রেলওয়ের জমি নিয়ে দ্বন্দ্ব

মগবাজারে ৩ খুন: পরিকল্পনাকারী শীর্ষ সন্ত্রাসী রনি

আপডেট : ২৯ আগস্ট ২০১৪, ২১:৫৬
 
জেল থেকে জামিনে মুক্তি পেয়ে বিদেশ আত্মগোপন করা শীর্ষ সন্ত্রাসী তানভীরুজ্জামান খান ওরফে রনির পরিকল্পনায় মগবাজারে গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে তিনজনকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। রনির অন্যতম সহযোগী কাইল্যা বাবু ওরফে কলকি বাবু এই খুনের নেতৃত্ব দেয়। বৃহস্পতিবার রাতে গুলির সময় কাইল্যা বাবুর সাথে তার গ্রুপের রিহাম, শোভন, মারুফ, মোশারফ, আলামিনসহ ১০ জন আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে হামলা চালায়। গুলির ঘটনার টিনশেড ঘর থেকে পুলিশের উদ্ধার করা দুইটি চাপাতি বাবুর প্রতিপক্ষ শামীম ওরফে কালাচাঁনের ক্যাডার বাহিনী ব্যবহার করতো। দখল করা সোয়া এক কাঠা জমির ওপর ৫ টি টিনশেড ঘর নিয়ন্ত্রন করতো। কাঁলাচান একটি ঘরে তার ক্যাডার বাহিনীর বিল্লাল ও মুন্নাকে থাকতে দিয়েছিল। কাইল্যা বাবুর বাহিনীর গুলি করার সময় ঐ ঘরে অবস্থান করা বিল্লাল ও মুন্না চাপাতি দিয়ে আত্মরক্ষা করতে গিয়েও পারেনি। ঘরের ভিতর গুলি করে ফেরার সময় রাস্তায় কালাচাঁনের বোন রানু বেগম বৃষ্টির দেখা পায়। সেখানেই রানুকে সন্ত্রাসীরা গুলি করে। রানু বেগম মগবাজারের ডাক্তার গলির ব্র্যাক স্কুলের শিক্ষিকা ছিলেন। এর আগে হামলার আগে কাইল্যা বাবু গ্রুপ পাশেই মগবাজারের সোনালীবাগের ৭৮/২ নম্বর বাড়ির নীচতলায় হামলা চালায়। ঐ বাড়ির নীচতলায় রেলওয়ে শ্রমিক লীগ মগবাজার ইউনিট শাখার সাধারণ সম্পাদক শামীম ওরফে কাঁলাচান ভাড়া থাকেন। ঐ বাড়ির তৃতীয় তলায় রানু বেগম তার দুই সন্তান সামির (১০) ও সাব্বির (৬) কে নিয়ে থাকতেন। নীচতলায় কাঁলাচানকে না পেয়ে বাবু গ্রুপের ক্যাডাররা তৃতীয় তলায় গিয়ে রানু বেগমকে খুঁজতে থাকে। সেখানে তাকে না পেয়ে তারা পাশে এক সময় রনির দখলে থাকা সোয়া এক কাঠা জমির ওপর টিনশেড ঘরে হামলা চালায়।
টিনশেড ঘরগুলো দুবাইয়ে আত্মগোপন করার পর রনির কাছ থেকে কাইল্যা বাবু নিয়ন্ত্রন নেয়। কিন্তু সম্প্রতি কালাচান ও রানু বেগম এই টিনশেড ঘরগুলো দখল নিয়ে ভাড়া দেন। এ নিয়ে এক মাস আগে কাইল্যা বাবু তার ক্যাডার বাহিনী নিয়ে টিনশেড ঘরের সামনে কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছুঁড়ে ভয় দেখিয়ে গিয়েছিল। সর্বশেষ বৃহস্পতিবার রাতে কাইল্যা বাবু তার ক্যাডার বাহিনী দিয়ে গুলি করলে রানু বেগম (৩০), বিল্লাল (২৫) ও মুন্না (২০) নিহত হয়। এসময় রানু বেগমের ভাই হূদয় গুলিবিদ্ধ হয়। হূদয় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিত্সাধীন।
এদিকে, আজ শুক্রবার বিকালে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গে ময়না তদন্ত শেষে তিন লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. সোহেল মাহমুদ লাশগুলোর ময়নাতদন্তের পর জানান, গুলিবিদ্ধের কারণেই ঐ তিনজন নিহত হয়েছেন। তিনি আরো জানান, নিহত মুন্নার পেটের ডান পাশের উপরের দিকে শরীরে অস্ত্র ঠেকিয়ে ১ রাউন্ড গুলি করা হয়। বিল্লালের পেটের বামপাশে একটি গুলিবিদ্ধ ছিল। রানু বেগমের বুকের বামপাশে একটি এবং হাতে একটি গুলিবিদ্ধ ছিল।
অন্যদিকে, গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে এই খুনের পর পুলিশ কাইল্যা বাবুর দুই চাচী চায়না বেগম ও চম্পা বেগমকে আটক করে। পুলিশের রমনা বিভাগের উপ-কমিশনার মোহাম্মদ ইকবাল জানান, কাইল্যা বাবু সম্পর্কে তথ্য জানার জন্য তার দুই নারী আত্মীয়কে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। শুক্রবার বিকালে তাদের ছেড়ে দেয়া হয়েছে।
 
