প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পুরান ঢাকা থেকে রাসায়নিকের গুদাম সরানোর জন্য সংশ্লিষ্ট সবার সম্পূর্ণ সহযোগিতা কামনা করে বলেছেন, ‘বারবার অভিযান পরিচালনা করার পরও এখনো সেখানে রাসায়নিকের গুদাম রয়েছে, যা দুঃখজনক। তবে চকবাজার ট্রাজেডি পুরান ঢাকার রাসায়নিক গুদাম মালিকদের জন্য একটি শিক্ষণীয় ঘটনা। এবার নিশ্চয়ই এসব গুদাম অন্যত্র সরিয়ে নিতে তারা আর আপত্তি করবেন না। চকবাজার বা নিমতলীর মতো ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার যেন পুনরাবৃত্তি ঘটতে না পারে সেজন্য সচেতন থাকার জন্যও তিনি দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান।
গতকাল শনিবার সকালে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চকবাজারের অগ্নিকাণ্ডে আহতদের দেখতে গিয়ে সাংবাদিকদের তিনি একথা বলেন। গত বুধবার দিবাগত রাত সাড়ে ১০টার দিকে চকবাজারের চুড়িহাট্টা জামে মসজিদসংলগ্ন এলাকায় এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। অগ্নিকাণ্ডে ৫টি ভবন পুরোপুরি ভস্মীভূত হয় যেখানে কেমিক্যালের মজুদ এবং বিভিন্ন পণ্যের কাঁচামাল হিসেবে দাহ্য পদার্থ ব্যবহারের কারখানা ছিল বলে দমকল বাহিনীর প্রাথমিক অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্য থেকে জানা গেছে।
প্রধানমন্ত্রী চকবাজারের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাটিকে অত্যন্ত দুঃখজনক আখ্যায়িত করে যারা মৃত্যুবরণ করেছেন তাদের রুহের মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানান। তিনি বলেন, ‘আর যারা আহত তাদের চিকিত্সার জন্য যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। এ ব্যাপারে রবিবার অফিস খুললে আমরা একটি শোক দিবসেরও ঘোষণা দেব।’ তিনি এ সময় দমকল কর্মী এবং পুলিশ ও র্যাবসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষকারী বাহিনী এবং চিকিত্সকদের সচেতনতার এবং রাতদিন অক্লান্ত পরিশ্রমের জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, তাদের পাশাপাশি তিনি নিজেও নির্ঘুম থেকে সেদিন সারারাত আগুন নিভানোর বিষয়টি তদারকি করেছেন এবং যে রোগী মেডিক্যালে এসেছে তাত্ক্ষণিকভাবে তাদের চিকিত্সার সব রকম ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। তিনি নিহতদের মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তরের বিষয়ে বলেন, ইতিমধ্যে অনেকের লাশ সনাক্ত হয়েছে এবং তাদের স্বজনরা নিয়ে গেছেন। কয়েকজন এখনো যে সনাক্ত হতে পারেননি তাদের ডিএনএ টেস্ট করে স্বজনদের কাছে ফেরত দেয়া হবে, সেই প্রক্রিয়াও আমরা শুরু করেছি। প্রধানমন্ত্রী এ সময় পুরান ঢাকায় রাসায়নিকের গুদাম রেখে দেয়ার বিষয়ে তার ক্ষোভ ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, ইতিপূর্বে নিমতলীতে যখন আগুন লাগলো সে সময় আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম এখান থেকে যত কেমিক্যাল জাতীয় পদার্থ রয়েছে তার সব সরানো হবে। সেজন্য কেরানীগঞ্জে একটি জায়গাও আমরা ঠিক করলাম, উদ্যোগটা নিলাম এবং সকলের সঙ্গে আলাপ-আলোচনাও করা হলো- এখানকার কেমিক্যালের যত গুদাম আছে (বৈধ বা অবৈধ) সেগুলো কেরানীগঞ্জে স্থানান্তর করা হবে। যাতে করে এখানে আর এ ধরনের ঘটনা ঘটতে না পারে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় তাদের অনেকেই (মালিক পক্ষ) এতে রাজি হননি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আশা করি এই দুর্ঘটনার পর যারা তখন এই আপত্তি জানিয়েছিলেন তারা এখন আর সেই আপত্তি করবেন না।’ তিনি এ সময় মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে রাসায়নিকে গুদাম পুরান ঢাকার থেকে স্থানান্তরে তার সরকার উদ্যোগ নিলে তা কাজে আসেনি বলে জানান। তিনি দুর্ঘটনা থেকে পুরান ঢাকাকে রক্ষার জন্য রাসায়নিকের গুদামগুলো অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে বহুতল গোডাউন গড়ে তোলার জন্য তার সরকার পদক্ষেপ নেবে উল্লেখ করে বলেন, ‘এই অলি-গলি রাস্তাগুলোকে আমাদের নতুনভাবে গড়ে তুলতে হবে। যাতে করে দমকলবাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছতে পারে।’
প্রধানমন্ত্রী এ সময় ঢাকার ধোলাইখাল, শান্তিনগর খাল, সেগুনবাগিচা খাল থেকে শুরু করে ঢাকার অনেক খাল এবং জলাধারগুলো ভরাট হয়ে যাওয়ার প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলেন, ‘পুকুর খাল এগুলো যেন আর বন্ধ করা না হয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ভদ্রলোক (আগুন নেভানোয় ব্যস্ত সংশ্লিষ্ট দমকল কর্মী) কাজে যাবেন তাকে ধরে রেখে একের পর এক প্রশ্ন, কোন্ কোন্ চ্যানেল এই কাজটি করেছে। ভবিষ্যতে দয়া করে সেটা না করে সুস্থভাবে তারা যেন তাদের দায়িত্ব পালন করতে পারে সেই ব্যবস্থাটা সকলে নেবেন। সেটাই আমরা চাই।’ তিনি এ সময় দায়িত্ব পালনের নামে মেডিক্যালে রোগীর কাছেও মিডিয়া কর্মীদের ভিড় করার সমালোচনা করে বলেন, এ সমস্ত রোগীর ক্ষেত্রে ৪৮ ঘন্টা বা ৭২ ঘন্টা না পার হলে সেসব রোগীর কাছে ক্যামেরা নিয়ে যাওয়া, তাদের দেখানো বা তাদের ছবি তোলা— এসব বন্ধ করতে হবে।
