মানিকগঞ্জে আশঙ্কাজনক হারে কমছে আবাদি খেত

আপডেট : ২২ জানুয়ারি ২০২২, ০৯:১১

কৃষক মুনছের আলীর তিন ছেলে। তার আবাদি জমির পরিমাণ ছিল ৯০ শতাংশ। এই জমির ফসলই ছিল তার ছয় সদস্য বিশিষ্ট পরিবারের প্রধান উপার্জন খাত। বছর দশেক আগেও ছিল তার একান্নবর্তী পরিবার। ছেলেরা বিয়ে করে সংসার পেতেছেন। তাদের ঘরেও এসেছে সন্তানাদি। ছোট্ট বাড়িটিতে এখন অতিরিক্ত মানুষ আর নতুন নতুন ঘর সংকুলান হচ্ছে না। বসতির জন্য অন্য কোনো জমি না থাকায়, বাধ্য হয়েই ভাগ করে দেওয়া হয় কৃষিজমি। সময়ের প্রয়োজনেই এ একান্নবর্তী পরিবারটি ভেঙে এখন তিন ভাগ হয়েছে। ফি বছর যেখানে উঁকি দিত পাকা ধানের হাসি; কিংবা অন্যান্য ফসল ঘরে তোলার আনন্দে বিভোর থাকত মন। এখন সেখানে নতুন ভিটায় রঙিন টিনের চাল শোভা পাচ্ছে। কৃষক মুনছের আলীর এখন আর কৃষিজমি নেই।

মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার কালাচাঁদপুর গ্রামের কৃষক মুনছের আলীই নয়, জেলার সর্বত্রই আশঙ্কাজনক হারেই কৃষিজমির মাঠ জুড়ে গড়ে উঠছে নতুন নতুন বসতি, কারখানা, ইটভাটা ও প্রতিষ্ঠান। আবাসন ও বাণিজ্যিক কাজে ফসলি জমির ব্যবহার মানিকগঞ্জে চরম মাত্রায় ঠেকেছে। অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট গবেষণার এক জার্নালে বলা হয়েছে, সারা দেশের মধ্যে কক্সবাজার, কুষ্টিয়া ও মানিকগঞ্জ জেলায় কৃষিজমির বাণিজ্যিক ব্যবহার সবচেয়ে বেশি। জেলা কৃষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. নজরুল ইসলাম বলেন, দিন দিন বাড়ছে মানুষ, কমছে কৃষিজমি। ফলে অব্যাহতভাবে আবাদি জমিতে সৃষ্টি হচ্ছে বসতবাড়ি ও নানা স্থাপনা। এ ছাড়া যত্রতত্র ইটের ভাটার ভিড়ে বিস্তর কৃষিজমি পরিণত হচ্ছে স্থায়ী অনাবাদি জমিতে। কারখানা ও ভাটার পার্শ্ববর্তী জমিগুলোরও উর্বরতা শক্তি বিনষ্ট হচ্ছে মারাত্মক হারে। কোথাও আবার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ার নামে অপরিকল্পিতভাবে বালু দিয়ে ভরাট করা হয়েছে কৃষিজমি।

১৩৭৮.৯৯ বর্গ কি.মি. আয়তনের মানিকগঞ্জে প্রায় ১৭ লাখ মানুষের বাস। জেলার মোট জমি ১২০৭৯৭.৩২ হেক্টরের মধ্যে আবাদি জমির পরিমাণ ১০৭৮১৭ হেক্টর উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে চিত্র অনেকটাই ভিন্ন। জেলার ঢাকা-আরিচা মহাসড়কসংলগ্ন বিস্তর জমি, ঘিওর, সাটুরিয়া, দৌলতপুর, শিবালয়, হরিরামপুর ও সিংগাইর উপজেলায় আবাসন, প্রতিষ্ঠান, কারখানা, ভাটা নির্মিত হওয়ায় আবাদি জমি কমেছে আশঙ্কাজনক হারে। এক হিসেবে জানা গেছে, মানিকগঞ্জের সাত ইউনিয়নে প্রায় দেড় শতাধিক ইটের ভাটা রয়েছে। প্রভাবশালীরাই এসব ইটভাটার মালিক। সরজমিনে দেখা গেছে, বেশির ভাগ ইটভাটাই সরাসরি কৃষিজমিতে স্থাপন করা হয়েছে। ঘিওরের শিবপুর মোড়ে প্রায় ৪০ একর কৃষিজমিতে দুইটি, বাঙ্গালা এলাকায় প্রায় ১৪০ একর কৃষিজমিতে চারটি, সিংগাইরের বাইমাইল এলাকায় প্রায় ১৮০ একর কৃষিজমিতে তিনটি, গিলন্ড এলাকার ৩৫ একর জমিতে দুইটি ভাটাসহ ঢাকা-আরিচা মহাসড়কসংলগ্ন ও উপজেলা পর্যায়ে ভাটা সরাসরি আবাদি জমিতে গড়ে উঠেছে। সিংগাইর, ঘিওর, শিবালয় ও সাটুরিয়া এলাকায় কৃষিজমি ভরাট করে কমপক্ষে অর্ধশত কারখানা ও পাকা স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে।

