ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে লাশের সন্ধানে ভিড় করছেন স্বজনরা। তাদের চোখে মুখে শোকের ছায়া। আগুনে তাদের স্বপ্ন পুড়ে গেলেও প্রিয়জনের লাশ তাদেরকে দেওয়া হোক। অগ্নিকান্ডে নিহতদের মধ্যে ২১ জনের লাশ দেখে শনাক্ত করা সম্ভব নয়। এ কারণে লাশ শনাক্তে সিআইডি গতকাল থেকেই স্বজনদের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ শুরু করেছে। গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ১৮ টি লাশের দাবিদার ৩০ জনের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করেছে সিআইডি। এদিকে গতকাল পর্যন্ত ৪৬ টি লাশ শনাক্ত করেছেন তাদের স্বজনরা। এর মধ্যে গত বৃহস্পতিবারই ৪৫ টি লাশ শনাক্ত করা হয়। বাকি একটি লাশ গতকাল শনাক্ত করা হয়।
এদিকে অগ্নিকান্ডের ঘটনায় গতকাল চকবাজার থানায় একটি মামলা করা হয়েছে। অগ্নিকান্ডে নিহত আরাফাত ইসলাম সিয়ামের নিকট আত্মীয় হাবিবুর রহমান রুবেল বাদী হয়ে অবহেলা জনিত কারনে মৃত্যুর অভিযোগে মামলাটি দায়ের করেন।
পুলিশের লালবাগ বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) ইব্রাহিম খান বলেন, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় মামলায় হাজী ওয়াহেদ ম্যানসনের মালিক হাজী আব্দুল ওয়াহেদের দুই ছেলে শহীদ ও হাসানের নাম উল্লেখ এবং অজ্ঞাত আরো কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে।
ঘটনাস্থলের রাস্তা ধুয়ে মুছে পরিস্কার: উদ্ধার অভিযান সমাপ্ত ঘোষনার পর থেকেই সেখানে ধ্বংসস্তুপ পরিস্কার করার জন্য সিটি করপোরেশন ও ফায়ার সার্ভিসের তিনটি টিম কাজ করছিলো। গতকাল ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়,মসজিদের সামনে পানি ছিটিয়ে ও ঝাড়ু দিয়ে রাস্তা পরিষ্কার করছেন পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা। সিটি করপোরেশনের বড় একটি ট্রাকে পানি এনে রাস্তা ও আশপাশ পরিষ্কার করা হচ্ছে। এদিকে ধ্বংসস্তুপের মধ্যে পড়ে থাকা প্রাইভেট কারের ভেতর থেকে একটি খন্ডিত হাত উদ্ধার করে পরিচ্ছন্ন কর্মীরা। পরে সেটিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠানো হয়।
লাশ শনাক্ত করতে এক মাস লাগবে : গতকাল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে চুড়িহাট্টায় অগ্নিকান্ডে নিহতদের শনাক্তকরণের জন্য ডিএনএ’র নমুনা সংগ্রহ করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি)। তারা গতকাল ১৮ টি লাশের জন্য ৩০ স্বজনের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে। এর মধ্যে স্বজনদের রক্ত ও বাক্কাল কোষের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে।
সিআইডির ফরেনসিক বিভাগের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ রিয়াজুল হক বলেন, ‘সিআইডির ক্রাইমসিন টিম ও ডিএনএ ল্যাবের দুটি টিম স্বজনদের নমুনা সংগ্রহ করছে। এর আগে বৃহস্পতিবার যে ২১টি লাশ শনাক্ত করা যাচ্ছিলো না। সেসব লাশের ডিএনএ নমূনা সংগ্রহ করা হয়। এ ক্ষেত্রে রক্ত হলে রিপোর্ট দ্রুত পাওয়া যায়। তবে পুড়ে যাওয়া লাশের রক্ত না পাওয়ায় ওই লাশগুলোর দাঁত ও হাড় এবং মাসলের টিস্যূ ডিএনএ’র জন্য নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে লাশের প্রোফাইল ও স্বজনদের ডিএনএ রিপোর্ট মিলাতে প্রায় এক মাস লেগে যেতে পারে।
