দেশের লেখকদের বই প্রকাশের পাশাপাশি বিদেশি সাহিত্যের অনুবাদও বাঙালি পাঠকের কাছে বেশ জনপ্রিয়। বিদেশি সাহিত্যের অনুবাদ তো রয়েছেই বিষয়ভিত্তিক বইও পাঠকের মনোযোগ আকর্ষণ করছে। অনুবাদ বই প্রকাশনা বাড়তে থাকায় তা প্রকাশনা জগতেও নতুন মাত্রা যোগ করেছে। কিছু কিছু প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান অনুবাদকেন্দ্রিক প্রকাশনা নিয়েই উপস্থিত থাকেন বইমেলায়।
অ্যাডর্নের প্রকাশক সৈয়দ জাকির হোসাইন বললেন, অনুবাদ বইয়ের প্রতি পাঠকের আগ্রহ রয়েছে। যারা বিশ্বের সাহিত্য সম্পর্কে খোঁজ-খবর রাখেন তাদের অনুবাদ বইয়ের প্রতি আগ্রহ রয়েছে।
অবসর প্রকাশনীর প্রকাশক মোঃ আলমগীর রহমান বলেন, অনুবাদ যদি ভালো হয় তাহলে ভালো বিক্রি হয়। আমরা প্রতিবছর পৃথিবীর সেরা গল্পগুলোর মধ্যে থেকে বেছে অনুবাদ গ্রন্থ প্রকাশ করি। পাঠকের ভালো সাড়া পাই।
প্রকাশনা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনেক অনুবাদ বই প্রকাশ পেলেও প্রয়োজন অনুযায়ী যথেষ্ট অনুবাদকর্ম হচ্ছে না। প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের অভাব এবং অনেক ক্ষেত্রেই প্রতিষ্ঠানের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এ অবস্থায় সরকারি উদ্যোগে অনুবাদ-কেন্দ্র সৃষ্টি করা অত্যন্ত জরুরি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) কবি মুহাম্মদ সামাদ বলেন, বাংলাদেশের সাহিত্যের আন্তর্জাতিক প্রচার-প্রসারের ক্ষেত্রে অনুবাদের কোনো বিকল্প নেই। যথার্থ অনুবাদের মাধ্যমেই আমাদের সমৃদ্ধ সাহিত্য ও চিন্তাভাণ্ডার বিশ্ব দরবারে পৌঁছুতে পারে। তবে অনুবাদকর্মের ক্ষেত্রে আক্ষরিক অনুসরণের পরিবর্তে ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক জ্ঞানের সংযোগ অনুবাদকের জন্য অপরিহার্য বিষয়। এ বিষয়ে আমাদের নবীন অনুবাদকদের আরও সচেতন ও উদ্যোগী হতে হবে।
অধ্যাপক খালিকুজ্জামান ইলিয়াস বলেন, শুধু বই প্রকাশ করলেই হবে না। সাহিত্যমান অক্ষুণ্ন রেখে বিষয়ানুগ থাকা অনুবাদকের পক্ষে সহজ কাজ নয়। এ বিষয়ে যেমন ভাষাজ্ঞানের যথার্থতা প্রয়োজন তেমনি প্রয়োজন বিষয় সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা।
এবারের মেলায় অনুবাদের যেসব বই পাওয়া যাচ্ছে সেগুলো হলো- অবসর থেকে এসেছে মলয় পাঁড়ের অনুবাদে নাগিব মাহফুজের ‘লাভ ইন দ্য রেইন’, হারুকি মুরাকামির ‘আফটার দ্য কোয়েক’, আইজ্যাক আসিমভের আই, রোবট, চারুলিপি এনেছে স্যার আর্তার কোনান ডয়েলের প্রফেসর চ্যালেঞ্জার সমগ্র, ঐতিহ্য এনেছে আন্ত চেখভের ‘আমার জীবন’ অনুবাদ করেছেন ফিরোজ আহমদ কামাল, ইলখন প্রকাশন এনেছে লরেন্স বিনিয়ানের ‘আকবর’, প্রকাশনা সংস্থা নালন্দা থেকে প্রকাশিত হয়েছে আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর অনুবাদে নিকোলাও মানুচির গ্রন্থ ‘মানুচির চোখে মোঘল ভারত’, উইলিয়াম ড্যালরিম্পেল ‘দ্যা ওয়াইট মোগলস’, নাগীব মাহফুজের ‘কায়রো ট্রিলজি (প্যালেস অব ডিজায়ার)’, খুশবন্ত সিং-এর ‘প্যারাডাইজ অ্যান্ড আদার স্টোরিজ’, নজরুল কবিরের অনুবাদে জন বিংহ্যামের রহস্য উপন্যাস ‘মার্ডার প্ল্যান সিক্স’ নালন্দা অনুবাদ সেল থেকে অনূদিত জেমস হেডলিচেজের রহস্য উপন্যাস ‘কাম ইজ গো ইজি’সহ চল্লিশটি অনুবাদ গ্রন্থ। অন্বেষা থেকে অব্দুল্যাহ আদিল মাহমুদের অনুবাদে প্রকাশিত হয়েছে স্টিফেন হকিং ও লিওনার্ড ম্লোডিনো যৌথভাবে রচিত ‘অ্যা ব্রিফার হিস্ট্রি অব টাইম’ ও আহমাদ উল্লাহ ফয়সালের অনুবাদে জেমস ডি ওয়াটসনের গ্রন্থ ‘দ্য ডাবল হেলিক্স’, অনিন্দ্য থেকে ড. মোহাম্মদ আবদুর রশীদের অনুবাদে প্রকাশিত হয়েছে হামদুর রহমান কমিশনের বাছাইকৃত প্রতিবেদন ‘৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ স্বাধীন বাংলাদেশের আবির্ভাব : পাকিস্তানের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া’, প্রতীক প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হয়েছে সাযযাদ কাদিরের অনুবাদ গ্রন্থ হোমারের ‘ইলিয়াড’, বিদ্যাপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত হয়েছে ফারহানা আজিম শিউলীর অনুবাদ গ্রন্থ পাওলো কোয়েলহোর ‘দ্য অ্যালকেমিস্ট’, উত্স প্রকাশন থেকে গোলাম কিবরিয়া ভুঁইয়ার অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে জে টি রেংকিনের ‘ঢাকা ডায়েরি : সতেরো ও আঠারো শতকের বাংলা’ এবং কথা প্রকাশ থেকে প্রকাশিত হয়েছে আন্দালিব রাশদীর অনুবাদ গ্রন্থ ‘খুশবন্ত সিং ১ ও ২’ প্রভৃতি।
অমর একুশে গ্রন্থমেলার গতকাল ছিল ২৩তম দিন। গ্রন্থমেলা চলে সকাল এগারটা থেকে রাত নয়টা পর্যন্ত। গ্রন্থমেলায় গতকাল ছিল সকাল এগারটা থেকে বেলা একটা পর্যন্ত শিশুপ্রহর। গতকাল মেলায় নতুন বই এসেছে ১৮৬টি। এদিকে, লেখক বলছি অনুষ্ঠানে নিজেদের নতুন প্রকাশিত গ্রন্থ বিষয়ে আলোচনায় অংশ নেন ইমদাদুল হক মিলন, মঈনুল আহসান সাবের, হাসান আল আবদুল্লাহ, মেহেদী উল্লাহ এবং মিল্টন রহমান।
প্রকাশনা জগতকে আধুনিক করতে পরিষদ গঠনের তাগিদ
গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় বাংলাদেশের প্রকাশনা : অতীত ও বর্তমান শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মাহ্রুখ মহিউদ্দীন। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন ফরিদ আহমেদ এবং এ এফ এম হায়াতুল্লাহ। সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক শামসুজ্জামান খান।
মাহ্রুখ মহিউদ্দিন বলেন, বাংলাদেশের দীর্ঘ প্রকাশনা-ঐতিহ্যের অঙ্গীকারকে ধারণ করে এদেশের প্রকাশকরা উদ্যোগী হয়ে বিশিষ্ট নাগরিক, বিশেষজ্ঞ ও সত্যিকারের পড়ুয়া ব্যক্তিদের নিয়ে একটি পরিষদ গঠন করুক, যারা বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্পের সমস্যার বিভিন্ন দিক নিয়ে ভাববেন, এর অর্থনীতি, রাজনীতির চুলচেরা বিশ্লেষণ করবেন এবং নেতিবাচক পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পথগুলো দেখিয়ে দেবেন। তাদের সুপারিশের ওপর ভিত্তি করে আমরা প্রকাশনা শিল্পকে একটা পেশাদার ভিত্তি দিতে পারবো। এর মাধ্যমে বাংলাদেশে গবেষণা ও সৃজনশীলতার চর্চা বিকশিত হবে এবং সত্যিকারের একটা জ্ঞানভিত্তিক সমাজ আমরা গড়ে তুলতে পারবো।
আরও পড়ুন: ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রলীগের প্যানেল চূড়ান্ত
শামসুজ্জামান খান বলেন, বাংলাদেশের প্রকাশনা-জগত্ দিন দিন বৈচিত্র্যপূর্ণ এবং নব-আঙ্গিকে বিকশিত হচ্ছে। উন্নত প্রযুক্তির সংযোজন এদেশের প্রকাশনাকে দিয়েছে নবতর মাত্রা। তবে কেবল একুশের গ্রন্থমেলাকেন্দ্রিক না হয়ে প্রকাশনা যদি বছরব্যাপী চলমান এবং উদ্ভাবনশীল থাকে তবেই এদেশের প্রকাশনার গুণগত অগ্রযাত্রা নিশ্চিত হবে।
ইত্তেফাক/আরকেজি
