শুক্রবার, ২৭ মে ২০২২, ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

ব্যাংকিং খাত ও পুঁজিবাজারের নেপথ্য সমস্যা

আপডেট : ২৩ জানুয়ারি ২০২২, ০৭:৫৯

ব্যাংকিং খাত হচ্ছে একটি দেশের অর্থনীতির প্রাণ। একটি কৃষিপ্রধান দেশের দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য কৃষি সুসংহতকরণের পাশাপাশি শিল্পায়নের একান্ত প্রয়োজন। একই সঙ্গে সম্প্রসারিত হয় ব্যবসায়-বাণিজ্য ও সেবা খাত। আর শিল্পায়ন ও অন্যান্য খাত সম্প্রসারণের জন্য প্রয়োজনীয় পুঁজির সংস্হান হয় মূলত দুটি উৎস থেকে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে ব্যাংকিং খাত, অন্যটি স্টকমার্কেট বা পুঁজিবাজার।

যত বড় বড় বিনিয়োগ হয়, অধিকাংশ আসে এ দুটি খাত থেকে। বাংলাদেশের পুঁজিবাজার এখনো কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বিকশিত হয়নি। তাই উদ্যোক্তাদের প্রয়োজনীয় পুঁজির চাহিদা মেটানোর জন্য ব্যাংকিং খাতের ওপরই নির্ভর করতে হচ্ছে। কিন্তু নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির কবলে পড়ে দেশের ব্যাংকিং খাত অত্যন্ত নাজুক হয়ে পড়েছে। এর কারণস্বরূপ একটি লক্ষণীয় বিষয় হলো যোগসাজশের খেলা। যারা ঋণ প্রদান করেন এবং যারা ঋণ গ্রহণ করেন, তাদের অনেকের মধ্যে একধরনের যোগসাজশ থাকে।

ব্যাংকের ভেতরে অনেক ক্ষেত্রে তা ব্যাপকভিত্তিক হয়ে পড়ে, উচ্চ ব্যবস্হাপনা পর্যায়ের সংশ্লিষ্টতাসহ। তা না হলে তো অনিয়ম করে বড় বড় ঋণ মঞ্জুর করানো সম্ভব হওয়ার কথা নয়। এছাড়া কোনো কোনো ক্ষেত্রে অনেক ক্ষমতাবান ও সম্পদশালী ঋণগ্রহীতাদের বেলায় তাদের চাপেই ঋণ মঞ্জুর নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে, প্রকল্পের যথাযথ মূল্যায়ন নয়। অর্থাত্, তারা প্রভাব বিস্তার করে যে কোনো প্রকল্পের অনুকূলে বড় বড় ঋণ মঞ্জুর করিয়ে নিতে থাকেন। বিশেষ করে কোনো কোনো রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকে এদের প্রভাব ব্যাপক বিস্তৃতি লাভ করে। ব্যাংকের ভেতরে সততা থাকলেও এই প্রভাবশালীদের কথা না শুনলে কর্মকর্তাদের অন্যত্র বদলি এমনকি চাকরিচু্যতির ঘটনাও বিরল নয়। ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি এবং বাইরের প্রভাবশালী মহলের চাপেই ব্যাংকিং খাত নাজুক হয়ে পড়েছিল। কিছু কিছু প্রভাবশালী গোষ্ঠী ব্যাংকসংক্রান্ত নিয়ম-নীতি এবং আইনকানুন পালটে নিতে পারে।

ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের হার বৃদ্ধি পেয়ে ১২ শতাংশে পৌঁছেছিল, যার অধিকাংশ রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোতে। বর্তমানে খেলাপি ঋণের হার ৮ শতাংশে নেমে এসেছে। সাধারণত একটি দেশের ব্যাংকিং খাতে ৩ শতাংশ পর্যন্ত খেলাপি ঋণ সহনীয় বলে মনে করা হয়। বর্তমানে খেলাপি ঋণের যে হার আমরা প্রত্যক্ষ করছি, তা আগের তুলনায় কিছুটা কম হলেও গ্রহণযোগ্য পর্যায় থেকে এখনো অনেক বেশি। আবার দেখা যায়, খেলাপি ঋণের হার কমেছে মূলত হিসাবের কিছু নীতিগত বা আইনি পরিবর্তনের কারণে। বর্তমানে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ হচ্ছে ১ লাখ কোটি টাকার কিছু বেশি। ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে এক বছর রেয়াতি সময়সহ ১০ বছরের জন্য ঋণ হিসাব পুনঃতফসিলিকরণের সুযোগ দেওয়ায় সার্বিকভাবে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কিছুটা কমে এসেছে। এ ছাড়া ঋণ হিসাব অবলোপনের নিয়ম সহজ করা হয়েছে।

আগে কোনো ঋণ হিসাব অবলোপন করতে হলে মন্দ মানে শ্রেণিকৃত হওয়ার পর পাঁচ বছর অতিক্রান্ত হলে সেই প্রকল্পের উদ্যোক্তাদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত আদালতে মামলা দায়ের-পূর্বক শতভাগ প্রভিশন সংরক্ষণ করে অবলোপন করা যেত। এখন সংশোধিত নতুন আইনে শ্রেণিকৃত হওয়ার পর তিন বছর অতিক্রান্ত হলেই একটি ঋণ হিসাব অবলোপন করা যায়। এ জন্য উপযুক্ত আদালতে মামলা দায়ের এবং শতভাগ প্রভিশন সংরক্ষণের বাধ্যবাধকতা প্রত্যাহার করা হয়েছে। এসব আইনি পরিবর্তনের ফলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমে এসেছে বলে প্রতীয়মান হয়। কিন্তু আসলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ তেমন একটা কমেনি। জানা যায়, ঋণ হিসাব থেকে কিস্তি আদায়ের পরিমাণ বাড়েনি। এই পদ্ধতিতে কৃত্রিমতার আশ্রয় রয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়।

ব্যাংকিং খাতে আরো একটি বড় সমস্যা দেখা দিয়েছে করোনাকালে। করোনাকালে দেশে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পায়নি। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ কম হওয়ার কারণে বিনিয়োগযোগ্য প্রচুর অর্থ ব্যাংকে জমা পড়ে আছে। এছাড়া করোনাকালে ঋণগ্রহীতাদের কিস্তি পরিশোধে ছাড় দেওয়া হয়েছে। এসব কারণে ব্যাংকিং খাতে অবস্হা কিছুটা নাজুক হয়ে পড়েছে। তার পরও অনেক ব্যাংকের মুনাফা বেড়েছে। বিষয়টি বিশ্লেষণের দাবি রাখে।

সম্প্রতি কিছুটা উন্নতি হলেও সততাভিত্তিক ব্যাংকিং কার্যক্রম এখনো সর্বত্র পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক এক্ষেত্রে আগের তুলনায় অনেকটাই তত্পর হওয়ায় কিছুটা উন্নতি হয়েছে বলে আমি মনে করি। আরো কাজ করার আছে ব্যাংকিং খাতকে পুরোপুরি সুস্হ ধারায় নিয়ে আসার লক্ষ্যে।

বিনিয়োগের ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিতকরণ ও বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মাঝেমধ্যেই বলেন, আমরা সত্যের পথে থেকে কাজ করব। এই লক্ষ্যে অন্যান্য পদক্ষেপের পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতে যে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, তার মাধ্যমে ব্যাংকারদের মধ্যে যাতে মূল্যবোধ সৃষ্টি হয় এমনভাবে সিলেবাস তৈরি করা প্রয়োজনীয় বলে আমি মনে করি। ব্যক্তি স্বার্থে অন্যের সঙ্গে যোগসাজশ করে প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি যাতে না করে এমনভাবে তাদের গড়ে তুলতে হবে। অবশ্য একই সঙ্গে শীর্ষ ব্যবস্হাপনায় যারা আছেন বা আসবেন, তাদের মধ্যে মূল্যবোধ সৃষ্টি বা দৃঢ়করণের লক্ষ্যেও বাংলাদেশ ব্যাংক মতবিনিময় এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে।

