আদালতের রায় বাংলায় লিখিবার জন্য বিচারকদের প্রতি আহ্বান জানাইয়াছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। একুশে ফেব্রুয়ারির একটি অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলিয়াছেন যে, আদালতের রায়টা যদি কেহ ইংরেজিতেও লিখিতে চাহেন, লিখিতে পারেন। কিন্তু ইহার ক্ষেত্রে একটি শর্ত হইল, ইংরেজির পাশাপাশি ওই রায় বাংলা ভাষাতেও প্রকাশ করিতে হইবে। প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত বাস্তবোচিত দৃষ্টিকোণ হইতে এই কথা বলিয়াছেন যে, যিনি রায় পাইবেন তিনি যেন পড়িয়া উহার অর্থ অনুধাবন করিতে পারেন। অন্তত যেই ভাষাটা সবাই বুঝিতে পারেন সেই ভাষাতেই রায় লেখা উচিত বলিয়া মনে করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী যথার্থই অনুধাবন করিয়াছেন যে, মাতৃভাষায় আদালতের রায় লেখা হইলে একজন স্বল্পশিক্ষিত মানুষও বুঝিতে পারিবেন রায়ে কী রহিয়াছে। দেশের বেশিরভাগ মানুষই এখন বাংলায় অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন। কিন্তু রায়টি যদি ইংরেজিতে প্রদান করা হয়, তাহা হইলে সেই রায়ে কী বলা হইল তাহা বুঝিতে সংশ্লিষ্ট মানুষটিকে নির্ভর করিতে হয় আইনজীবীর উপর। আইনজীবী যাহা বুঝাইয়া দেবেন তাহাই মানিয়া লইতে হয়। অনেক সময়ই ইহার জন্য হয়রানির শিকারও হইতে হয় সাধারণ মানুষকে। আমরা জানি, ১৯৭১ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমির এক অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলিয়াছিলেন, ‘আমাদের হাতে যেদিন ক্ষমতা আসবে, সেদিন থেকেই দেশের সব স্তরে বাংলা ভাষা চালু হবে।... সে বাংলা যদি ভুল হয়, তবে ভুলই চালু হবে, পরে তা সংশোধন করা হবে।’ বাহাত্তরের সংবিধানেও বঙ্গবন্ধুর ওই বক্তব্যের প্রতিফলন দেখা যায়। সংবিধানের ৩ অনুচ্ছেদে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা দেওয়া হইয়াছে। আইনগতভাবে বাংলাদেশে বিকল্প কোনো দাপ্তরিক ভাষাও নাই। কিন্তু তাহার পরও ঔপনিবেশিক আমলের ধারাবাহিকতায় দেশের সর্বস্তরে বাংলা চালু হয় নাই। ১৯৮৭ সালে বাংলা ভাষা প্রচলন আইন নামে একটি আলাদা আইন করা হয়। ওই আইনের ৩ (১) ধারায় বলা হয়, একমাত্র বিদেশের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যতীত এই আইন প্রবর্তনের পর বাংলাদেশের সর্বত্র তথা সরকারি অফিস, আদালত, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানসহ অন্য সব ক্ষেত্রে নথি ও চিঠিপত্র, আদালতের সওয়াল-জবাব এবং অন্যান্য আইনগত কাজ অবশ্যই বাংলায় লিখিতে হইবে। ওই আইনের পর নিম্ন আদালতে বাংলার ব্যবহার বৃদ্ধি পায়। তবে উচ্চতর আদালতে বিশেষ করিয়া সুপ্রিম কোর্টে এখনও ইংরেজির ব্যবহার বেশি। যদিও উচ্চতর আদালতেও এখন বাংলায় রায় দেওয়া শুরু হইয়াছে।
আশার কথা হইল, আমাদের দেশি আইনগুলি ইতোমধ্যে বাংলা করা হইয়াছে। কিন্তু এই আইনগুলিকে যখন বাহিরের আইনের সহিত তুলনা করা হয় সেই রেফারেন্সগুলি তো ইংরেজিতে। ওইসব রেফারেন্স অনুবাদ করিবার যথাযথ ব্যবস্থা থাকা দরকার। এইক্ষেত্রে প্রথম প্রথম কিছু জটিলতা আসিলেও বিচারকরা চাহিলেই বাংলায় রায় দিতে পারেন। আমরা আশা করিব, বাংলায় রায় প্রদান করিতে কাহারো মধ্যে কোনো হীনম্মন্যতা কাজ করিবে না। ঔপনিবেশিক ভাবধারা হইতে আমাদের অবশ্যই মুক্ত হইতে হইবে।
