সংসদে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ

এ কে খন্দকার রাষ্ট্রদ্রোহ করেছেন, তার বিচার করা হোক

আপডেট : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০১৪, ২১:৩৪
 
 
‘১৯৭১:ভেতরে-বাইরে’ বইয়ে মুক্তিযুদ্ধে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভূমিকা, ১৯৭১ এর ৭ মার্চের ভাষণ ও স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে সাবেক মন্ত্রী এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) এ কে খন্দকার ‘মিথ্যা, বিকৃত ও বিভ্রান্তিকর’ তথ্য দিয়েছেন বলে মন্তব্য করেছেন সরকারি জোটের ও বিরোধী দলের জ্যেষ্ঠ কয়েকজন সংসদ সদস্য। আজ বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে অনির্ধারিত আলোচনায় তারা একে খন্দকারকে ‘কুলাঙ্গার’, ‘অকৃতজ্ঞ’ ও ‘খন্দকার মোশতাকের অনুগত’ আখ্যায়িত করে বলেছেন, এ সব বিকৃত তথ্যের মাধ্যমে তিনি সংবিধান অপমান করেছেন। হয়তো আইএসআইর টাকায় তিনি এ কাজ করেছেন। এটি রাষ্ট্রদ্রোহিতার সামিল। সে জন্য তার বিচারের পাশাপাশি বইটি বাতিল করার জন্য তারা সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। একই সঙ্গে বইটি প্রত্যাখান করার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান তারা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ সময় সংসদে উপস্থিত ছিলেন।
অধিবেশনে মাগরিবের নামাজের বিরতির পর অনির্ধারিত এই আলোচনায় অংশ নিয়ে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু বলেন, স্বাধীনতাযুদ্ধের প্রস্তুতি না থাকলে দেশ স্বাধীন হলো কী ভাবে! অনেকে এখন অনেক বই লেখেন, বড় বড় কথা বলেন। এ দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব নিয়ে যে ষড়যন্ত্র চলছে, তিনি বুঝে হোক আর না বুঝে হোক সেই ষঢ়যন্ত্রের ফাঁদে পা দিয়েছেন। কারণ বঙ্গবন্ধুকে আঘাত করতে পারলে এই জাতিকে অন্যদিকে ধাবিত করা সম্ভব হবে। এই উদ্দেশ্যেই বারবার আওয়ামী লীগ ও বঙ্গবন্ধুর ওপর আঘাত হানা হচ্ছে। এই ষড়যন্ত্র কোনো ব্যক্তি বা দলের বিরুদ্ধে নয়। মূল আঘাত স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের ওপর। যারা কখনও এদেশের অস্তিত্ব মেনে নিতে পারেনি, যারা ’৭৫ এর ১৫ আগস্ট ও ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ঘটিয়েছেন, যারা ওয়ান-ইলেভেনের প্রেতাত্মা তারাই এই ষড়যন্ত্র করছে।
আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের আরেক সদস্য ও বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেন, এসব কথা বলে-লিখে এ কে খন্দকার অন্যের হাতে অস্ত্র তুলে দিচ্ছেন। কেন এই সময়ে কার প্ররোচনায় তিনি ইতিহাস বিকৃত করে বঙ্গববন্ধুকে খাটো করলেন তা জনগণের জানা। