একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট আয়োজিত গণশুনানিতে অংশ নিয়ে ভোটের নানা অনিয়ম, কারচুপির বিবরণ দিলেন ফ্রন্টের প্রার্থীরা। গতকাল শুক্রবার সকাল ১০টা থেকে বিকাল পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত গণশুনানিতে সভাপতির বক্তব্যে ঐক্যফ্রন্টের আহ্বায়ক ড. কামাল হোসেন বলেন, গণশুনানিতে বিচারক প্যানেলে যারা রয়েছেন-বিচার করার ক্ষমতা তাদের নেই। মূল বিচার হবে নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে। গণশুনানিতে যেসব বক্তব্য আসবে সেগুলো রেকর্ডে রাখা হবে, তা পরবর্তী সময়ে বই আকারে প্রকাশ করা হবে।
পবিত্র কোরআন থেকে তেলাওয়াত এবং গীতা ও ত্রিপিটক পাঠের মাধ্যমে গণশুনানি শুরু হয়। শুনানির শুরুতে চকবাজারের চুড়িহাট্টায় অগ্নিকাণ্ডে নিহতদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। বিএনপি মহাসচিব ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মুখপাত্র মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নিহতদের স্মরণে শোক প্রস্তাব পাঠ করেন।
গণশুনানির শুরুতে ড. কামাল বলেন, গণশুনানি হচ্ছে, প্রার্থীরা জনগণের উদ্দেশে বক্তব্য রাখবেন। বিচার হবে ট্রাইব্যুনালে। আর গণআদালত যেটা বলা হয়, সেটার বিচার জনগণ করবে। আমরা এসেছি অনুষ্ঠানটা সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য। গণশুনানির মূল উদ্দেশ্য সংবিধানের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো। তিনি আরও বলেন, ভোটাধিকার রক্ষার জন্য আমরা স্বাধীনতা যুদ্ধ করেছিলাম। সংবিধানের সপ্তম অনুচ্ছেদে লেখা আছে, জনগণ ক্ষমতার মালিক। এবার যে নির্বাচন হয়েছে, সেটা নিয়ে প্রার্থীদের অনেকে ট্রাইব্যুনালে মামলা আকারে ফাইল করেছেন।
ড. কামালের বক্তব্যের পর মির্জা ফখরুল বলেন, ৩০ ডিসেম্বর দেশে একটি প্রহসনের নির্বাচন করা হয়েছে। দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ না থাকায় যা ইচ্ছা তা-ই করছে সরকার।
গণশুনানিতে সাত সদস্যের বিচারক প্যানেলে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমেদ, শিক্ষক অধ্যাপক নুরুল আমিন ব্যাপারী, অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী, ড. আসিফ নজরুল, সাবেক বিচারক আ ক ম আনিসুর রহমান খান ও আইনজীবী মহসিন রশিদ।
প্রার্থীরা যা বললেন
২৯৮ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা ধানের শীষের প্রার্থীদের গণশুনানিতে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এছাড়া গত নির্বাচনে যারা বিভিন্নভাবে হয়রানির শিকার হয়েছেন তাদের অভিজ্ঞতা শোনা হয় গণশুনানিতে। তবে ২০ দলীয় জোটের শরিক জামায়াতে ইসলামীর কোনো প্রার্থী গণশুনানিতে আসেননি।
গণশুনানিতে ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী ও গণফোরামের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ড. রেজা কিবরিয়া অভিযোগ করে বলেন, সাদা পোশাকে তার কর্মীদের তুলে নেওয়া হয়। নির্বাচনের দেড় মাস আগে থেকেই কর্মীরা বাড়িছাড়া হয়েছেন। ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী ও নাগরিক ঐক্যের নেতা এস এম আকরাম বলেন, সভা-সমাবেশ করতে মঞ্চ তৈরির জন্য নিজের এলাকা থেকে লোক পাওয়া যায় না। বাইরে থেকে লোক আনতে গেলে বাধা দেওয়া হয়। মুন্সিগঞ্জ থেকে মাইক ভাড়া করে আনতে হয়েছে। সিরাজগঞ্জের ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী ও কণ্ঠশিল্পী রুমানা মাহমুদ কনক চাপা অভিযোগ করেন, তার প্রচার মিছিলে পুলিশ গুলি চালিয়েছে। গুলিতে তার কর্মী মেরী বেগমের দুই চোখ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বক্তব্য রাখার সময় তিনি মেরী বেগমকে নিয়ে মঞ্চে ওঠেন। মেরী বলেন, তাকে ভোট দেওয়ার অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে, নয়তো চোখ ফেরত দিতে হবে।
