মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে

আপডেট : ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ২১:৪৭

‘এক বছরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০০ শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা’—আঁচল ফাউন্ডেশন সম্প্রতি ভাচু‌র্য়ালি সম্মেলনে এ তথ্য প্রকাশ করেছে। দেশের গণমাধ্যমেও প্রকাশিত হয়েছে উদ্বেগজনক এ তথ্য। সংগঠনটি জানায়, দেশের প্রায় ৫০টি জাতীয় ও স্থানীয় পত্রিকায় প্রকাশিত আত্মহত্যার সংবাদ বিশ্লেষণ করে সংখ্যাটি তারা সংগ্রহ করেছে। শুধু শিক্ষার্থীই নয়, যে কোনো মানুষের আত্মহত্যা অত্যন্ত বেদনাদায়ক এবং আতঙ্কের।

মানুষ কেন আত্মহত্যা করে, তা নিয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। আবেগপ্রবণতা এবং অস্থিরতা মানুষকে আত্মহত্যায় প্ররোচিত করে—মনোবিজ্ঞানীরা এমনই বলেন। উন্নয়নশীল দেশের মানুষ বেশি আবেগী। আমাদের দেশও এ কাতারে। আমাদের দেশের সাধারণ মানুষ আর্থসামাজিক, রাজনৈতিক সচেতনতার ক্ষেত্রেও অনেক পিছিয়ে। সামাজিক অস্থিরতা, দরিদ্রতা, অশিক্ষা, প্রতারণা, বেকারত্ব, সম্পর্কের জটিলতাসহ নানা ক্ষেত্রে পরাজিত হতে পারে মানুষ। কিন্তু যারা এ অভিঘাত সহ্য করার মানসিকতা, ধৈর্য হারিয়ে ফেলেন, তারাই হয়ে ওঠেন আত্মঘাতী। আঁচল ফাউন্ডেশনের পর্যালোচনায় বিষয়টি ফুটে উঠেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্পর্কের কারণে আত্মহত্যা করেছেন ২৪.৭৫ শতাংশ, পারিবারিক সমস্যার কারণে ১৯.৮০ শতাংশ, মানসিক যন্ত্রণার কারণে ১৫.৮৪ শতাংশ, পড়াশোনার কারণে ১০.৮৯ শতাংশ এবং আর্থিক সমস্যার কারণে ৪.৯৫ শতাংশ। এটা ঠিক, বিশ্বব্যাপী মহামারি করোনার কারণে আমাদের দেশে সামাজিক, আর্থিক ও পারিবারিক চাপ বেড়েছে। শিক্ষার্থীরা ঘরের মধ্যে বন্দি থেকে প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে পড়েছে। এভাবে থাকতে থাকতে দৈহিক এবং মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে অনেক শিক্ষার্থী। অনেকের চাকরির বয়সও অতিক্রম করেছে। এসব ঘটনা শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার পেছনে বড় নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে। প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, অনার্স পড়ুয়া তৃতীয় এবং চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার হার ৩৬.৬৩ শতাংশ, যা তুলনামূলক বেশি। আত্মহত্যাকারীদের একটা বড় অংশ পুরুষ শিক্ষার্থী। সর্বমোট ৬৫ জন পুরুষ শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে, যা মোট শিক্ষার্থীর ৬৪.৩৬ শতাংশ। অন্যদিকে, নারী শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে এ সংখ্যাটা ছিল ৩৬ জন বা ৩৫.৬৪ শতাংশ। নারী কিংবা পুরুষ যে-ই হোক না কেন, আত্মহত্যা কোনো কিছুর সমাধান হতে পারে কি?