ভবিষ্যতে টেকসই উন্নয়ন অর্জন আমরা প্রত্যাশা করি। সেজন্য অন্যান্য ব্যবস্হার পাশাপাশি সততানির্ভর কার্যকর ব্যাংকিং ব্যবস্হা থাকা প্রয়োজন। আর সেরকম ব্যবস্হা নিশ্চিত করতে সঠিক নিয়মকানুন ও আইন প্রণয়ন বা পরিবর্তন-পরিমার্জন ও বাস্তবায়ন জরুরি। সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকিং খাতে যে উন্নতি হয়েছে, তা ঐ লক্ষ্য বিবেচনায় যথেষ্ট নয়। কাজ অনেক বাকি।

করোনাকালীন অবস্হায় ব্যাংকিং খাতে এডহক ভিত্তিতে কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে খেলাপি ঋণ চিহ্নিত না করা। আমরা এখনো জানি না কী পরিমাণ ঋণ খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি। নতুন করে বিনিয়োগও বেশি হয়নি। আবার নতুন করে খেলাপিও করা হয়নি। বর্তমানে চিহ্নিত খেলাপি ঋণের পরিমাণ কিছুটা কমেছে বটে, তবে পরিস্হিতি স্বাভাবিক হলে ব্যাংকিং খাতের প্রকৃত চিত্র পাওয়া যাবে বলে ধারণা করি।

উন্নত দেশগুলোতে দীর্ঘময়াদি ঋণের জন্য সাধারণত পঁুজিবাজারের ওপর নির্ভর করা হয়। এটা ঠিক যে স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশে পুঁজিবাজার বিকশিত হতে সময় লাগে। কারণ পুঁজিবাজারের উন্নতির জন্য একদিকে ভালো ভালো কোম্পানির প্রয়োজন হয়, অন্যদিকে পুঁজিবাজার ব্যবহারকারীদের মধ্যে এই বাজারের নানা দিক সম্বন্ধে ধারণা ও সচেতনতা থাকা দরকার। পুঁজিবাজার সুস্হ ও কার্যকর থাকা এবং এগিয়ে চলার জন্য এমন সব কোম্পানি যুক্ত থাকা দরকার, যেগুলোর রয়েছে শক্ত ব্যাবসায়িক ভিত, ব্যবস্হাপনাসংক্রান্ত সুনাম ও দৃঢ়তা এবং স্বাভাবিক অবস্হায় ধারাবাহিকভাবে সন্েতাষজনক পরিমাণ লভ্যাংশ দিতে পারার সক্ষমতা। নানা কারণেই ভালো কোম্পানিগুলো পুঁজিবাজারে আসতে চায় না। দেশে যেসব ভালো কোম্পানি এখনো পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়নি, তাদের বাজারে নিয়ে আসার আরো উদ্যোগ নিতে হবে।

পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করে সব সময় যে মুনাফা পাওয়া যাবে তা নয়। কিন্তু মুনাফা পাওয়ার ভরসা রাখা যায় এমন বাস্তবতা থাকতে হবে। এই ভরসা রাখা যায় এমন কোম্পানি পুঁজিবাজারে যত বেশি থাকবে, পুঁজিবাজার তত প্রাণবন্ত হবে। কোম্পানিগুলো বেশি বেশি পঁুজি সংগ্রহ করতে পারবে এবং যারা শেয়ার ক্রয় করবে, তারাও ভালো লভ্যাংশ পাবে বলে ভরসা রাখতে পারবে। তবে যারা বাংলাদেশে পুঁজিবাজারে খারাপ বিনিয়োগ করে, তাদের বেশির ভাগই বিনিয়োগ কৌশল এবং বিভিন্ন কোম্পানির ভালোমন্দ সম্পর্কে অবহিত থাকে না। তারা অন্যের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে অনেক সময় গুজবের ওপর নির্ভর করে শেয়ার ক্রয় করে। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) পক্ষ থেকে বিনিয়োগকারীদের সচেতন করার জন্য এসব ব্যাপারে প্রায়ই কথা বলা হচ্ছে। বিএসইসির বর্তমান চেয়ারম্যান ড. শিবলি রুবাইয়াতুল ইসলাম বিএসইসির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণের পর বিনিয়োগকারীদের সচেতন করার জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ভালো ভালো কোম্পানি পুঁজিবাজারে নিয়ে আসার জন্য চেষ্টা চালানো হচ্ছে। বিনিয়োগকারীদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য যেসব প্রতিষ্ঠান আছে, তাদের আরো সক্রিয় করতে হবে।

রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকে খেলাপি ঋণ বেশি। প্রতিটি বৃহত্ ঋণ মঞ্জুরের জন্য পরিচালনা বোর্ডে উপস্হাপন করতে হয়। কাজেই ঋণ মঞ্জুরের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের অনিয়ম হলে পরিচালনা বোর্ড তার ‘দায়’ এড়াতে পারে না। প্রতিষ্ঠানটি কীভাবে চলবে, বড় বড় সিদ্ধান্ত পরিচালনা বোর্ড থেকেই আসবে। এমনকি ছোট ছোট ঋণ এবং সিদ্ধান্েতর ব্যাপারেও তাদের নজরদারি থাকা উচিত। কাজেই ব্যাংক পরিচালনার ক্ষেত্রে পরিচালনা বোর্ডের দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু অনেকেই আছেন যারা সদস্য হিসেবে নিয়োগ পান, তবে এসব দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করেন না। তারা বোর্ড সভায় আসেন, নির্ধারিত হারে সম্মানি পান। এ পর্যন্তই। কেউ কেউ ব্যাংকিং নিয়মকানুন বোঝেন না বা বোঝার চেষ্টাও করেন না। যে কার্যপত্র তাদের নিকট পাঠানো হয়, তা তারা ভালোভাবে পড়েও দেখেন না। কেউ কেউ পূর্বোক্ত যোগসাজশে অংশগ্রহণ করেন। যারা পরিচালনা বোর্ডে নিয়োগ পাবেন, তাদের প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সম্পর্কে ভালোভাবে বুঝতে এবং জানতে হবে। প্রতিষ্ঠানের প্রতি তাদের অঙ্গীকার থাকতে হবে।

বাংলাদেশে দেশি সরকারি-বেসরকারি এবং বিদেশি ব্যাংকের সংখ্যা ৬১টি। বিদ্যমান ব্যাংকগুলো আরো সম্প্রসারিত হলে তাদের অবস্হান আরো দৃঢ় হতে পারে। গ্রামে শাখা স্হাপনে তাদের উত্সাহিত করা উচিত। প্রয়োজনে নীতি ও আইনের মাধ্যমে বাধ্য করা যেতে পারে। বর্তমানে বিদ্যমান ব্যাংকগুলোর মধ্যে অনেকগুলো তেমন প্রসার লাভ করতে পারছে না বাংলাদেশের অর্থনীতির পরিধিতে। জাতীয় উত্পাদন অনেক বেড়েছে বিগত দশকে, কিন্তু এখনো মোট জাতীয় আয় ৪১১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ। আপাতত আর নতুন কোনো ব্যাংকের অনুমোদন না দেওয়াই বাস্তবানুগ হবে বলে আমার ধারণা।

লেখক : মুক্তিযোদ্ধা, অর্থনীতিবিদ, সমাজচিন্তক, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিশেষজ্ঞ

ইত্তেফাক/এসজেড