কুড়িগ্রাম থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা জেনারেল (অব.) আমসা-আ-আমিন বলেন, ৩০ ডিসেম্বর ভোট হয়নি। যা হয়েছে তা ডাকাতির চেয়েও ভয়ঙ্কর। তিনি জেলায়-জেলায় গণআদালত গঠনের পরামর্শ দেন। রাজশাহী সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র মিজানুর রহমান মিনু বলেন, নির্বাচনের আগে তার এলাকায় মোড়ে-মোড়ে নেতাকর্মীদের বিভিন্ন ধরনের সাদা পোশাকের বাহিনী কড়া নজরদারিতে রাখে। তিনি বলেন, ভোট ডাকাতির নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পরাজিত হয়েছে, জয়ী হয়েছে ঐক্যফ্রন্ট।
বিএনপি নেতা রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলুর স্ত্রী সাবিনা ইয়াসমিন ছবি বলেন, নির্বাচনে তার সাথে দলের পুরুষ কর্মী রেখে বিপাকে পড়তে হয়েছে। কারণ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা প্রশাসনের সহায়তায় তাদের হাতুড়ি পেটা করত। আর এজন্য নারী কর্মী নিয়ে প্রচারণা চালাতে হয়েছিল। তাতেও লাভ হয়নি, কারণ তারা ভোট ডাকাতির মাধ্যমে নির্বাচিত হতে চেয়েছিল। বিএনপি নেতা শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি বলেন, বাংলাদেশসহ সারা বিশ্ব জানে কীভাবে তার এলাকায় ভোট ডাকাতির মঞ্চায়ন হয়েছে। ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনই পারবে জনগণের বিজয় ফিরিয়ে আনতে ও গণতন্ত্র মুক্ত করতে।
গাজীপুর-৩ (শ্রীপুর) আসনে ‘ধানের শীষ’ প্রতীকে নির্বাচন করা ইকবাল সিদ্দিকী বলেন, একের পর এক মামলা দিয়ে ঐক্যফ্রন্টের নেতাকর্মীদের কার্যত এলাকা ছাড়া করে দেওয়া হয় নির্বাচনের অনেক আগেই। প্রশাসনের সহায়তায় তারা মসজিদের খতিব প্রবীণ আলেমকে পর্যন্ত মামলা থেকে রেহাই দেয়নি। কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর কন্যা কুড়ি সিদ্দিকী বলেন, এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ চোর হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। আর ঐক্যফ্রন্ট প্রকৃত অর্থেই বিজয়ী হয়েছে। ঐক্যফ্রন্ট মানুষের মন পেয়েছে, আর আওয়ামী লীগ তাদের মন থেকে চিরতরে মুছে যাচ্ছে।
বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা হাবিবুর রহমান হাবিব জানান, তার এলাকায় ২৯ ডিসেম্বর রাতে একদফা ভোট কাস্ট হয়ে গেলেও প্রশাসন পুরোপুরি বিজয়ী হবার ব্যাপারে নিশ্চিত ছিল না। এজন্য দিনের বেলায়ও ভোট চুরি করতে কেন্দ্রে ভোট চুরির মহোত্সবে মেতে ওঠে। এ ধরনের কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করতে যাওয়ায় তাকে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা প্রশাসনের সহায়তায় কুপিয়েছে বলে জানান।
গণশুনানিতে আরও উপস্থিত ছিলেন বিএনপির নেতা ড. আবদুল মঈন খান, সেলিমা রহমান, শামসুজ্জামান দুদু, জেএসডির সভাপতি আ স ম আবদুর রব, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর আবদুল কাদের সিদ্দিকী, নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না, গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি সুব্রত চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মোহসীন মন্টু, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী প্রমুখ।