আমাদের সমাজব্যবস্থা এখনো নারীর অনুকূলে নয়। নারীর প্রতি নানান সংহিংসতা, নির্যাতন থেকেই বিষয়টি স্পষ্ট। নারীরা নানামুখী হয়রানির শিকার হয়ে আত্মহননের মতো ভয়াবহ পথে পা বাড়ায়। পারিবারিক কলহ, সামাজিকভাবে নিঃগৃহীত হওয়া, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিরোধ, হতাশা, বেকারত্ব, কর্মক্ষেত্রে হয়রানি, প্রেমবিচ্ছেদ, বন্ধুত্বের মধ্যে মনোমালিন্যসহ নানাবিদ সমস্যায় আত্মঘাতী প্রবণতা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্রমোন্নতিতে মানুষের জীবনে এনেছে সুখ ও সমৃদ্ধি। সেই সঙ্গে এনেছে বিপুল চাহিদা ও প্রত্যাশা। অথচ মানুষ তার প্রত্যাশা মতো চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে। সবার মধ্যে এক ধরনের প্রতিযোগিতা চলে। প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়া মানুষগুলো আক্রান্ত হয় প্রবল হতাশায়। বিশেষ করে তরুণ-তরুণী, শিক্ষার্থী, যুবরাই এতে বেশি আক্রান্ত হয়ে থাকে। এতে তাদের মধ্যে আত্মহননের প্রবণতা অতিমাত্রায়। যেহেতু শিক্ষার্থীরা আগামী দিনের সম্পদ, তাই এরা যাতে আত্মহত্যা না করে সে ব্যাপারে উদ্যোগ নিতে হবে।

একটি গবেষণার তথ্য মতে, প্রতি পাঁচ জনের এক জন মানুষ কোনো না কোনো ধরনের ডিপ্রেশন ভুগছেন। গবেষকরা বলছেন, এর ভয়াবহ দিকটি হচ্ছে আক্রান্তরা নীরবে আত্মহত্যা করেন। আমাদের দেশের ১৮ থেকে ২০ ভাগ মানুষ ডিপ্রেশন ভুগছেন। তরুণদের মধ্যেই এই প্রবণতা বেশি। দেখা গেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘোষণা দিয়ে কিংবা বন্ধুকে লাইভে রেখেও আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে। এ প্রবণতা অত্যন্ত আশঙ্কার জন্ম দেয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘মানসিক চাপ, হতাশা, আত্মবিশ্বাসের অভাব, অবসাদ ও হেনস্থার শিকার হয়ে মানুষ আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে।’ ফলে, এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ ঘটাতে সংশ্লিষ্টদের উদ্যোগ নিতে হবে। পত্রিকা থেকে জানা গেছে, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান এবং জবি শিক্ষার্থীদের কাউন্সিলিং কমিটির সভাপতি অধ্যাপক ড. নূর মোহাম্মদ বলেছেন, আত্মহত্যার যে প্রবণতা তা একদম শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা সম্ভব নয়, তবে এমন মানসিক অবস্থাসম্পন্ন শিক্ষার্থীর জন্য তার পরিবার, বন্ধুবান্ধব ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে নিজ নিজ ক্ষেত্রে যথেষ্ট ভূমিকা পালন করতে হবে। আত্মহত্যা রোধে পরিবার থেকেও উদ্যোগ নিতে হবে। শিক্ষার্থীরা যাতে অবসাদে না ভোগেন সেজন্য পিতা-মাতা, অভিভাবকদের সজাগ ও সতর্ক থাকা জরুরি।

‘মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে/ মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই।/ এই সূর্যকরে এই পুষ্পিত কাননে/ জীবন্ত হৃদয়-মাঝে যদি স্থান পাই।’ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতার এ বাণীকে আত্মস্থ করতে পারলে মানুষ আত্মহত্যার মতো ঘৃণ্য পথে অগ্রসর হতো না। আত্মহত্যা মূলত একটি মানসিক ঘটনা। এই বিপজ্জনক প্রবণতা রোধে সরকারি-বেসরকারি সব পর্যায় থেকে জনসচেতনতামূলক কর্মকাণ্ড বাড়ানো দরকার। দেশের সব কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়েও কাউন্সিলিংয়ের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ ব্যবস্থা আছে, সেখানেও নিয়মিত কাউন্সিলিং পরিচালনা করা দরকার। আবার সব ধর্মে আত্মহত্যা নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। আত্মহত্যা প্রবণতা রোধে সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে। এ কাজে বেসরকারি সংস্থাগুলোকে সম্পৃক্ত করা যেতে পারে। সমাজ থেকে নানামুখী অস্থিরতা দূর করা গেলে আত্মহত্যা প্রবণতা অনেকাংশে কমবে বলে আশা করা যায়। আত্মহত্যা কোনো সমাজের জন্য শুভ হতে পারে না।

লেখক: শিক্ষার্থী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজ 

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন