বুধবার, ০৫ অক্টোবর ২০২২, ২০ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

৬৩২ বৈধ ক্রসিংয়েও গেটম্যান নেই, রেল দুর্ঘটনার ৮৯ শতাংশই এ কারণে

সারাদেশে ১ হাজার ৩৬১ অবৈধ রেলক্রসিং

আপডেট : ২৭ জানুয়ারি ২০২২, ০০:২৪

বাংলাদেশ রেলওয়ের অরক্ষিত লেভেল ক্রসিং যেন মৃত্যুফাঁদ। সারা দেশে রেলপথে মোট ক্রসিং আছে ২ হাজার ৮৫৬টি। এর মধ্যে ১ হাজার ৩৬১টিরই অনুমোদন নেই। আবার ১ হাজার ৪৯৫টি বৈধ ক্রসিংয়ের মধ্যে ৬৩২টি ক্রসিংয়েই গেটম্যান নেই। রেলসূত্রে এ তথ্য পাওয়া গেছে।

জানা গেছে, গত প্রায় চার বছরে সারা দেশে রেল দুর্ঘটনায় মারা গেছেন ১ হাজার মানুষ। আহত ও পঙ্গু হয়েছেন দেড় হাজারের বেশি মানুষ। রেল দুর্ঘটনায় যত প্রাণহানি হয়, তার ৮৯ শতাংশই অরক্ষিত লেভেল ক্রসিংয়ের কারণে ঘটে। রেলওয়ের লেভেল ক্রসিংগুলোর (বৈধ-অবৈধ) প্রায় ৮৪ শতাংশই অরক্ষিত। আর এসব ক্রসিংয়ে প্রায়ই ঝরছে সাধারণ মানুষের প্রাণ। অথচ এসব ক্রসিং নিরাপদ করার বিষয়টি কর্তৃপক্ষের অগ্রাধিকারে নেই। সর্বশেষ গতকাল বুধবার নীলফামারীর দারোয়ানীতে লেভেল ক্রসিংয়ে সীমান্ত এক্সপ্রেস ট্রেনে কাটা পড়ে উত্তরা ইপিজেডের চার শ্রমিক নিহত হয়েছেন। এ সময় গুরুতর আহত হয়েছেন অটোরিকশার চালকসহ আরো পাঁচ শ্রমিক।

সতর্কীকরণ নোটিশ টাঙিয়ে দায় সারে কর্তৃপক্ষ

সংশ্লিষ্টরা জানান, বিগত এক যুগে রেলওয়েতে ১ লাখ ৬৩ হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। অথচ রেলওয়ের লেভেল ক্রসিংয়ের দুর্ঘটনা রোধকল্পে তেমন কোনো বড় অঙ্কের অর্থের প্রকল্প বাস্তবায়ন দেখা যায় না। রেলে এ পর্যন্ত যে বিপুল বিনিয়োগ হয়েছে এবং চলমান যে বরাদ্দ আছে এর ১ শতাংশের কম বিনিয়োগ করলেও রেলপথ নিরাপদ হয়ে যায়। কিন্তু রেলের কর্মকর্তাদের এসব প্রকল্পের দিকে মনোযোগ নেই। যে কারণে একটি দুর্ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই আরো একটি দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। অরক্ষিত রেলক্রসিংয়ে ছোট একটি সতর্কীকরণ নোটিশ টাঙিয়ে কর্তৃপক্ষ দায় সারে। কিন্তু একবারও ভাবে না এটি ক্রসিং নামের মৃত্যুফাঁদ। যখনই দুর্ঘটনা ঘটে তখন দায়ী ব্যক্তিকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। ঢাক-ঢোল পিটিয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কিন্তু তদন্ত কমিটির রিপোর্টের সুপারিশ অনুযায়ী কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না।

রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, সারা দেশে রেলপথ আছে ২ হাজার ৯৫৫ কিলোমিটার। এই রেলপথের ওপর দিয়ে কোথাও কোথাও সড়ক চলে গেছে। রেল আর সড়কের এই সংযোগস্থলকেই লেভেল ক্রসিং বলা হয়। এগুলোকে বৈধ-অবৈধ, পাহারাদার আছে (ম্যানড), পাহারাদার নেই (আনম্যানড)-এভাবে শ্রেণিবিন্যাস করে রেল কর্তৃপক্ষ। যেসব ক্রসিংয়ে পাহারাদার আছেন, সেগুলোতে লোহার প্রতিবন্ধক থাকে। পাহারাদার ট্রেন আসার সংকেত পেয়ে প্রতিবন্ধক নামিয়ে অন্য যানবাহনের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করেন। ফলে পাহারাদার ভুল না করলে যানবাহনের সঙ্গে ট্রেনের সংঘর্ষ হওয়ার সুযোগ নেই। পাহারাদার ও প্রতিবন্ধক থাকা রেলক্রসিংয়ে তাই দুর্ঘটনাও খুব কম। পাহারাদার নেই এমন ক্রসিং অরক্ষিত।

বৈধ রেলক্রসিংয়ের ৬১ শতাংশই অরক্ষিত

রেলের উচ্চপর্যায়ের দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, রেল কর্তৃপক্ষের মধ্যে এমন একটা ধারণা জন্মেছে যে রেলক্রসিংয়ে যানবাহন চাপা পড়ে প্রাণহানির দায় তাদের নয়। কারণ বেশির ভাগ সংস্থা সড়ক নির্মাণের সময় তাদের অনুমতি নেয়নি। অথচ রেলের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে নির্মাণ করা বৈধ রেলক্রসিংয়েরও ৬১.৫৮ শতাংশই অরক্ষিত। রেলক্রসিং পারাপারের সময় যেসব পথচারী প্রাণ হারান, সেই হিসাবও রেল কর্তৃপক্ষ প্রায়ই সংরক্ষণ করে না।

এ ব্যাপারে রেলপথমন্ত্রী মো. নূরুল ইসলাম সুজন বলেন, অবৈধ লেভেল ক্রসিংয়ের কারণে ট্রেনে যথাযথ গতি নিয়ে চলতে পারছে না। এসব ক্রসিংয়ে ট্রেনযাত্রীসহ সাধারণ মানুষেরও প্রাণ যাচ্ছে। যেসব প্রতিষ্ঠান রেলপথ মন্ত্রণালয়ের কোনো অনুমোদন না নিয়ে অবৈধ লেভেল ক্রসিং নির্মাণ করছে, দুর্ঘটনার জন্য তারাই দায়ী। আমরা উদ্যোগ নিচ্ছে কীভাবে এ থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যায়। কীভাবে রেলপথকে নিরাপদ করা যায়। এখন যেসব নতুন রেলপথ করা হচ্ছে, সেগুলোয় লেভেল ক্রসিং এড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। তাছাড়া বৈধ যেগুলো রয়েছে, সেগুলোর মানোন্নয়ন নিশ্চিত করাসহ অবৈধ ক্রসিংগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা চলছে।

ইত্তেফাক/এমএএম