দশ দিগন্তে

চকবাজার ট্র্যাজেডির জন্য দায়ী কারা?

আপডেট : ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ২১:৫৮

এবার একুশের শোকে মিশেছে আরেকটি বড় শোক। ঢাকার চকবাজারের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড। নিহতের সংখ্যা ৭০ বা ৮০ তা নিয়ে বিতর্ক আছে; কিন্তু এই অগ্নিকাণ্ডে যে অসংখ্য মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে— তাতে সন্দেহ নেই। এজন্য সারা দেশ শোকমগ্ন হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে এজন্য দায়ী কে বা কারা? ভাগ্য বা নিয়তি, লোভ, অসাধুতা, সরকার, না জনগণের একটা অংশ নিজেরাই? এর আগে নিমতলীর অগ্নিকাণ্ড এবং রানা প্লাজায় ভবন ধসের দুর্ঘটনাও কম ভয়াবহ ছিল না।

রানা প্লাজায় আমরা একজন দোষী এবং কারণ খুঁজে পেয়েছিলাম। তিনি একজন স্থানীয় নেতা এবং ওই ভবনের মালিক। তার অতি লোভ এবং মানুষের জীবনের চাইতে তার অধিক অর্থ লোভ ছিল এই ট্রাজেডির কারণ। তাকে শাস্তি দেওয়া গেছে; কিন্তু চকবাজারের অগ্নিকাণ্ডে এই অসংখ্য মানুষের মৃত্যুর জন্য দায়ী কারা? সরকারকে কোনো অবস্থাতেই এককভাবে দায়ী করা যাবে না। উন্নত দেশেও সরকার এককভাবে অগ্নিকাণ্ড নিবারণ অথবা নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। লন্ডনে সম্প্রতি রয়াল বারা কেনসিংটনে সুউচ্চ টাওয়ার হাউসে অগ্নিকাণ্ডে অসংখ্য নরনারী ও শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যুকাণ্ডে সারা দেশ এখনো আলোড়িত। তারপরও ছোটখাটো অগ্নিকাণ্ড ঘটেই চলেছে।

আমেরিকায় বছরে অগ্নিকাণ্ডের সংখ্যা অগুনতি। গত সপ্তাহেও একটি ছোটখাটো অগ্নিকাণ্ডে চারটি শিশু জীবন্ত অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা গেছে। সারা আমেরিকায় এই পৌনঃপুনিক অগ্নিকাণ্ডের সামনে একটি সুপার পাওয়ারকেও মনে হয় অসহায়। আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ায় বিশাল বনাঞ্চলে যখন প্রায় প্রতি সামারেই প্রাকৃতিক কারণে গাছে আগুন ধরে তা দমকল বাহিনী এক মাস দুইমাস ধরেও নেভাতে পারে না। অসংখ্য মানুষ মারা যায়। হাজার হাজার মানুষ গৃহহীন ও আশ্রয়হীন হয়ে উদ্বাস্তুতে পরিণত হয়।

বাংলাদেশের বন্যা ও খরার মতো আমেরিকা, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ায় বিশাল ও দীর্ঘস্থায়ী অগ্নিকাণ্ড ন্যাচারাল ডিজাস্টার বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ। বাংলাদেশে অগ্নিকাণ্ড কোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয় নয়। এগুলো মনুষ্য-সৃষ্ট (Men made) বিপর্যয়। চকবাজারের অগ্নিকাণ্ডও প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়। মনুষ্যসৃষ্ট বিপর্যয়। কারণ খুঁজতে গেলে দেখা যাবে, আমারই বর্ণিত বেশ কয়েকটি কারণ এর জন্য দায়ী। এই দুর্ঘটনার আশু কারণ হয়ত এক বা একাধিক মানুষের কোনো ভুলত্রুটি। কিন্তু আসল কারণ ভাগ্য বা নিয়তি নয়, আসল কারণ একশ্রেণির ব্যবসায়ীর লোভ। অগ্নিকাণ্ড সহজেই ঘটাবার মতো প্লাস্টিক ও কেমিক্যাল জমা রাখার ব্যাপারে অসাধুতা ও অসাবধানতা। ব্যবসার লোভে মানুষের জীবনের নিরাপত্তা উপেক্ষা করে বিপজ্জনক স্থানে ও বিপজ্জনকভাবে কেমিক্যাল দ্রব্য মজুত রাখা। এই ব্যাপারে জননিরাপত্তা রক্ষায় সরকারের উপেক্ষা ও উদাসীনতা।

