‘এ সময়ের লেখকরা কী সব ছাইপাশ যে লেখে না!’ বইমেলায় একজনকে এ কথা বলতে শোনা গেল। লোকটা যদিও ভাব করছে, সে কাউকে শোনাতে চায়নি। বিড়বিড় করে বলেছে কথাটা। কিন্তু হিরুর সন্দেহ রইল না, লোকটা আসলে মানুষের কানে পৌঁছনোর উদ্দেশ্য নিয়েই কথাটা বলেছে। নাহলে দশ হাত দূরে থেকেও তার কান অব্দি পৌঁছাল কী করে!
হিরু লোকটাকে ভালো করে অবজার্ভ করল। মধ্যবয়স্ক। চেহারায় তেমন কোনো বিশেষত্ব নেই। কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ। হাতে একটা বইয়ের প্যাকেট। মাথার চুলগুলো অধিকাংশই শীতকালের পত্রঝরা উদ্ভিদের মতো ঝরে গেছে। টেনশন, বয়স বৃদ্ধির ছাপ নাকি বংশগত? হিরু অতসব ভাবতে গেল না।
সে সরাসরি লোকটার সামনে গিয়ে দাঁড়াল, ‘আপনার খুব বই পড়া হয় বুঝি?’
লোকটা অপরিচিত হিরুকে দেখে বিন্দুমাত্র ভরকে না গিয়ে পরিচিত মানুষের মতো করেই বলল, ‘আর বলবেন না ভাই, কী যে কলিকাল আইলো না। সেই নব্বইয়ের দশকে ব্যাঙের ছাতার মতো ব্যান্ডের দল গইড়া উঠল। আর অহন সবাই লেখক হইবার চায়। এমুন কি, যারা একসময় কবিতা লিখত, তারাও কবিতা ছাইড়া লেখক হইবার চায়।’
‘আপনার বুঝি পড়ার অনেক অভ্যাস?’
‘পড়ার অভ্যাস তো সেই ছোটবেলা থাইকাই... জানেন তো, সেই দুই বছর থাইকা আমি একা একাই জামাকাপড় পরতাম। কতবার যে খাট থাইকা নিচে ধপাস কইরা পইড়া গ্যাছি!’
‘আর বই?’
‘বই পড়া, অ্যাঁ, অ্যাঁ।’
কথা বলার ভঙ্গি দেখে হিরুর সন্দেহ হলো লোকটা বোধহয় এড়িয়ে যেতে চাইছে!
‘জানেন, এ সময়কার পাঠকরা না বই-ই কিনবার চায় না। পুরা ছয় ঘণ্টা বইমেলায় ঘুইরা কাটাইয়া দিবে, কিন্তুক কারওর হাতেই বই দেখবেন না,’ লোকটা নিজে থেকেই বলতে লাগল। ‘আরে বাবা, আমাদের মতো হ। অগ্রজদের দেইখা শেখ। বেশি বেশি পড়লেই না ভালা লিখবার পারবে। ঠিক কিনা বলুন?’
হিরু কোনোমতে বলল, ‘একদম!’
‘অহন যারা লেখে, বুঝলেন, তাদের অধিকাংশই কপি-পেস্ট রাইটার। এই এহান থাইকা একটুক, ওহান থাইকা আরেকটুক টুকলি কইরা বড় বড় সাইজের সব বই রেডি কইরা ফালায়। চান্দুরা, আমাদের যুগের হলি বুঝতে মজা।’
‘কেন? আপনাদের সময়ে কী এমন বিশেষ ব্যাপার-স্যাপার ছিল?’
‘আমাদের সময়কার লেখকরা তো পাণ্ডুলিপি হাতেই লিখেছে। লেখার যে কত কষ্ট, তা কি এই কি-বোর্ড প্রজন্ম বুঝবার পারবে? তাও টাইপ করতে গ্যালে নাহয় কিছুটা হলেও টের পাইত। ওরা তো তাও করে না। গুগল, বুঝলেন সবই গুগল বাবাজির মাজেজা। জাস্ট কন্ট্রোল সি (কপি) আর কন্ট্রোল ভি (পেস্ট)-এর ব্যাপার-স্যাপার!’
হিরু জানতে চাইল, ‘এ সময়ের তরুণরা কি সত্যিই খুব খারাপ লেখে?’
‘তাহলে আর কইতাছি কী জনাব! ওরা কি লিখবার পারে? তারপরে না ভালা লেখার প্রসঙ্গ আইবো।’
‘ওও। ভুলেই গেছিলাম, এরা লিখতেই পারে না।’
‘চলেন।’
‘কোথায়?’
