করোনা সংক্রমণ বৃদ্ধির কারণে গত ২২ জানুয়ারি থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে ২২ জানুয়ারি করোনা পরিস্থিতি যেমন ছিল তা ক্রমেই বাড়ছে এবং সেটি কমার সম্ভাবনা ক্ষীণ। ইউনিসেফ বারবার বিশ্বের সরকারগুলোকে বন্ধ রাখা স্কুল খুলে দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছে এবং কোনো অবস্থাতেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ না করার আহ্বান জানিয়ে আসছে।
করোনার সংক্রমনের ঊর্ধ্বগতি সত্ত্বেও বিশ্বের অনেক দেশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করেনি। কিন্তু আমাদের দেশের বাস্তবতায় শিক্ষার্থীর তুলনায় যে অবকাঠামো আছে, সেখানে পশ্চিমা দেশগুলোর মতো স্বাস্থ্যবিধি মানা অনেকটাই কঠিন। তাছাড়া সংক্রমণ বিশেষজ্ঞদের মতামত মেনেই শিক্ষার্থীদের সুরক্ষার কথা ভেবে সরকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করে। কিন্তু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ কি শিক্ষার্থীদের বাসায় রাখতে পেরেছে? শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাদে দেশের সব কিছু খোলা। স্বাস্থ্যবিধি মানতে সরকারের কড়া নির্দেশনা থাকলেও তা মানতে সব ক্ষেত্রেই অনীহা পরিলক্ষিত হচ্ছে। শিক্ষার্থীরাও বাণিজ্যমেলায় যাচ্ছে, মার্কেটে যাচ্ছে, পার্কে যাচ্ছে, খেলা করতে মাঠে যাচ্ছে, স্বাস্থ্যবিধি না মেনে বাইরে যাওয়া পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে মিশছে, তাহলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কেন নয়?
শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য সরকারের যে সিদ্ধান্ত তা কি আদৌ ফলপ্রসূ হচ্ছে? শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ নিয়ে সারা দেশের জন্য অভিন্ন সিদ্ধান্ত শহরে এবং গ্রামের শিক্ষার্থীদের মধ্য একটা গ্যাপ সৃষ্টি করছে। অফলাইনে শিক্ষাকার্যক্রমে বন্ধ থাকলেও অনলাইনে ক্লাস চলছে। কিন্তু শহরের অসচ্ছল পরিবারের শিক্ষার্থীরা এবং গ্রামের অধিকাংশ শিক্ষার্থীরা ডিভাইস এবং ইন্টারনেটের অভাবে সেটিতে যুক্ত হতে পারছে না।
দেশে করোনা সংক্রমণের হার এবং মোট আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে থাকলেও দেশের সর্বত্র করোনা পরিস্থিতি একই রকম না। ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহীসহ বড় বড় শহরে করোনা সংক্রমণের হার বেশি আবার ছোট শহরগুলোতে এই হার কম। গ্রাম আর শহরের করোনা পরিস্থিতির মধ্যে অনেক ব্যবধান। তাহলে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য একই নিয়ম ফলদায়ক হচ্ছে? করোনার কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছুটি আরো বাড়ানো কোনো সমাধান হতে পারে না। যদি সম্ভব হয়, সারাদেশে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দিতে হবে। আর যদি তা সম্ভব না হয় তাহলে—প্রথমত, গ্রামের স্কুলগুলো পুরোপুরি খুলে দিতে হবে। শিক্ষার্থীরা যেভাবে বাইরে ঘোরাফেরা করছে তার থেকে ক্লাস রুম অনেক নিরাপদ। তবে স্বাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। দ্বিতীয়ত, সংক্রমণের হার বিবেচনা করে যেসব শহরে সংক্রমণ বেশি সেখানে স্কুলগুলোতে আরো কিছু দিন অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম চালানো যেতে পারে। অথবা দুই-তিন শিফট করে ক্লাস নেওয়া যেতে পারে। শহরে স্কুলে পড়ুয়া সব পরিবারের ছেলেমেয়েদের অনলাইনে ক্লাস করার সক্ষমতা নেই। তাই চলামান টিকা কার্যক্রম দ্রুত শেষ করে সব শিক্ষার্থীকে ক্লাসে ফেরাতে হবে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার ফলে আমাদের শিশুদের অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে। এর আগে দীর্ঘদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার ফলে যত শিক্ষার্থী স্কুল থেকে ঝরে পড়ে তার সিংহ ভাগই গ্রামের শিক্ষার্থী। এই ধারা আবার শুরু হবে যদি শিক্ষার্থীদের স্কুলে ফেরানো না যায়। ৩১ জানুয়ারির মধ্যে ১২ থেকে ১৭ বছর বয়সি সব শিক্ষার্থীকে নূন্যতম এক ডোজ টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল, যদি তা শেষ না হয় তাহলে দ্রুততম সময়ের মধ্য শতভাগ বাস্তবায়ন করে ফেলতে হবে। শিক্ষার্থীরাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রাণ। করোনার মধ্যে বাণিজ্য মেলা, মার্কেট, বাজার বা খেলার মাঠ নয়, শিক্ষার্থীদের ফেরাতে হবে আপন নীড়ে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা কোনো সমাধান হতে পারে না।
লেখক: শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