সিআইডির ফরেনসিক বিভাগের ডিএনএ অ্যাসিস্ট্যান্ট অ্যানালাইসিস্ট নুসরাত ইয়াসমিন বলেন, স্বজনদের কাছ থেকে যে নমুনা নিয়েছি তা পরীক্ষায় খুব বেশি বেগ পেতে হবে না। চার সপ্তাহের মধ্যে আমরা তা সম্পন্ন করতে পারব। তবে ঘটনাস্থল থেকে দগ্ধ লাশের যেসব নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে তা সময়সাপেক্ষ। একেকটা আলামতের ওপর তা নির্ভর করছে। একেকটার জন্য একেক ধরনের সময় লাগবে। সেক্ষেত্রে অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই।
তদন্ত কমিটি ঘটনাস্থল পরিদর্শন : অগ্নিকান্ডের ঘটনায় সরকারের সাতটি প্রতিষ্ঠানের গঠিত তদন্ত কমিটিগুলোর প্রতিনিধি গতকাল পৃথকভাবে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। ফায়ার সার্ভিসের তদন্ত কমিটির সদস্য সচিব সহকারী পরিচালক ছালেহ উদ্দিন বলেন, হাজী ওয়াহেদ ম্যানসনের বেজমেন্টে বিপুল পরিমান রাসায়নিক উপাদান মজুদ করা আছে। আগুন এই বেজমেন্ডে আসতে পারলে ঘটনার ভয়াবহতা আরও বাড়তো।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) তদন্ত কমিটির সদস্য ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের পরিচালক (প্রশিক্ষণ, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) লে. কর্নেল এস এম জুলফিকার রহমান বলেন, কেমিক্যালের কারনেই আগুন এভাবে ছড়িয়েছে। ভবনে অবশ্যই কেমিক্যাল ছিল। সেই সঙ্গে ভবনের ভেতরে গ্যাস লাইটার রিফিলের পদার্থ ছিলো। এটা নিজেই একটা দাহ্য পদার্থ। প্রত্যেকটা জিনিসই আগুন দ্রুত ছড়িয়ে দিতে সহায়তা করেছে।
কমিটির আরেক সদস্য বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুর কৌশল বিভাগের প্রফেসর ড. মেহেদী আহমেদ আনসারী বলেছেন, ‘আমরা বিভিন্ন ভবন পরিদর্শনকালে দেখেছি ৫টি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ওয়াহিদ ম্যানশনের প্রথম ও দ্বিতীয়তলার কলাম এবং বিমগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আরও পরীক্ষা নিরীক্ষা করে ভবনটা ব্যবহার করা যাবে কি না তা আগামী সাত দিনের মধ্যে বিস্তারিত বলা যাবে।
রাজউকের অথরাইজড অফিসার নুরুজ্জামান জাহিদ বলেন, ‘এই ভবনটি রাজউক অনুমোদিত কি না আমরা ওভাবে এখনও তথ্য নিতে পারি নাই। ওদের সঙ্গে কথা বলে জানা যাবে আসলে তারা অনুমোদন নিয়ে ভবন নির্মাণ করেছে কি না।’
ডিএসসিসি’র প্রধান প্রকৌশলী রেজাউল করিম বলেন, ‘কয়েক দিন আগেও সিটি করপোরেশনের মেয়র এলাকাবাসীকে অনুরোধ করেছেন তারা যাতে এই কেমিক্যাল সরিয়ে নেন। এখানে কিন্তু কোনও কেমিক্যালের লাইসেন্স দেওয়া হয়নি এবং কোনও লাইসেন্স রিনিউ করা হয়নি। এগুলোর জন্য আলাদা কমিটি গঠন করা হয়েছে। কেন আগুন লেগেছে এবং কারা এই ঘটনার জন্য দায়ী কমিটি সে বিষয়ে তদন্ত করবে।’
ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে বিস্ফোরক পরিদফতরের প্রধান পরিদর্শক শামসুল আলম বলেছেন, ঘটনাস্থল থেকে অনেক ক্লু পেয়ে আমরা ধারণা করছি, গ্যাস সিলিন্ডার অথবা কেমিক্যাল বিস্ফোরণে আগুন ধরতে পারে।
বিস্ফোরিত হয়নি ট্রান্সফরমার: ঘটনাস্থলে ট্রান্সফরমার বিস্ফোরণের কোন ঘটনা ঘটেনি বলে জানিয়েছেন ঢাকা বিদ্যুত্ বিতরণ কোম্পানির (ডিপিডিসি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক বিকাশ দেওয়ান। আগুনের ঘটনায় ডিপিডিসি তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। গতকাল প্রাথমিক তদন্ত শেষে বিকাশ দেওয়ান বলেন, চুড়িহাট্টা মোড়ের আগুনের ঘটনায় কোনও ট্রান্সফরমার বিস্ফোরিত হয়নি।
একজনের লাশ শনাক্ত: গতকাল সোলায়মান হোসেন (২০) নামে একজনের লাশ শনাক্ত করে লাশ নিয়ে গেছেন স্বজনরা। সোলায়মানের পিতা মৃত সোহরাব হোসেন। গ্রামের বাড়ি টাঙ্গাইলের মধুপুরে।
