তুলার দাম কমলেও সুবিধা পাচ্ছে বস্ত্রখাত

আপডেট : ০২ সেপ্টেম্বর ২০১৪, ১৮:২৮
 
আন্তর্জাতিক বাজারে গত কয়েক মাস ধরে তুলার দাম পড়তি। গত তিন মাসে তুলার দাম কমেছে প্রায় ৩০ শতাংশ। টেক্সটাইল মিল মালিকরা বলছেন, এই দরপতনের ফলে দেশের বস্ত্র ও সুতা আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে অসম প্রতিযোগিতায় পড়বে। উম্মুক্ত হেজিং (দাম ওঠানামার ঝুঁকি এড়াতে বিশেষ ব্যবস্থা) সুবিধা না থাকায় দেশি তুলা আমদানিকারকরা তিন মাস আগের নির্ধারিত উচ্চ দরেই এখন তুলা নিতে বাধ্য হবেন। এতে দেশি সুতা ও বস্ত্রের খরচ বেশি হবে। কিন্তু অন্য দেশগুলোর হেজিং সুবিধা থাকায় সেসব দেশের তুলা আমদানিকারকেরা নিম্নমুখী দামের সঙ্গে সমন্বয় করে তুলা নিতে পারবেন। ফলে তারা কম দামে সুতা ও বস্ত্র উত্পাদন করতে পারবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, খরচ বেশি পড়ায় দেশীয় টেক্সটাইল মিলগুলোর উত্পাদিত সুতা ও বস্ত্রের চাহিদা কমবে। দেশীয় পোশাক প্রস্তুকারী প্রতিষ্ঠানগুলো কম দামে বিদেশ থেকেই সুতা ও বস্ত্র আমদানি করবেন। এতে দেশিয় টেক্সটাইল মিলগুলো বড় ধরনের হুমকির মধ্যে পড়ে যাবে। টেক্সটাইল মিল মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পূর্ণাঙ্গ হেজিং সুবিধার অভাবে বাংলাদেশের বাজার চলে যাচ্ছে প্রতিযোগী দেশ চীন, ভারত পাকিস্তানসহ অন্য দেশগুলোর দখলে। বাংলাদেশে উন্মুক্ত হেজিং সুবিধা না থাকায় মিল মালিকরা সব সময় দর পতনের পরও বেশি দাম দিয়ে তুলা এনে সুতা উত্পাদন করতে বাধ্য হন। ফলে বেশি খরচের সুতা ও বস্ত্র  বিক্রি করতে সমস্যায় পড়তে হয়। এবারও একই অবস্থার উদ্ভব হয়েছে। এর আগে ২০১০-১১ সালে একই সমস্যায় পড়ে অর্ধশত কারখানা বন্ধ হয়ে যায়। এবারও দ্রুত সমস্যার সমাধান করতে না পারলে শতাধিক কারখানা বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
উদ্যোক্তারা বলছেন, এমনিতেই স্পিনিং ও টেক্সটাইল কারখানাগুলোতে বর্তমানে অর্ডার খুব কম। কারখানাগুলো উত্পাদন ক্ষমতার অর্ধেকও ব্যবহার করতে পারছে না। এর মধ্যে তুলার আন্তর্জাতিক বাজারে দর কমার প্রভাব এ খাতকে আরও হুমকির মধ্যে ঠেলে দিবে। আর  দেশিয় প্রাইমারি টেক্সটাইল মিলগুলো বন্ধ হয়ে গেলে তুলা ও কাপড়ে পুরোপুরি আমদানি নির্ভর হয়ে পড়বে দেশ।
জানা গেছে, প্রতিযোগী দেশগুলোতে তুলা আমদানিতে উন্মুক্ত হেজিং সুবিধা থাকলেও বাংলাদেশে নেই। প্রতিটি ক্ষেত্রে পূর্বানুমোদন নেওয়ার শর্ত থাকায় দেশের সুতা উত্পাদকেরা তুলা আমদানিতে এই সুযোগ ব্যবহার করতে পারছেন না। এ অবস্থা থেকে মুক্তি চান টেক্সটাইল মিল মালিকরা।
হেজিং হচ্ছে ভবিষ্যত্ বাজারের দাম ওঠানামার ঝুঁকি এড়ানোর বিকল্প বিমা ব্যবস্থা। অস্বাভাবিকভাবে দাম বাড়লে ক্রেতারা পূর্বনির্ধারিত দরে আর কমে গেলে সর্বশেষ দরের সঙ্গে সমন্বয় করে তুলা আমদানি করতে পারেন। তুলা আমদানিকারকরা বলছেন, বর্তমানের শর্তযুক্ত ব্যবস্থা না হয়ে উম্মুক্ত হেজিং সুবিধা থাকলে যেকোনো সময় তাঁরা ঝুঁকি এড়ানোর ব্যবস্থা রেখে তুলা কিনতে পারতেন।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ) সূত্রে জানা গেছে, বিশ্ববাজার  থেকে তুলা কিনে কারখানায় উত্পাদনের জন্য মজুত করতে কমপক্ষে ৯০ দিন সময় লাগে। এই ৯০ দিনের মধ্যে দরপতন হলে সুতা উত্পাদনকারীকেই বহন করতে হয়। চীন ও ভারতসহ সুতা-কাপড় উত্পাদনকারী প্রায় সব দেশে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর তত্ত্বাবধানে সরাসরি হেজিং ব্যবস্থা চালু থাকায় তারা দরপতনের সঙ্গে সমন্বয় করে তুলা পান।
হেজিং করার ক্ষেত্রে দেশি ব্যাংকগুলোর সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আন্তর্জাতিক কমোডিটি এক্সচেঞ্জে এসব ব্যাংকের সরাসরি আমদানিকারকের অনুকূলে লেনদেনের সুযোগ নেই। আবার বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বানুমতি নিয়েও প্রাত্যহিক এই লেনদেন করা যায় না।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, এ ক্ষেত্রে সরাসরি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ওপর দায়িত্ব দিলে আমদানিকারকদের পক্ষে হেজিং সুবিধা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে। প্রতি বছর দেশে প্রায় ৫০০ কোটি ডলারের তুলা আমদানি হয়। এতো বড় অঙ্কের তুলা আমদানির ক্ষেত্রে হেজিং সুবিধা রাখার জোর দাবি টেক্সটাইল মিল মালিকদের।
এদিকে তীব্র গ্যাস সংকটের কারণে মিলগুলোতে স্বাভাবিক উত্পাদন চালু রাখা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি ২০১১ সালে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এখনো ঋণের বোঝা কাটিয়ে উঠতে পারেননি কারখানা মালিকরা। জানা গেছে, গ্যাসের অভাবে অনেক কারখানাতেই চাহিদা অনুযায়ী উত্পাদনও করতে পারছে না।