‘কেউ সিরিয়াল ভাঙবেন না। সবাই ধৈর্য ধরে দাঁড়ান। কারও বেশি সমস্যা হলে অন্য দিকে যেতে পারেন।’ হাতে লাঠি নিয়ে হনহন করে ছুটে বেড়াচ্ছেন আর লাইন ঠিক রাখার দৃঢ় চেষ্টা করছেন খান মঞ্জিলের কেয়ারটেকার দুলাল মিয়া।
‘ভাই, নতুন ব্যাংক বুঝি। আমিও শেয়ার জমা দিব। অন্য ব্যাংকে আরও বড় লাইন,’ এই বলে শহীদুল ভাইয়ের পিছনে দাঁড়ালেন পথচারী আকবর হোসেন।
শহীদুল ভাই বিরক্ত নিয়ে বললেন, ‘দেখতে পাচ্ছেন না এটা আবাসিক ভবন? এখানে কোনো ব্যাংক নাই।’
‘ঢাকা শহরে এমন অনেক আবাসিক ভবনে ব্যাংক আছে।’
‘ভাই, এটা অন্য লাইন। সকাল সকাল অযথা ঝামেলা বাঁধাবেন না। এমনিতেই কষ্টে আছি,’ বিরক্তি নিয়ে বললেন শহীদুল ভাই।
আকবর হোসেন বললেন, ‘আমিও কষ্ট করে কয়েক জায়গায় ঘুরে এসেছি। আপনি আপনার মতো দাঁড়িয়ে থাকেন। আমি এখানেই শেয়ারের আইপিও ফরম জমা দিব।’
শহীদুল ভাই আর কোনো কথা না বাড়িয়ে কেয়ারটেকারকে ডেকে বললেন, ‘দুলাল ভাই, আর কতজন আছে? আমি আর পারছি না।’
‘সামনে আরও পনের-বিশজন আছে। ঘণ্টাখানেক অপেক্ষা করতে হবে।’
‘ভাই, আমি গেলাম,’ বলে লাইন ছেড়ে ভবনের দোতালার দিকে দৌড় দিলেন শহীদুল ভাই।
লাইন ছাড়া যেতে পারবেন না বলে তার পিছনে ছুটলেন দুলাল মিয়া।
‘এভাবে আপনাকে জমা দিতে দিব না,’ বলে শেয়ার জমা দিতে আসা আকবরও দুলালের পিছনে দৌড় দিলেন।
শহীদুল ভাই দুজনকেই কয়েক গজ পিছনে ফেলে সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে থাকা অপেক্ষমানদের বাধা উপেক্ষা করে ভবনের দ্বিতীয় তলার দিকে উঠছেন। তিনি থামলে ঠিক বাথরুমের দরজার সামনে। তারপর বাথরুমের স্টিলের দরজায় একাধিক কিল ঘুষি দেওয়ার পর বেড়িয়ে এলো মিশুক, ‘স্যরি, একটু দেরি হয়ে গেছে শহীদুল ভাই।’
মিশুককে টেনে বাথরুম থেকে বের করে শহীদুল ভাই ঢুকেই দরজা বন্ধ করে দিলেন। ততক্ষণে ঘটনাস্থলে হাঁপাতে হাঁপাতে এলেন কেয়ারটেকার দুলাল ও শেয়ার জমা দিতে আসা আকবর। সবাই হইচই শুরু করেছে।
‘আপনারা ধৈর্য ধরে দাঁড়ান। আমি চেষ্টা করেও শহীদুল ভাইকে আটকাতে পারিনি। মিশুক বের হয়ে গেছে আর দেরি হবে না,’ বলে দুলাল আবার নিচের লাইন ঠিক রাখতে নিচে নেমে গেলেন।
তার সঙ্গে আকবরও বিরক্তি নিয়ে বিড়বিড় করতে করতে নেমে গেলেন।
দুই.
‘তোমার কী সমস্যা?’
‘আমার কোনো সমস্যা নাই।’
‘সমস্যা না থাকলে কেউ বাসর রাত বাথরুমে বসে থাকে?’ রাগান্বিত হয়ে মিশুকের সদ্য বিবাহিত স্ত্রী রেশমী বলল।
মিশুক বলল, ‘আমার টয়লেটে একটু দেরিই হয়।’
‘তিন বছর ধরে তোমার সাথে প্রেম করেছি। কখনো তো বলোনি।’
‘এসব বিষয় কাউকে বলা যায় নাকি?’