‘আমার লগে বইমেলায় ঘুরুন একটুক। নিজ চোহেই হালচাল দেখবার পারবেন।’
অপরিচিত সেই বই পাঠকের সঙ্গে হিরু বইমেলায় ঘুরতে লাগল। লোকটা বিভিন্ন স্টলের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় খুব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল।
‘দ্যাখেন কারওর হাতে বই নাই। সব ঘুরতে আইছে। আমার লাহান একখান বইও যদি কিনত...।’
‘ওহ। তাহলে উনার হাতের বইয়ের প্যাকেটটা উনার কেনা বইয়ের!’ হিরু স্বগতোক্তি করল।
‘ওই দেহেন দেহেন, পরিচিতজন পেয়ে ওই লেখক কিভাবে তার বইখানা গছায়ে দিল!’
হিরু তাকিয়ে দেখল এক তরুণ লেখক স্টলের ভিতরে বসে আছে। একজন পাঠক হাসিমুখে তার অটোগ্রাফ নিয়ে এখন সেলফি তোলায় ব্যস্ত।
হিরুর সঙ্গের লোকটা ফের বলতে লাগল, ‘সবই সাজানো বুঝলেন। ওই বই ক্রেতা লোকটা নির্ঘাত্ লেখকের পরিচিত। হয়তো লেখকই তারে টাকা দিয়া নিয়া আসছে। সেই টাকা দিয়াই বইটা কিনছে। সেলফিটাও নিশ্চয়ই লেখক মশাইয়ের বিশেষ অনুরোধে তোলা। এরপর লেখকের অনুরোধেই সে ফেসবুকে খুব ভালা ভালা কথা লেইখা পোস্ট করবে। কী অদ্ভুত প্রোমোশন, তাই না?’
হিরু কী বলবে বুঝতে পারল না। কোনোভাবেই দৃশ্যটা মেকি বলে মনে হলো না তার। এতদিন নিজের অবজার্ভেশনে তার বেশ আত্মবিশ্বাস ছিল। কিন্তু লোকটা যেন তার থেকেও কয়েক গুণ বেশি পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা নিয়ে জন্মেছে! দেখেই গরগর করে বলে দিচ্ছে সবকিছু। এ নিশ্চয়ই শার্লক হোমস-এর বাপ!
ওখান থেকে আরেকটু সামনে গিয়ে সেই লোকটা হিরুকে ফের বলল, ‘ওই লোকটিকে চেনেন?’
হিরু তার নির্দেশিত ব্যক্তিটিকে দেখে বলল, ‘না, তবে হাতে অনেকগুলো বই দেখে মনে হলো, তিনি ভালো বইপাঠক হবেন। আর...’
‘না।’ লোকটা তার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলল, ‘ওই লোকটা মোটেও কোনো পাঠক নয়। লেখক। বই চলে না। অহন বই চলে না দেইখা প্রকাশকের ঝাড়ি খাইয়া নিজের বই নিজেই কিনে নিয়া যাচ্ছে। ব্যাগটা চেক করলেই দেখবেন, সবই একই বই।’
‘সত্যিই এর পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা অসাধারণ।’ হিরু মনে মনে বলল। লোকটা তাকে মুগ্ধ করেছে! ‘কফি খাবেন?’ হিরু তাকে অফার করল।
‘কফি! তা খাওয়া যায় বটে...।’ লোকটা একটু ভাব নিল—যেন নিতান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও রাজি হয়েছে সে!