কে এই কাইল্যা বাবু : বিদেশে আত্মগোপন করা শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান-রনি গ্রুপের অন্যতম ক্যাডার এই কাইল্যা বাবু। গত ২০ মার্চ মগবাজারের ওয়্যারলেস গেট এলাকার টিএন্ডটি কলোনীর আনসার ক্যাম্পের আনসার সদস্য আব্দুল আলীম খুন হয়। রনির আরেক ক্যাডার জাকির গ্রুপ এই খুন করে পুলিশের তদন্তে বেরিয়ে এসেছে। জাকির গ্রুপেই কাইল্যা বাবুর হাতে অস্ত্রের খড়ি। ২০০৯ সালে মেরুল বাড্ডা তোবা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক দেলোয়ার হোসেনকে খুন করতে গিয়ে সন্ত্রাসীদের গুলিতে তার শ্বশুর নিহত হয়। শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান তোবা গ্রুপের কাছ থেকে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা চেয়েছিল। চাঁদা দিতে অস্বীকার করায় তাদের ক্যাডার জাকির, কাইল্যা বাবু, শরীফসহ অন্তত ১০ জনের একটি গ্রুপ দিয়ে ঐ হামলা চালায়। জিসান বিদেশে আত্মগোপন করার পর জাকির, কাইল্যা বাবুসহ অন্যরা আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী রনির নির্দেশ মেনে চলতো। চলতি বছরের ২৩ জানুয়ারি মগবাজার মসজিদ গলিতে ওয়ার্ড যুবলীগ নেতা মাহবুবর রহমান রানাকে প্রকাশ্যে গুলি ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ঐ খুনের ঘটনায় পুলিশ কাইল্যা বাবু গ্রুপের কামরান, সালাম, বাদশাসহ ৫ জনকে গ্রেফতার করলেও তাকে গ্রেফতার করতে পারেনি। গত বছরের ২৭ অক্টোবর কাশিমপুর-১ কারাগার থেকে জামিনে ছাড়া পান শীর্ষ সন্ত্রাসী রনি। মুক্তির এক সপ্তাহ পর গুলশানের একটি কমিউনিটি সেন্টারে তার বিয়ের অনুষ্ঠান হয়। এরপর নববধূসহ রনি দুবাইয়ে পাড়ি জমান। দুবাই থেকে মগবাজারে এলাকার ডিশ ব্যবসার মাসে ১২ লাখ টাকার চাঁদার কমিশন পেতো রনি। রনির সাম্রাজ্য দেখাশুনার দায়িত্ব পায় জাকির ও কাইল্যা বাবু। এরপরই কাইল্যা বাবু মগবাজার এলাকায় অপ্রতিরোধ্য হয়ে যায়। কিন্তু রনির কাছে চাঁদা পাঠানো বন্ধ করে দেয় ওয়ার্ড যুবলীগ নেতা মাহবুবর রহমান রানা। নিজেই একটি গ্রুপ প্রতিষ্ঠা করায় রনির নির্দেশে জাকির-কাইল্যা বাবুর হাতে খুন হয় রানা।
 
