কিছু কিছু কাজ আছে যা মানুষের চোখে ধরা পড়ে না। কিন্তু সেসব উদ্যোগ একটি জাতি ও দেশকে প্রতিনিধিত্ব করে। কিছু কিছু মানুষ আছেন যাদের কাজ সাধারণ্যে খুব পরিচিত নয়। তারা কাজ করেন নীরবে। দীর্ঘ নিষ্ঠা তাদের এমন উচ্চতায় নিয়ে যায়, যা তাদের সাধারণের কাতার থেকে বাইরে এনে দাঁড় করিয়ে দেয়। ইয়াসমিন আলী এবং তাঁর দল— সেই নিষ্ঠা, শ্রম এবং শৈলী নিয়ে আমাদের সামনে এসে দাঁড়ায়।
বাংলাদেশের একটি সাংস্কৃতিক দল যারা প্রায় ৫০টি ভাষায় গান গাইতে পারেন। এ সংগঠনের নাম ‘ঢাকা সাংস্কৃতিক দল’। যাদের শ্লোগান ‘বিশ্বের সব মাতৃভাষা রক্ষা করবে বাংলাদেশ।’ যে দেশের মানুষ ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছে। যে একুশে ফেব্রুয়ারি আজ বিশ্ব মাতৃভাষা দিবস। সেই দেশের একটি সাংস্কৃতিক দলের এই উদ্যোগ জাতি হিসেবে আমাদের গর্ব করার উপলক্ষ এনে দেয়। এই সংগঠনের পরিচালক ইয়াসমিন আলী বলেন, এই রকম একটি দল চালানো, তাকে ধরে রাখা বেশ কঠিন। কারণ খুব ঘন ঘন অনুষ্ঠান তো হয় না। তাছাড়া বিদেশি ভাষার গানটির শুদ্ধ উচ্চারণ শুদ্ধ সুর তুলে সেই গান রপ্ত করাটাও খুব সহজ কাজ নয়। আর যেহেতু আমরা বিদেশি ভাষার গান করি তাই দলের অন্য শিল্পীদের মাঝে উত্সাহ ধরে রাখাও বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি বলেন, আমাদের লক্ষ্য বাংলাদেশের যত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী রয়েছে তাদের গান সংগ্রহ করে তা গাওয়া। এরপর বিশ্বের প্রতিটি দেশের অন্তত একটি গান গাওয়ার উদ্যোগ নেয়া। জানি কাজটা খুব সহজ নয়। তবে চেষ্টা চালিয়ে যাব।
কত বয়স আপনার দলের? টিকে আছেন কিভাবে? জানতে চাইলে এই শিল্পী-সংগঠক বলেন, ত্রিশ বছর তো পেরিয়ে এলাম। আর টিকে আছি মানুষের ভালোবাসায়। যখন কোনো মঞ্চে, দূতাবাসে কিংবা প্রধানমন্ত্রীর কোনো অনুষ্ঠানে যাই, যেখানে বিদেশি অতিথিরা রয়েছেন। সেখানে সেই অতিথিদের দেশের জনপ্রিয় কোনো গান যখন গাই তখন তাদের চোখে খুশির ঝিলিক দেখি - সেই আনন্দই আমাদের শক্তি, আমাদের অনুপ্রেরণা। ইয়াসমীন আরো বলেন, আগে এ ধরনের গান গাইতে শুনতাম শিল্পী আবিদা সুলতানা, শাকিলা জাফরকে। তাদের মতো বড় শিল্পীদের পদাঙ্ক অনুসরণ করছি আমরা। এটা ভাবলেও তো একটা আনন্দ হয়।
যেভাবে শুরু: নব্বইয়ের দশকে ‘ঢাকা সাংস্কৃতিক দল’ এর প্রতিষ্ঠা। এই ধরনের ব্যতিক্রমী উদ্যোগের শুরুটা কিন্তু একবারেই হুট করে। ইয়াসমিন বলেন, এ সংগঠনের সভাপতি বর্তমানে শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকী ভাই। জার্মানিতে ওয়ার্ল্ড চিলড্রেন্স থিয়েটার ফেস্টিভ্যালে গেছি। সেখানে সব দেশের জন্য একটি করে দিন রাখা হয়, যেখানে তারা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশন করবে। সেখানে বিভিন্ন দেশ তাদের দেশের গান ও নৃত্য পরিবেশন করছিল।
কিন্তু এই গান সংগ্রহ করার বিষয়টি খুব সহজ নয়। হাল আমলে ইউটিউব এসেছে। কিন্তু তার আগে বিভিন্ন দূতাবাসে গিয়ে কালচারাল অফিসারদের কাছে ধর্ণা দিয়ে গান জোগাড় করতে হতো। কেউ কেউ আমাদের আগ্রহকে উত্সাহ দেন, কারোর এসব কাজে সময় দেওয়ার সময় থাকে না। কিন্তু আমরা কখনোই উদ্যোম হারাইনি।
বর্তমানে দলটির সদস্য সংখ্যা ১৩। যারা গত নয় বছর ধরে এক সঙ্গে কাজ করছেন। এদের প্রায় সবাই বিভিন্ন মিউজিক কলেজ থেকে লেখাপড়া শেষ করেছেন। যারা দেশ ও বিদেশ অনুষ্ঠান করছেন। এ পর্যন্ত দলটির ৫টি দেশাত্মবোধক গানের সিডি প্রকাশিত হয়েছে। যা প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি।
যেসব দেশের গান গায় দলটি: সাধারণত যেসব দেশের গান দলটি করে থাকে সেগুলো হলো— মরক্কো, মালয়েশিয়া, শ্রীলঙ্কা, রাশিয়া, নেদারল্যান্ড, নাইজেরিয়া, আফগানিস্তান, কম্বোডিয়া, নেপাল, মেক্সিকো, ইন্ডিয়া, মিয়ানমার, কিউবা, মোজাম্বিক, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া, ভানুয়াতু, দক্ষিণ কোরিয়া, মঙ্গোলিয়া, ভুটান, ব্রুনাই, পাকিস্তান, ইউক্রেইন, ইতালি, জাপান, ব্রাজিল, ভিয়েতনাম, পাপুয়া নিউ গিনি, মালদ্বীপ, অস্ট্রেলিয়া, মিশর, ফিলিপাইন, ফ্রান্স, পূর্ব তিমুর, চায়না, সুইজারল্যান্ড, থাইল্যান্ড, ফিজি, জার্মানি, আমেরিকা, বাংলাদেশ প্রভৃতি।