উপমহাদেশে বিশেষ করে বাংলাদেশে ঔপনিবেশিক আমল থেকে আমাদের মজ্জাগত অভ্যাস, যে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ও বিপর্যয়গুলোকে ঘটার আগে নিবারণ করে আমরা মানুষের জীবন বাঁচাতে পারি, তা আমরা বাঁচাই না। দুর্ঘটনা ঘটার পর ব্যবস্থা গ্রহণ করি। অনেক বছর আগে পুরনো ঢাকার টিকাটুলিতে একটা ঢাকনাবিহীন ম্যানহোল ছিল। এটার উপর ঢাকনা দেওয়ার জন্য কর্তৃপক্ষের কাছে স্থানীয় বাসিন্দারা বহু দৌড়াদৌড়ি করেছেন। কোনো লাভ হয়নি। তারপর অন্ধকার রাতে ঐ ম্যানহোলে পড়ে গিয়ে এক যুবকের মর্মান্তিক মৃত্যুর পর ম্যানলোহটিতে ঢাকনা দেওয়া হয়।

চল্লিশ বছর আগে আমি যখন ঢাকায় ছিলাম তখন কাকরাইলের মোড়টি ছিল খুবই বিপজ্জনক। কোনো রাউন্ড এবাউট এবং ট্রাফিক লাইট বা ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থাও ছিল না। এটা নিয়ে বহু লেখালেখি হয়। কিন্তু কারো টনক নড়েনি। তারপর একদিন এক ভয়াবহ গাড়ি দুর্ঘটনা হয়। কয়েকজনের শোচনীয় মৃত্যু ঘটে। তারপর কাকরাইলের মোড়ে ট্রাফিক সিগনাল বসে এবং ঐ মোড় নিরাপদে পার হওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।

ঢাকা শহরে এখন একটি ভুস্বর্গ আছে। সেটি ক্যান্টনমেন্ট এলাকা। ঢুকলে মনে হয় মিউনিখ কিংবা লসএঞ্জেলেসে ঘুরছি। তার বাইরে তিলোত্তমা ঢাকার চেহারা কংক্রিটের জঙ্গল। পানি, খাদ্য দূষিত, রাস্তাঘাট দুর্গম। ঢাকার একাংশের মরহুম মেয়র আনিসুল হক এয়ারপোর্ট এলাকা এবং তার রাস্তাঘাটে নান্দনিকতার ছাপ রেখে গেছেন। কিন্তু তার বাইরে? ঢাকা শহরে এখন অসংখ্য বহুতল ভবন। কিন্তু তার ছায়ায় নিচে শহরটি পল্যুউসনে বিপজ্জনক। রাস্তাঘাটে হাঁটা যায় না। স্বাস্থ্য রক্ষার ন্যূনতম ব্যবস্থা নেই কোথাও।  দেখে কষ্ট পেয়েছি, ভাষা শহীদ মিনারের পাশেই বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের নেতা ও সৈন্যদের ছবি আঁকা দেয়ালে মানুষ দাঁড়িয়ে মূত্র ত্যাগ করে। এটা দেখারও কোনো ব্যবস্থা নেই।

পুরনো ঢাকার কথা বলার আগে নতুন ঢাকার কথা বলি, নিউ ঢাকায় নয়ন শোভন বহুতল বিল্ডিংগুলোর মধ্যেও অনেক ভবনের ফাউন্ডেশন মাত্র দু’তিন তলার। অসাধু কনস্টাক্টর, কনস্টাক্টরেরা মানুষের জীবনের নিরাপত্তাকে বিন্দুমাত্র গুরুত্ব না দিয়ে দু’পাঁচতলার ফাউন্ডেশনের ওপরে দশ-বারো তলা ফ্ল্যাট তৈরি করেছে। রাজউকের এক শ্রেণির অসাধু অফিসার তাকে অনুমোদন দিয়েছে এবং দিচ্ছে। ভূমি বিশেষজ্ঞেরা বলেছেন, ঢাকার মাটি নরম এবং ভূমিকম্পপ্রবণ, যদি বড় ধরনের (তুরষ্ক কিংবা জাপানের মতো) ভূমিকম্প হয় তাতে বড় ধরনের ধ্বংসযজ্ঞ হবে ঢাকায় এবং লক্ষ লক্ষ লোক মারা যাবে। কিন্তু অতি লোভী ব্যবসায়ী ও নব্য ধনীদের এই হুঁশিয়ারির দিকে কোনো লক্ষ্য নেই।