চা খেতে খেতে হিরুর সঙ্গীটি হঠাত্ কাউকে দেখে ‘এক মিনিট’ বলে উধাও হয়ে গেল। হিরু অবশ্য তাকে ছাড়ল না। লোকটা কী করে না করে, কিভাবে এতসব ‘নিখুঁত’ভাবে বলে দেয়—জানার খুব আগ্রহ জন্মাল তার মনে।
হিরু খেয়াল করে দেখল, লোকটা অন্য এক লোকের পিছু পিছু অনেকদূর গিয়ে, হঠাত্ পথঘুরে তার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
তৃতীয় ব্যক্তিটি তাকে দেখে যেন ভূত দেখার মতো চমকে উঠল। এড়িয়ে যেতে চাইলেও বাঁচতে পারল না। দ্বিতীয় লোকটা তার কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ থেকে একটা বই বের করে লোকটার হাতে ধরিয়ে দিল। তৃতীয় ব্যক্তিটি নিতে না চাইলেও শেষমেশ তাকে নিতেই হলো। দ্বিতীয় লোকটা তাকে কী যেন বলার পরে নিতান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে তার হাতে টাকা তুলে দিল। এবার দ্বিতীয় লোকটা তৃতীয় ব্যক্তির হাত থেকে বইটি নিয়ে তাতে কিছুমিছু লিখে দিয়ে ফের বইটা হাতে ধরিয়ে দিল।
দূর থেকে কথা শোনো না গেলেও হিরু ঘটনাটা দেখে অনেক কিছু বুঝতে পারল। মানে মানে আগের জায়গায় গিয়ে দাঁড়াল ও।
লোকটা হিরুর সামনে হাসি হাসি মুখে উপস্থিত হলো। নিজে থেকেই বলতে লাগল, ‘বুঝলেন, এক লোকরে বই কিনার জইন্য কিছু টাকা ধার দিছিলাম। আজ তারে মেলায় পেয়ে চাইপা ধরছিলাম। কিন্তুক মানুষের থাইকা কী আর অতো সহজে টাকা তোলা যায়। পাওনা টাকারে সে নিজের মনে কইরা বসে আছে।’
‘ও আচ্ছা...। চলুন যাওয়া যাক।’ এই বলে হিরু অন্যদিকে পা বাড়াল।
‘কফির বিলটা...’ এই বলে লোকটা থেমে গেল। উভয় সংকটে পড়েছে সে। হিরুকে কফির বিলটা পরিশোধ করার কথাও বলতে পারছে না, না পারছে বিল না দিয়ে এড়িয়ে যেতে। কারণ, কফিটা তখন সে নিজেই হাসি হাসি মুখে কাউন্টার থেকে সংগ্রহ করেছিল! আর কাউন্টারের লোকটা এই মুহূর্তে তার দিকেই তাকিয়ে আছে।
‘অদ্ভুত লোক তো।’ বিড়বিড় করে কথাটা বলে একটু আগে পাওয়া টাকা থেকে বিলটা দিয়ে এলো।
হিরু ততক্ষণে লোকটাকে রেখে অনেকদূরে সরে এসেছে। কিন্তু লোকটা তাকে ঠিকই খুঁজে বের করল।
‘আপনিও তো একজন পাঠক, তাই না?’ হিরুকে পেয়ে বলল সে।
‘জি।’
‘কিন্তুক কোনো বই কিনছেন না যে?’
‘বই কিনে পরিচিত এক প্রকাশনীতে রেখে এসেছি। হাতে করে বই টানা বহুত কষ্টের।’
‘উঁহু। আমার মতো বই হাতে নিয়া ঘুরতে অইব। তাহলে আরও দশজন আপনারে দেইখা বই কিনায় উত্সাহী হবে। তবেই না বই পাঠক হিসেবে নিজেরে প্রমাণ দিবার পারবেন।’
‘প্রমাণ দেবার দরকারই বা কী?’ প্রশ্নটা হিরু নিজেকেই করল।
‘চলুন, আরও কিছু বই কিনবেন। আমার জানা-শোনা এক লেখক আছেন। তার বইটা পড়লে নিশ্চিত ভালা লাগবে আপনার।’
হিরুকে প্রায় টেনে এক স্টলের সামনে নিয়ে এলো সে। স্টলের কাছাকাছি গিয়ে আর এগোলো না লোকটা। বলল, ‘আমি আর সামনে না যাই। হাঁটতে হাঁটতে পা ব্যথা হয়া গ্যাছে। আপনি নাহয় বইটা কিনে নিয়া আসুন।’
‘আচ্ছা।’ এই বলে হিরু সামনে পা বাড়াল।
‘আরে, ভাইজান, কই চললেন?’
‘কেন, বই কিনতে।’
‘আপনি তো বইয়ের নামটাই জানবার চাইলেন না...। স্টলে গিয়ে বিখ্যাত কবি হেকমত হাকিমের “দুই জনমেও তুমি আমার হলে না” উপন্যাসটা দিতে বলবেন।’
‘বিখ্যাত কবি লিখেছেন উপন্যাস! দারুণ তো।’ হিরু মনে মনে বলল।
লোকটার দেখানো স্টল হতে হিরু বেশ ক’টা বই কিনল। প্যাকেটে মোড়ানো বই হাতে লোকটার সামনে এসে দাঁড়াল সে।
এতক্ষণে লোকটার মুখে হাসি ফুটেছে। চওড়া হাসি।
‘কবি হেকমত হাকিমের এত্তগুলা বই কিনলেন আপনি?’ আনন্দে গদগদ ভাব তার।
‘না। একটাও কিনতে পারিনি।’
সঙ্গে সঙ্গে লোকটার হাসি উধাও। পাতিলের তলার মতো কালো হয়ে গেল মুখখানা।
হিরু ইতস্তত বলল, ‘আসলে... কবি হেকমত হাকিমের কবিতার বই বের হলে কিনতাম।’
আবারও উজ্জ্বল হলো লোকটার চেহারা। বলল, ‘এদ্দিনে একজন কবিতার পাঠক পাওয়া গেল। আপনার মতো লোকেরাই পারে আমাদের জাতীয় সম্পদ কবিদের বাঁচায়ে রাখতে।’
‘এ সময়ের অনেক মেয়েই কবিতা পড়তে ভালোবাসে। বিশেষ করে রাতে। অনেকে আবার প্রিয় মানুষের কণ্ঠে কবিতা শুনতে চায়।’
‘বাহ বাহ। আপনি আগে বলবেন না।’
‘আগে বললে কী হতো?’