রেলওয়ের জমি নিয়ে দ্বন্দ্ব:
পরিকল্পনায় ঘটনাস্থল সরজমিন করে এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলা হয়। এলাকাবাসীরা কাইল্যা বাবুর সন্ত্রাসী কার্যকলাপ নিয়ে এর আগেও পুলিশের কাছে বেশ কয়েকবার অভিযোগ দিয়েছিল। এলাকাবাসীরা জানায়, মগবাজারের সোনালীবাগ এলাকায় রেললাইনের পাশেই ২৫ বিঘা জমি রয়েছে। এই জমিগুলো এখন বেহাত হয়ে গেছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিগতভাবে রেলওয়ের কাছ থেকে লীজ নিয়ে জমিতে বাড়ি নির্মান করেছে। সোনালীবাগের এই সোয়া এক কাঠা জমি ছিল ২৫ বিঘা জমির সর্বশেষ প্রান্তের অংশ। এই সোয়া এক কাঠা জমির পাশেই কাইল্যা বাবুদের পৈত্রিক সম্পদ। সোনালী বাগের ৭৯ নম্বর পাঁচতলা বাড়ির মালিক আলাউদ্দিন খন্দকার। এই বাড়ির পাশেই ৭৮/১ নম্বর চারতলা বাড়ির মালিক তার আরেক ভাই জালাল খন্দকার। ঠিক পাশেই ৭৮/২ নম্বর তিন তলা বাড়ির মালিক তৃতীয় ভাই হেলাল খন্দকার। এই তিন বাড়ির ঠিক পিছনে ৭৮ নম্বর টিনশেড বাড়ির মালিক এই তিন ভাইয়ের এক মাত্র বোনের স্বামী খোরশেদ খন্দকার। খোরশেদ খন্দকারের নাতি আলোচিত কাইল্যা বাবু। একসময় এই টিনশেড বাড়িতে কাইল্যা বাবু থাকতো। কিন্তু এলাকায় সন্ত্রাসী কার্যকলাপের কারণে তার বাবা বাদল খন্দকার ছেলেকে ত্যাজপুত্র করে বাসা থেকে বের করে দেন। মগবাজারের বিভিন্ন মেসে কাইল্যা বাবু অবস্থান করে এই সন্ত্রাসী কার্যকলাপ চালায়। কাইল্যা বাবু তার দাদার বাড়ির পাশেই রেলওয়ের সোয়া এক কাঠা জমি ৭/৮ বছর আগে সন্ত্রাসী রনির সাহায্যে দখল করে। এলাকাবাসী জানতেন যে ঐ জমি রনি দখল করেছে। এ কারণে ভয়ে কেউ মুখ খোলেনি। রনির নামে টিনশেড ঘর তুলে সেখান থেকে ভাড়া আদায় করতো কাইল্যা বাবু। হেলাল খন্দকারের ৭৮/২ নম্বর বাড়ির নীচতলায় ভাড়া থাকেন শামীম ওরফে কালাচাঁন। ঐ বাড়ির তৃতীয় তলায় শামীমের বোন রানু বেগম বৃষ্টি পরিবার নিয়ে ভাড়া থাকেন। ৭/৮ মাস আগে কালাচাঁন কাইল্যা বাবুর দখল করা টিনশেড ঘর দখলে নেয়। এরপর থেকেই কাইল্যা বাবু ঐ টিনশেড ঘরগুলোর জন্য কালাচাঁনের কাছে ৩ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে আসছিল। কালাচাঁনের ভাই পরান অভিযোগ করেন এই ৩ লাখ টাকা চাঁদা না দেয়া কাইল্যা বাবু গুলি করে এই তিনজনকে হত্যা করেছে।
পুলিশের রমনা বিভাগের উপ-কমিশনার মোহাম্মদ ইকবাল জানান, তিন খুনের ঘটনায় শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত কোন মামলা হয়নি। এই খুনের পিছনে সম্ভাব্য কিলারদের গ্রেফতার করতে পুলিশের দুইটি টিম মাঠে কাজ করছে। অভিযুক্ত কাইল্যা বাবুর সম্ভাব্য অবস্থান শনাক্ত করা হয়েছে। তবে বাবু গ্রেফতার হলে এই খুনের রহস্য উন্মোচন হবে।
উল্লেখ্য, বৃহস্পতিবার রাত ৮ টার দিকে মগবাজারের সোনালীবাগে দখল করা রেলওয়ের সোয়া এক কাঠা জমির নির্মিত একটি টিনশেড ঘরে সন্ত্রাসীরা ঢুকে গুলি করে তিনজনকে হত্যা করে।
 
ইঅ/চৌফে/শ১০৬০