এই প্রসঙ্গে রাথুরা গ্রামের কৃষক মো. হায়াত আলী বলেন, ‘কৃষিজমিতে ইটভাটার আশ-পাশের জমির উর্বরতা নষ্ট হয়। ইটভাটার কারণে আমার ৪০ শতাংশ জমির ফসল নষ্ট হয়ে গেছে। অন্যদিকে তামাক চাষের কারণে কৃষিজমির উর্বরতা নষ্ট হচ্ছে মারাত্মকভাবে।’ স্থানীয় কৃষি ও পরিবেশ গবেষণা প্রতিষ্ঠান বারসিকের সমন্বয় কর্মকর্তা বিমল রায় বলেন, ‘কৃষিজমি সুরক্ষায় আইনের যথাযথ প্রয়োগ না থাকায় কৃষিজমির যথেচ্ছাচার ব্যবহার করে নষ্ট করা হচ্ছে। কৃষিজমি নিয়ে বড় ধরনের বিপর্যয়ের আগেই কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।’ পরিবেশ রক্ষা আন্দোলন নেতা অ্যাডভোকেট দীপক কুমার ঘোষের মতে, কৃষিজমি বিপর্যয়ের দিকে যাচ্ছে প্রধানত কয়েকটি কারণে। আর তা হলো, কৃষকের দূরদর্শী জ্ঞানের অভাব, জনসংখ্যার বিস্ফোরণ, ভূমিখেকো ও অসাধু ইটভাটা মালিকদের আগ্রাসন। অবিলম্বে কৃষিজমি সুরক্ষায় যথাযথ কর্তৃপক্ষকে পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায় মারাত্মক খাদ্যঝুঁকির আশঙ্কা দেখা দিতে পারে।’

কৃষিজমি অন্য খাতে ব্যবহার করতে হলে সরকারি অনুমোদনের বিষয় আছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো এ আইনের যথাযথ প্রয়োগ নেই। ভূমি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, কৃষিজমি সুরক্ষার জন্য ন্যাশনাল ল্যান্ড জোনিং প্রকল্পের (ফেজ-২) মাধ্যমে ভূমির শ্রেণি অনুসারে জোনিং কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এই বিষয়ে মানিকগঞ্জ জজ কোর্টের আইনজীবী মাহবুব আলম রাসেল বলেন, কৃষিজমি সুরক্ষা ও ভূমি ব্যবহার আইনে বলা হয়েছে, কৃষিজমি নষ্ট করে বাড়িঘর, শিল্পকারখানা, ইটখোলা এবং অন্যান্য অকৃষি স্থাপনা নির্মাণ করা যাবে না। এ আইন অমান্য করলে কারাদণ্ড, ৫০ হাজার থেকে ১০ লাখ টাকা জরিমানা সুপারিশ করা হয়েছে। তবে যাদের তিন থেকে পাঁচ শতক কৃষিজমি আছে তারা অপরিহার্য ক্ষেত্রে বসতবাড়ি নির্মাণ করতে চাইলে আইনের বিধান অনুযায়ী ভূমি জোনিং মানচিত্র অনুযায়ী তা করতে পারবেন। ঘিওর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শেখ বিপুল হোসেন জানান, দেশে প্রতিদিন শতকরা এক শতাংশ হারে কৃষিজমি হ্রাস পাচ্ছে। মানিকগঞ্জে তিন ফসলি জমিতে ইটভাটা, বসতবাড়ি ও শিল্পকারখানা তৈরি হওয়ায় আবাদ বিপর্যয়ের মুখে পড়ছে। এছাড়াও মাটির টপসয়েল বিক্রির ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে উত্পাদন। জেলায় আবাদি জমি দিন দিন চলে যাচ্ছে অকৃষি খাতে। 

ইত্তেফাক/ ইআ