পুরনো ঢাকায় কিছু রাস্তাঘাট সংস্কার ও প্রশস্ত করা হয়নি তা নয়, নবাবপুর, রথখোলা, বংশাল একটু প্রশস্ত হয়েছে। কিন্তু পুরনো ও জীর্ণ ঘর বাড়িগুলোর এবং পয়ঃপ্রণালীর অবস্থার তেমন কোনো উন্নতি হয়নি। বিদ্যুত্ সরবরাহে আন্ডারগ্রাউন্ড ক্যাবল ব্যবস্থা হয়নি। সেগুলো মান্ধাতার আমলের ইলেকট্রিক পোস্টের উপর যেভাবে জড়াজড়ি করে ঝুলে থাকে, তা ছিঁড়ে গিয়ে যেকোনো সময় অগ্নিকাণ্ড ঘটতে পারে। বিদ্যুত্স্পৃষ্ট হয়ে রাস্তার মানুষ মারা যেতে পারে।

ঢাকায় এখন দু’দুটো সিটি কর্পোরেশন। সামরিক ও অসামরিক প্রশাসনের হেড কোয়ার্টার এখন ঢাকা। তাদের চোখের সামনে বুড়িগঙ্গা ও শীতলক্ষ্যা নদী অসত্ ব্যক্তিরা দখল করে নিচ্ছে। মাটি ফেলে দুই নদী ভরাট করে ফেলছে। তার নাব্যতা কমছে। পানি দূষিত হচ্ছে। ভাওয়ালের বন আর বন নেই। অসাধু ব্যক্তিরা অবাধে গাছ কেটে বাংলার বৃক্ষসম্পদের একটি শ্রেষ্ঠ কেন্দ্রকে ধ্বংস করে ফেলেছে। চট্টগ্রামে পাহাড়তলীতে আর পাহাড় নেই, সিলেটের হাওর এলাকাতে চলছে অবৈধ ও অবাধ লুটপাট।

দেশের অভাবিত উন্নতি এই অবাধ লুটপাট ও দুর্নীতির আড়ালে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে। উন্নয়নের ফসলও লুট হচ্ছে। এটা এত ব্যাপকভাবে করা সম্ভব হতো না, যদি এই লুটপাটের সঙ্গে শাসক দলের একশ্রেণির লোভী এমপি, নেতা ও  উপনেতার সংশ্রব না থাকত। সিঙ্গাপুরে আমাদের নেতারা তো নিয়মিত যান। প্রয়োজনে এবং অপ্রয়োজনেও। কুয়ালালামপুরে যান। এই দু’টি শহরেরই উন্নয়ন বিস্ময়কর। এজন্য এ দু’টি দেশের মানুষ লী-কুয়ান এবং মহাথির মোহাম্মদ এ দু’টি মানুষের কাছে কৃতজ্ঞ। এ দু’টি দেশের এমন অভাবিত উন্নতি যে হয়েছে তার প্রধান কারণ, কঠোর হাতে দুর্নীতি দমন এবং এই দুর্নীতির নায়কদের কঠোর হাতে শাস্তিদান। জনগণের স্বাস্থ্য, চিকিত্সা, শিক্ষা, বাসস্থান নিয়ে দুর্নীতি করেছেন। খাদ্যে ভেজাল মিশিয়েছেন, ঘনবসতিপূর্ণ স্থানে লোভের ব্যবসা করে মানুষের জীবন বিপন্ন করেছেন তাদের ফাঁসি দিতেও দ্বিধা করেননি এই দুই  নেতা।

লী-কুয়ান এবং মহাথিরকে বলা হয়েছে স্বৈরাচারী ও গণতন্ত্র হত্যাকারী। তারা কালপেঁচার চিত্কারে কান দেননি। লী-কুয়ান বলেছেন, তিনি মানুষের জীবন-জীবিকার নিরাপত্তার গণতন্ত্রে বিশ্বাসী। “বাবু ও সাহেবদের সৌখিন গণতন্ত্রে বিশ্বাসী নন।” রবীন্দ্রনাথও বলেছেন, “ভালো নয়, ভালো নয় সৌখিন মজদুরি।” বাংলাদেশে  আমাদের মুশকিল এই যে, আমরা সৌখিন গণতন্ত্রের ধ্বজাধারীদের চিত্কারে গণমানুষের জীবন-জীবিকা রক্ষার গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য লী-কুয়ান  বা মহাথিরের মতো কঠোর হতে পারছি না।

n লন্ডন, ২৩ ফেব্রুয়ারি, শনিবার, ২০১৯