‘না। কিছু না।’ উচ্ছ্বাস দেখিয়েও লোকটা ফের চুপসে গেল। হিরুর সন্দেহ হলো— হয়তো সে কোনো কিছু বলতে ইতস্তত করছে।
‘আপনি কবিতা পছন্দ করেন জানলে আপনারে এ স্টলে আনতাম না। আসুন।’
‘কোথায়?’
‘আরেক স্টলে যাই। ওহান থাইকা কবি হেকমত হাকিমের একখানা জম্পেশ কবিতার বই বেরিয়েছে। আপনার প্রেমিকা শুনতে পছন্দ করবেন।’
‘আপনাকে কে বলল আমার প্রেমিকা আছে?’
‘একটু আগেই না বললেন...?’
‘আমি অন্যদের কথা বলছিলাম। সে যাকগে, বইটা কিনতাম। কিন্তু আজ অনেক বই কিনেছি। পকেটে টাকা নেই।’
‘বাসায় ফেরার টাকাও নেই?’
‘তা আছে বটে।’
‘সেই টাকা দিয়া কিনবেন!’
‘কাল কিনবোনে। বইমেলা তো আর শেষ হয়ে যাচ্ছে না।’
‘কিন্তু কাল তো আপনি কবি হেকমত হাকিমকে নাও পেতে পারেন।’
‘তাতে সমস্যা কী? তার বই তো পাচ্ছি, নাকি তারও মুদ্রণ শেষ হয়ে যাচ্ছে?’
‘মুদ্রণ এত তাড়াতাড়ি শেষ হবে না। কিন্তু অটোগ্রাফ, সেলফি...’
‘আমি অটোগ্রাফসহ বই কিনি না। আর লেখকের সাথে সেলফিও তুলি না।’
‘অদ্ভুত পাঠক তো আপনি।’ লোকটা এক মুহূর্তে ভাবল। ‘আচ্ছা, আপনারে আমিই বইটা দিয়ে দিচ্ছি। একটু আগে নিয়েছিলাম কবির অটোগ্রাফসহ। আমি পরে আরেক কপি নিয়ে নিবো।’ লোকটা তার ব্যাগ থেকে একটা বইয়ের প্যাকেট বের করে হিরুর হাতে জোর করে গুঁজে দিল।
‘চলুন, বইটা হাতে নিয়ে আমরা দুজনে একটা সেলফি তুলি।’ এই বলে তিনি প্যাকেট থেকে বইটা বের করে নিজের মোবাইলখানা বের করে পটাপট কয়েকখানা সেলফি তুলে নিলো।
বিস্মিত হিরু এতক্ষণে কোনো কথাই বলতে পারেনি। এবারে সে বইয়ের প্রচ্ছদের দিকে ভালোভাবে নজর দিল। এই বইয়েরই আরেকটা কপি একটু আগে লোকটা তার সেই ‘পাওনাদারের’ হাতেও গুঁজে দিয়েছিল।
হিরু ভাবল—লোকটা কি তবে কবি হেকমত হাকিমের বইবিক্রির দায়িত্বে নিয়োজিত? নাকি বই বিলির? নাকি স্রেফই একজন নিঃস্বার্থ বইপাঠক!
দুই.
সেদিন রাতে হিরু ফেসবুকে একটা পোস্ট দেখতে পেল। পোস্টদাতা তার ফ্রেন্ডলিস্টের কেউ নয়। তবে, ফেসবুক হিরুর ফেস ডিটেক্ট করে তার ট্যাগ নিয়ে নিয়েছে। পোস্টদাতার নাম—কবি হেকমত হাকিম।
বিকেলে বইমেলায় সেই লোকটির সাথে তোলা ছবিটি শেয়ার করেছেন তিনি। ক্যাপশনে লেখা,
‘বিকেলে বইমেলায় আমি আর আমার বই হাতে জনৈক পাঠক। উল্লেখ্য, ইনি আমার কবিতার বিশেষ ভক্ত!’
