কবে মুক্তি পাবে ‘ভবিষ্যতের ভূত’?

আপডেট : ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ২১:৫৯

কার নির্দেশে হল থেকে সরিয়ে নেয়া হলো ‘ভবিষ্যতের ভূত’, সেই ধোঁয়াশা এখনো কাটেনি। তবে ছবিটি মুক্তি পাওয়ার আগে থেকেই যে সমস্যা চলছিল এবং ছবির বিষয়বস্তু নিয়ে সরকার পক্ষ যে খুশি ছিলেন না, তা স্পষ্ট হয়েছে প্রযোজক কল্যাণময় চট্টোপাধ্যায়ের প্রকাশ্যে আনা একটি ইমেইলে। প্রযোজক যা বলেছেন, তাতে পরিষ্কার যে, ছবিটির ওপর মুক্তির আগে থেকেই বিশেষ নজর ছিল প্রশাসনের। আর সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে, সেন্সর বোর্ডের ছাড়পত্র পেয়ে যাওয়া একটি ছবিকে জোর করে আটকাতে গেলে রাজনৈতিক মহলে যে প্রতিক্রিয়া হতো তা থেকে বাঁচতেই ‘ভবিষ্যতের ভূত’কে সরাসরি নিষিদ্ধ করা হয়নি। বরং অন্যরকমভাবে ঘুরপথে চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে হলমালিকদের ওপর। সে কারণেই প্রথমদিন ছবিটি মুক্তি পাওয়ার পরের দিন বিকাল থেকে এক এক করে প্রদর্শনী বন্ধ করতে থাকেন হলমালিকরা। এমনকী অ্যাডভান্সড টিকিট কাটা দর্শক এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষকে টাকা ফেরত দিয়ে দেওয়ার কথাও বলেন তাঁরা।

এই ছবি প্রসঙ্গে প্রশ্ন শেষ করার আগেই জবাব দিয়ে দেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সাংবাদিকরা তাকে প্রশ্ন করেন অনীক দত্তের পলিটিকাল স্যাটায়ারে প্রশাসনের আপত্তি কোথায়? প্রশ্ন শেষ করার আগেই মুখ্যমন্ত্রী বলেন, তাকে যেন এ ব্যাপারে প্রশ্ন করা না হয়। গোটা প্রশ্নটাও শুনতে চাননি তিনি।  হঠাত্ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল ছবিটি প্রদর্শন। রাজ্যের সমস্ত মাল্টিপ্লেক্স এবং সিঙ্গলস্ক্রিন থেকে উধাও হয়ে যায় ছবিটি। দর্শকরা ছবি দেখতে এলে বলা হয়, ছবিটি উঠে গেছে। তবে কার নির্দেশে ছবিটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে— সে ব্যাপারে কারও কাছে কোনো স্পষ্ট উত্তর নেই। এমনকী হল মালিকরাও মুখে কুলুপ এঁটে রয়েছেন। ছবিটি মুক্তি পাওয়ার চারদিন আগে, অর্থাত্ ১১ ফেব্রুয়ারি, রাজ্য গোয়েন্দা দপ্তরের এক আধিকারিক জানিয়েছিলেন, ছবিটির বিষয়বস্তু জনসাধারণের ভাবাবেগকে আঘাত করতে পারে। তাতে রাজনৈতিক পরিস্থিতি অশান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকছে। সে কারণেই মুক্তির আগে ছবিটি উচ্চপদস্থ কর্তারা দেখতে চান। প্রযোজক তার উত্তরে লেখেন, যেহেতু সেন্সর বোর্ড ছবিটিকে ছাড়পত্র দিয়েছে তাই আলাদা করে স্ক্রিনিং সম্ভব নয়।

এদিকে ছবিতে রাজ্যের শাসক দলসহ প্রায় সবকটি রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ড, সাংবাদিকতার অন্ধকার দিক, বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পে গু্লাগিরিসহ সবকিছু নিয়েই সোজাসুজি আক্রমণে নেমেছিলেন পরিচালক অনীক দত্ত। প্রথম দিনেই যাদের ছবিটি দেখে ফেলার সৌভাগ্য হয়েছিল, তারা জানাচ্ছেন ছবির পরতে পরতে রাজ্যের শাসক দলের প্রতি তীব্র বিষোদগার ছিল। তবে টালিগঞ্জ স্টুডিও পাড়ার তথ্যাভিজ্ঞমহল বলছে, যেভাবে গত কয়েক বছর ধরে সব কিছুই দাদাগিরি করেই চলছে, তেমনই কোনো এক সূত্র থেকে হলমালিকদের হুমকি দেওয়া হয়ে থাকতে পারে। সে কারণেই কখনো টেকনিকাল কারণ, কখনো ওপরের নির্দেশ বলে ছবির প্রদর্শনী বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছেন তারা। তবে এই অদ্ভূতুড়ে যুক্তি যে বেশি দিন চলবে না তাও স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। দুদিন ধরেই ধর্মতলার মেট্রো চ্যানেল এবং একাডেমি চত্বরে ‘ভবিষ্যতের ভূত’ তুলে নেওয়ার বিরুদ্ধে প্রতিবাদে মুখর হয়েছেন কলাকুশলী এবং বুদ্ধিজীবীরা।

