ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রত্যয়

আপডেট : ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ২২:০০

মহান একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালি জাতির চেতনা ও বিশ্বাস। বাঙালি জাতীয়তাবাদের দর্শন, আদর্শের স্বপ্ন, বেঁচে থাকার অবলম্বন। প্রতিটি দেশ, জাতি কিংবা সমাজের নিকট গৌরব করার মতো কিছু বিষয় থাকে। এসব বিষয় বা ঘটনা সেই জাতি, দেশ কিংবা সমাজকে যুগ যুগ ধরে অনুপ্রেরণা যোগায়, শক্তি যোগায়, সামনে এগিয়ে যেতে সহায়তা করে। বাঙালি জাতি ও বাংলাদেশের মানুষের নিকট এরূপ স্মরণীয় একটি ঘটনা হলো ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারির ঘটনা। এইদিনে মায়ের ভাষার অধিকার রাখতে গিয়ে নিজেদের জীবনকে উত্সর্গ করেছিলেন বাঙালি জাতির সূর্য-সন্তানেরা। এটি বাংলাদেশের জনগণের গৌরবোজ্জ্বল একটি দিন। ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দের ১৭ নভেম্বর অনুষ্ঠিত ইউনেস্কোর প্যারিস অধিবেশনে একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয় এবং ২০০০ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি থেকে দিবসটি জাতিসংঘের সদস্য দেশসমূহে যথাযথ মর্যাদায় পালিত হচ্ছে এবং পৃথিবীর ১৮৮টি দেশে এদিনটি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালন শুরু হয়। মায়ের প্রতি ভালোবাসার মতোই আমাদের আবেগকে উদ্বেলিত করে, সংগ্রামে প্রেরণা দেয়, সংকটে দেয় আশ্রয়, দেয় মাতৃভাষা তথা বাংলাভাষা। ১৯৫৩ সাল হতে ভাষা-আন্দোলনের এইদিনটি ‘শহীদ দিবস’ হিসেবে পালন করা হয় এবং ১৯৫৬তে বাংলাভাষা উর্দুর পাশাপাশি রাষ্ট্রভাষা হিসেবে শাসনতান্ত্রিক স্বীকৃতি লাভ করে। ভাষাকে বাঁচাতে হলে, ভাষার মর্যাদা ও অধিকারকে সমুন্নত রাখতে হলে সবার আগে প্রয়োজন ভাষা পরিকল্পনা। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, যে উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য নিয়ে আমাদের অগ্রজরা ভাষার জন্য যে আত্মাহুতি দিয়েছিল; সে উদ্দেশ্য আজও বাস্তবায়িত হয়নি। বাংলাদেশের সংবিধানের ৩নং অনুচ্ছেদে উল্লেখ আছে, প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা হবে বাংলা কিন্তু সর্বস্তরে বাংলাভাষার ব্যবহার আজও নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। ’৫২’র ভাষা আন্দোলন বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রথম সুসংহত স্ফূরণ; বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার আন্দোলন ছিল মুখ্যত একটি জাতীয় সংগ্রাম। আর এর মূল কথা ছিল ভাষাগত স্বতন্ত্র চেতনা। মহান একুশের ভাষা আন্দোলন বাঙালি জাতিকে দীক্ষা দিয়েছে অন্যায়ের কাছে মাথা না নোয়ানোর। শিখিয়েছে অধিকার আদায়ে ভয়হীন হওয়ার। তাই একুশে ফেব্রুয়ারিকে বাঙালি জাতীয়তাবাদের বীজভূমি বলা হয়। সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের মুখের ভাষা উপেক্ষা করে অন্য একটি ভাষাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় প্রতিষ্ঠা করা চরম অন্যায়, তথা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিপন্থি। এ অন্যায়ের প্রতিরোধ করতে বাংলাভাষা আন্দোলন শুরু হয়। যেজন্য এটি অবশেষে তা অবহেলিত জনতার সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সকল বৈষম্য দূরীকরণ তথা স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে রূপ নেয়। মূলত ’৫২’র একুশে ফেব্রুয়ারিই বাঙালি জাতিকে তার ন্যায্য অধিকার আদায়ে সংগ্রামী পথ বেছে নিতে অনুপ্রাণিত করে। আর ’৫২’র এপ্রিলে এসে বাংলা রাষ্ট্রীয় ভাষার মর্যাদা লাভ করলে সংগ্রামের পথে দাবি আদায়ের ব্যাপারে বাঙালি জাতি আরো আস্থাশীল হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত ভাষা আন্দোলনে বাঙালি জাতীয়তাবাদের যে বীজ উপ্ত হয়েছিল তা পর্যায়ক্রমিকভাবে ব্যাপ্ত হয়ে একাত্তরে এক বিরাট আন্দোলনে পরিণত হয়। তখন বাংলাভাষার অস্তিত্ব ও মর্যাদা রক্ষার জন্য এবং অন্য অর্থে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে সংঘটিত হয়েছে ভাষা-সংগ্রাম। সংখ্যাগুরু হওয়া সত্ত্বেও পাকিস্তানের আইন পরিষদে এবং অন্যত্র বাঙালির প্রভাব হবে উর্দুভাষীয় চেয়ে কম এমনটি সহজভাবে মেনে নিতে পারেনি সেদিনের বাংলাভাষী মানুষ। আর এই সংগ্রামের ইতিহাস ও প্রসঙ্গ কেবল আলংকারিক বর্ণনা-ভাষ্য নয়; এর ভেতরে রয়েছে আবেগ আর জাতীয়তা-সংলগ্নতার উর্বর বীজতলা। বাংলাভাষা আজ শুধু বাংলাদেশ নয়, সুদূর সিয়েরালিওনেও মর্যাদা লাভ করেছে। এটি আমাদের জন্য অবশ্যই গৌরবের এবং মর্যাদার। কিন্তু দুঃখজনকভাবে বাংলাদেশে যেভাবে বাংলাভাষার চর্চা হওয়ার কথা ছিল সেভাবে হচ্ছে না। আজকের প্রজন্মের কাছে, বিশ্ববাসীর কাছে, ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ পালনের মাহাত্ম্যকে তুলে ধরতে হলে প্রয়োজন ইতিহাস-ঐতিহ্য এবং সঠিক তথ্য পরিবেশের সদিচ্ছা। বিশ্বের বিশাল জ্ঞান ভাণ্ডারকে মাতৃভাষা চর্চার মাধ্যমে সমাজের প্রতিটা মানুষের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দেয়া হোক আমাদের এবারের মাতৃভাষা দিবসের দৃঢ় অঙ্গীকার। একটি স্বাধীন সত্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশের পেছনে একুশের তাত্পর্য বাঙালি চিরদিন শ্রদ্ধাভরে স্মরণ রাখবে। বরকত, রফিক, শফিক, সালাম, জব্বার প্রমুখ ভাষা শহীদদের রক্তের ঋণ পরিশোধ করতে আরও বহু সংগ্রাম ও সাধনা করতে হবে। সেই গৌরবময় লক্ষ্য অর্জনের জন্য জাতিকে দলমত নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধভাবে অগ্রসর হতে হবে।

n লেখক : শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়