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস তিনি জানেন না। কারণ ১৯৫১ থেকে ’৬৯ সাল পর্যন্ত তিনি পাকিস্তানে ছিলেন। বইয়ে তিনি বলেছেন-বঙ্গবন্ধু নাকি স্বাধীনতা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। বঙ্গবন্ধু ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের মাধ্যমে গোটা নিরস্ত্র জাতিকে সশস্ত্র জাতিতে পরিণত করেছিলেন। প্রস্তুতি না থাকলে হাওয়ার ওপর বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে? তাকে বলব-আপনি মেজর সিদ্দিকী সালেকের ‘উইকনেস অব সারেন্ডার’ বইটি পড়ুন। বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, এই এ কে খন্দকার বঙ্গবন্ধুর খুনি মোশতাককে সমর্থন দিয়েছিলেন। আমি অবাক হই! এই রোকটির মধ্যে কৃতজ্ঞতাও নেই। শেখ হাসিনা তাকে গত সরকারে পরিকল্পনা মন্ত্রী করেছিলেন। দেশটা বিচিত্র!
তোফায়েল আহমেদ আরও বলেন, বঙ্গবন্ধুর জন্ম না হলে এই বাংলাদেশ হতো না, এতে কারও চুল পরিমাণ সন্দেহ নেই। ৭ মার্চের ভাষণের সময় বঙ্গবন্ধুর সময় আমরা মঞ্চে ছিলাম। আমরা মঞ্চে থেকেও জানলাম না, বঙ্গবন্ধু ভাষণের পর ‘জয় পাকিস্তান’ বলেছেন। এ কে খন্দকার বইয়ে লিখেছেন, ১৮৫১ থেকে ’৬৯ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানে থাকার সময পাকিস্তানি কর্মকর্তারা ও সেখানকার সাধারণ মানুষ তাকে খুব ভালোবাসতেন। সেখানে তার নাকি অনেক ভালো বন্ধুও ছিল। বঙ্গবন্ধু ’৬৯ এ যখন ফাঁসির মঞ্চে, তখন এ কে খন্দকার তো পাকিস্তানের কর্মকর্তা।
আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য  শেখ ফজলুল করিম সেলিম বলেন, বঙ্গবন্ধু কখন ‘জয় পাকিস্তান’ বলেছেন প্রমাণ দিন। কার স্বার্থে আপনি বিকৃত ইতিহাস রচনা করছেন। পাকিস্তান থেকে বুদ্ধি-পরামর্শ নিয়ে আপনি পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। আপনি এই ধরনের মিথ্যা তথ্য দিয়ে সংবিধান অপমান করেছেন। যা রাষ্ট্রদ্রোহিতার সামিল। সরকারকে বলবো, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিন। শেখ সেলিম বলেন, এ কে খন্দার যখন তখন তেমন। তিনি আইয়ূব খান, এরশাদসহ সব সরকারের সুবিধা নিয়েছেন। গত সরকারেও মন্ত্রী হয়েছেন। পা চেটে ক্ষমতা ভোগ করার ক্ষেত্রে জুড়ি নেই। তিনি আরও বলেন, কোন সময়টায় তিনি একাজ করলেন? স্বাধীনতা বিরোধী সকল শক্তি যখন ঐক্যবদ্ধ তখন। হয়তো আইএসআই’র টাকায় তিনি এই বই লিখেছেন।
জাসদের মইন উদ্দিন খান বাদল বলেন, সংবিধানের রক্ষণসীমা অতিক্রম করবেন না। তাহলে বাঙালী জাতি আপনাকে কখনও ক্ষমা করবে না। জাতীয় পার্টির (জাপা) কাজী ফিরোজ রশীদ বলেন, এ কে খন্দকার জাপারও মন্ত্রী ছিলেন। ৭ মার্চের ভাষণ নিয়ে বিকৃত ইতিহাস লিখে তিনি জাতিকে বিভ্রান্ত করছেন। আমরা এর নিন্দা জানাই। আওতায়ামী লীগের মেজর (অব.) রফিকুল ইসলাম বলেন, কেউ না কেউ তাকে এই ইতিহাস বিকৃতির জন্য পরোচণা দিয়েচে। এই বই সমগ্র জাতি প্রত্যাখ্যান করবে। এই আলোচনার সূত্রপাত করে সাবকে তথ্যমন্ত্রী আবুল কালাম আজাদ বলেন, বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন ‘জয়বাংলা’, এটা রেকর্ডেড।
আলোচনা শেষে অধিবেশনের সভাপতিত্বকারী ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বি মিয়া বলেন, ১৫ আগস্টের কালোরাত্রির পর যারা খুনি মোশতাককে সমর্থন করেছিলেন তারা বইয়ে কি লিখলেন তা বাঙ্গালী জাতি তোয়াক্কা করে না। ইতিহাস বরং তাকেই অবমূল্যায়ন করবে।
ইঅ/চৌফে/শ৬৭০