার জালাল উদ্দিন বাদশা জানান, ১৯২২ সালের শুরুর দিকে তদানীন্তন সিরাজগঞ্জ মহুকুমার বিভিন্ন গ্রামাঞ্চলে আনুষ্ঠানিকভাবে কয়েকটি যাত্রা দলের সূচনা হয়। ষাটের দশক পর্যন্ত এর অধিকাংশ দল ‘অ্যামেচার’ যাত্রা দল হিসেবে পরিচিত ছিল। অ্যামেচার দলগুলো হচ্ছে : রায়গঞ্জের চান্দাইকোনার ভোলানাথ, বিধূভূষণ ও আনন্দ অপেরা। দলগুলো কলকাতায় একাধিকবার আমন্ত্রিত হয়ে শো করেছে বলে জানা যায়। এসব যাত্রাদলের মালিক ছিলেন :তদানীন্তন সংস্কৃতিমনা ভোলানাথ বাবু, বিধূভূষণ বাবু ও নিখিল চন্দ্র সাহা বাবু। মিউজিক ডাইরেক্টর ছিলেন :অধ্যক্ষ যতীন্দ্র নাথ সাহা, ত্রৈলক্ষ বসাক, নগেন্দ্র নাথ দাশ, আকবর আলী প্রমুখ। প্রধান চরিত্রে অভিনয় করে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন অখিল চন্দ্র বসাক, বিনয় চক্রবর্তী, বনবিহারী দাস, মাধাই নন্দী, অধীর নাগ, অজয় সেন, মনোরঞ্জন সাহা, রাধা রমন দাস, পলু ঘোষ, সুরেশ দাস প্রমুখ।
বাসন্তী অপেরার মালিক ছিলেন সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরের নারায়ণ দত্ত, যিনি ভগবান দত্ত নামে সবার কাছে পরিচিত ছিলেন। বাসন্তী নাট্য প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে শাহজাদপুরে এক বিশাল শিল্পী সম্প্রদায় গড়ে ওঠে। অমলেন্দু বিশ্বাসের সহধর্মিণী জ্যোৎস্না বিশ্বাস সহ এ তালিকায় রয়েছেন পরিমল সাহা, বারীণ নন্দী, ফণী শীল, সন্ধ্যা সাহা, বিনয় চক্রবর্তী, অমিয় সরকার প্রমুখ। স্বনামধন্য যাত্রানট অমলেন্দু বিশ্বাসের যাত্রাজীবন শুরু হয় এই দল থেকেই ১৯৬১ সালে। ৭০ এর দশকের পর নেমে আসতে থাকে বিভিন্ন সংকট। একে একে সব যাত্রাদলই ভেঙে যায়। বেকার প্রবীণ যাত্রাশিল্পীরা জানান, প্রাচীন এই শিল্প মাধ্যমের দিন এখন শেষ। ক্লাসিক নৃত্যের এক সময়ের সারা জাগানো নৃত্যশিল্পী শাহজাদপুরের সন্ধ্যা রাণী বলেন, এখন নৃত্যের নামে যাত্রাপালায় শুধু অর্ধনগ্নতা প্রদর্শিত হয়।
প্রকৃতপক্ষে যোগ্য শিল্পী, কুশলী ও অভিনেতা-অভিনেত্রীদের সঠিক মূল্যায়ন করার পাশাপাশি অশ্লীলতার বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন ও রাষ্ট্রীয় কঠোর ব্যবস্থাপনাই এই অধঃপতন থেকে যাত্রা শিল্পকে আগের গৌরবে ফিরিয়ে আনতে পারে বলে তিনি মনে করেন। সিরাজগঞ্জ জেলা কালচারাল অফিসার মাহমুদুল হাসান লালন বলেন, সিরাজগঞ্জে প্রাচীন কোনো যাত্রাদল আর নেই। এখন নতুন দুই যাত্রাদল নিবন্ধিত। একটি শাহজাদপুর উপজেলার তালগাছির আশরাফ আলীর ‘ভাই ভাই অপেরা’ ও রায়গঞ্জের শালিয়াগাড়ির আব্দুস সাত্তার বাবলুর ‘শতরূপা অপেরা’। শতরূপা অপেরাও বন্ধ হয়ে গেছে। এখন শুধু একটি মাত্র যাত্রাদল টিকে আছে এখানে।