রেশমী বলল, ‘দেখো, মানুষের সমস্যা থাকতেই পারে। আধুনিক চিকিত্সায় ছেলেদের সব সমস্যা সমাধান সম্ভব।’
‘তুমি যা ভাবছ, তা না। ছোটবেলা থেকেই আমার এই সমস্যা।’
রেশমী ধমক দিয়ে বলল, ‘চেঁচামেচি করলে অন্যরাও জানবে। বিকালে চলো আমার সাথে। পরিচিত চর্ম ও যৌন রোগের একজন ভালো ডাক্তার আছেন।’
সদ্য বিবাহিত স্ত্রীর মন রক্ষা ও নিজের ইজ্জত রক্ষা করতে অনিচ্ছা সত্ত্বেও মিশুক রাজি হলো ডাক্তার দেখাতে।
তিন.
‘কী সমস্যা বলেন?’
‘কোনো সমস্যা নেই।’
ডাক্তার রেগে বললেন, ‘তাহলে এসেছেন কেন?’
‘স্যার, বউ জোর করে নিয়ে আসছে।’
ডাক্তার এবার নমনীয় হয়ে বললেন, ‘ডাক্তারের কাছে কোনোকিছু গোপন করতে নেই। কোনোরকম সংকোচ বোধ না করেই বলেন।’
‘স্যার, সমস্যা থাকলে তো বলব।’
মিশুককে থামিয়ে দিয়ে রেশমী বলল, ‘স্যার, লজ্জায় বলতে চাচ্ছে না। বিয়ের প্রথম রাত সে বাথরুমে বসে পার করেছে।’
মিশুক এবার কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, ‘স্যার, আমার বাথরুম করতে একটু দেরি হয়। আর কোনো সমস্যা নেই।’
মিশুকের কথায় ডাক্তার বিশ্বাস করলেন। তিনি বললেন, ‘পাশের রুমেই মেডিসিন বিশেষজ্ঞ বসেন। আপনি উনাকে দেখান।’
‘ঠিক আছে স্যার,’ বলে মিশুক চর্ম ও যৌন ডাক্তারের রুম থেকে বের হয়ে মেডিসিন বিশেষজ্ঞের রুমে ঢুকলেন। এবার রেশমী তার সঙ্গে না গিয়ে বাইরে অপেক্ষা করতে থাকল।
চার.
‘সমস্যা কী?’
‘স্যার, টয়লেট করতে বেশি সময় লাগে।’
‘কতক্ষণ লাগে?’
‘এই ধরেন ঘণ্টাখানেক।’
‘বলেন কী?’ মিশুকের কথা শুনে ডাক্তার চমকে উঠলেন।
‘পাইলস বা অন্য কোনো সমস্যা আছে?’
‘জি না স্যার।’
‘ঠিক আছে। আমি ওষুধ দিয়ে দিচ্ছি। এক সপ্তাহ পর আবার দেখা করবেন।
‘ঠিক আছে স্যার,’ বলে মিশুক ডাক্তরের চেম্বার থেকে বের হলো। তারপর বউকে নিয়ে বাসায় ফেরার পথে একটা ফার্মেসি থেকে ওষুধ কিনে নিল।
পাঁচ.
‘খাবার খেয়েছ। এবার ওষুধটা খেয়ে নাও,’ বলে রেশমী মিশুকের দিকে ওষুধ এগিয়ে দিল।
ওষুধ খাওয়া দশ পনের মিনিট পর মিশুক একটু মোচর দিয়ে উঠে দাঁড়াল। পেট কেমন করছে বলেই বাথরুমে ঢুকে গেল।
মিশুক কয়েক মিনিটের মধ্যেই বাথরুম থেকে বের হতে দেখে রেশমী বলল, ‘ওষুধটা অনেক ভালো কাজ করেছে। এক ডোজেই সুফল পাওয়া গেল।’
রেশমী আর কোনো কথা বলার আগেই মিশুক ‘আমার পেট কেমন করছে’ বলেই আবার বাথরুমে ঢুকে গেল।
মধ্যরাত পর্যন্ত মিশুক কয়েক মিনিট পর পর বাথরুমে যাচ্ছে আর বের হচ্ছে। রাত শেষের দিকে আর বাথারুম থেকে বের হওয়ার অবস্থা নেই মিশুকের।
পরদিন সকালে ডাক্তার বাসায় এসে মিশুকে খাবার স্যালাইনসহ নতুন ওষুধ দিল। একদিনের মধ্যে সেরে উঠল সে। তারপর সপ্তাহ খানেক পার হওয়ার আগেই রেশমী বুঝতে পারল মিশুকের অন্য কোনো সমস্যা নেই। মিশুকও বউকে খুশি রাখতে রাতের পরিবর্তে দিনেই বাথরুমে যায়। এতে খান মঞ্জিলের মতো দীর্ঘ লাইন না হলেও বউকে ঘণ্টাখানেক দাঁড়িয়ে থাকতে হয় বাথরুমে যাওয়ার জন্য।
কার্টুন জ্যোতি