পরিচালক অনীক দত্ত অভিযোগ করেন, সিনেমার শুটিংয়ের সময় থেকেই নানাভাবে বাধার সৃষ্টি করা হচ্ছিল। ছবিতে বেশ কয়েকটি ঘটনা, দৃশ্য এবং দৃশ্যাংশে পশ্চিমবঙ্গের শাসক দল তৃণমূলকে সরাসরি বিদ্ধ করেছেন পরিচালক। দর্শকরা জানিয়েছেন, পরিচালক অনীক দত্ত সৌন্দর্যায়নের মোড়কে আসলে তৃণমূল সরকারের প্রশাসনিক ব্যর্থতাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন। এসেছে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘হোক কলরব’ আন্দোলনের প্রসঙ্গও। যদিও ছবিতে সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম মাধবপুর বিশ্ববিদ্যালয়।

দর্শক এবং চিত্র সমালোচকরা মনে করছেন, ক্ষমতার বেড়াজালে ভূতপূর্ব মানুষের মূল্যায়ন এই ছবিটি। রাজনীতি থেকে সমাজ, মিডিয়া থেকে বিনোদন—পশ্চিমবঙ্গের এখন-তখনকে প্রকাশ্যে এনেছেন অনীক দত্ত। এই ছবিতে শুধু যে শাসকদল তৃণমূলকেই নিশানা করা হয়েছে তাই নয়, ঘুরেফিরে সব রাজনৈতিক দলের নেতাদের প্রসঙ্গও এসেছে। আছে ট্যাকখোশ অ্যাপ, ক্যাবারে ডান্সার, সাংবাদিক। রয়েছে শ্রেণি সংগ্রাম আর ভোটের অঙ্কের কথাও। ধর্ষণ, সিনেমাফিয়া, মঞ্চ থেকে মাচা—রয়েছে সবই। এমন ভূত আছে যে যৌবন ধরে রেখেই ভূত হয়েছে, আবার এমনও আছে যার বিদ্রোহের নামেই রক্ত গরম হয়ে যায়। এঁরা সবাই ঠাঁই পেয়েছে পুরনো সিনেমা হলে। ছবির পুরো অংশটাই জুড়ে মানুষের বিরুদ্ধে হওয়া অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছে ভূতেরা। বাস্তব আর ডিজিটাল জগতের সহাবস্থানে মানুষ ভগবানকে ভয় না পাক, ভূতে নিশ্চয়ই আস্থা রাখবে। সেই ভরসাই রেখেছেন খোদ পরিচালক।

‘ভবিষ্যতের ভূত’ ছবিটি যাতে আবার হলে ফেরানো যায় সেই আর্জি জানিয়ে এবার আদালতের দ্বারস্থ হচ্ছেন ছবির প্রযোজক কল্যাণময় চট্টোপাধ্যায় এবং পরিচালক অনীক দত্তরা। তার আগেই অবশ্য প্রযোজকদের সংস্থা ইম্পা এবং কলাকুশলীদের সংস্থা ফেডারেশন অব সিনে টেকনিশিয়ান অ্যান্ড ওয়ার্কার্স অব ইস্টার্ন ইন্ডিয়ার কাছে আবেদন জানিয়েছে প্রযোজক। একই সঙ্গে কেন ছবিটি বন্ধ করা হলো তা জানতে চেয়ে হলমালিক এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে আইনি নোটিস পাঠানোর তোড়জোড় শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছেন পরিচালক অনীক দত্ত। বিবৃতি দিয়েছেন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি সোমেন মিত্রও।

সিনেমা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর নবান্নে এসেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। সেখানে সাংবাদিক বৈঠক ডেকে কাশ্মির পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে শুরু করেন। প্রশ্নোত্তর পর্বের শেষে তাঁকে ছবিটি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে সটান বলে দেন, আমি এই প্রশ্নের উত্তর দেব না। রাজ্যের তথ্য-সংস্কৃতি দপ্তর মুখে কুলুপ এঁটেছে। কিন্তু প্রতিবাদের রাস্তা থেকে সরছেন না শিল্পীরা। সিনেমা বন্ধের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, সৃজিত মুখার্জি, পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়, আবীর চট্ট্যোপাধায়, মাধবী মুখার্জির মতো চলচ্চিত্র শিল্পীরা। সকলেরই এক প্রশ্ন, সেন্সর বোর্ডের ছাড়পত্র পাওয়ার পরেও ভবিষ্যতের ভূতকে কীভাবে  আটকানো হলো?

n লেখক :ভারতীয় প্রবীণ সাংবাদিক