শিমুলের রাজ্যে

আপডেট : ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ২০:২১

বৈষ্ণব কবি রাধারমণ দত্ত, মরমী কবি হাছন রাজা, দুরবীন শাহ ও বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিমের জেলা সুনামগঞ্জ। প্রকৃতির নানা ছোঁয়ায় ভরপুর এই জেলাটি যেসব জায়গার কারণে বিখ্যাত তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ‘শিমুল বাগান’। জেলার ভারত সীমান্তবর্তী উপজেলা তাহিরপুরে জাদুকাটা নদী তীরে এর অবস্থান।

ঘুম ঘুম চোখে আমরা বড়লেখা থেকে সুনামগঞ্জের উদ্দেশ্যে মাইক্রোবাসযোগে রওনা দেই। সুনামগঞ্জ সদরে যখন পৌঁছাই তখন দুপুর সাড়ে ১২টা। খবর পাই বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার পলাশ এলাকায় ব্রিজ ভাঙা। বিকল্প সড়ক দিয়ে উপজেলা সদরে যেতে হয়। এই খবরে সবার কপালে চিন্তার ভাঁজ। এদিকে সকালে না খাওয়ায় অনেকের ক্ষুদায় পেট চো চো করছে। অপরিচত সড়ক। স্থানীয়দের দেওয়া তথ্যমতে সুনামগঞ্জ থেকে রওনা দিলাম। সদর থেকে ৩০ মিনিটের দূরত্ব। অবশেষে অনেক ঝামেলার পর দুপুর ২টায় পৌঁছালাম বিশ্বম্ভরপুরে।

উপজেলায় পৌঁছে খাবার পর্ব শেষ করলাম আমরা। দুপুর ৩টার দিকে তাহিরপুরের শিমুল বনের দিকে ছুটলাম আমরা। ৪টি মোটরসাইকেলে আমরা ৭ জন।

ভাঙা রাস্তা, ধুলা মাড়িয়ে আমাদের মোটরসাইকেল সামনে চলছে। আগের রাতে ওই এলাকায় বৃষ্টি হয়েছিল। বৃষ্টিতে গাছগুলোর পত্রপল্লবে যেন প্রাণ ফিরেছে। পাতা থেকে ধুলো সরে সবুজ ফিরেছে। চারপাশের সৌন্দর্য দেখে মোটরসাইকেল থামিয়ে আমরা ছবি তুললাম।

আনুমানিক ২০ মিনিট মোটরসাইকেলে চলার পর পৌঁছালাম তাহিরপুরে। দেখা মিললো জাদুকাটা নদীর। ওখানকার মানুষের জীবন-জীবিকার একমাত্র উত্স এই নদী। বিজিবি ক্যাম্পের পাশ দিয়েই জাদুকাটা তীরে পৌঁছালাম। বারিক টিলা, শিমুল বাগান আর নিলাদ্রী (শহীদ সিরাজ লেক) যেতে হলে জাদুকাটা নদী পাড়ি দিতে হয়। ধুলা উড়িয়ে তখন ধূ ধূ বালুচরে চলছে মোটরসাইকেল। বালুর রাস্তায় ঝুঁকিতে যাত্রী নিয়ে নদী ঘাটে পৌঁছাচ্ছে মোটরসাইকেল। কেউ নৌকায় নদী পার হচ্ছেন, কেউ আবার নৌকা করে মোটরসাইকেলসহ পার হচ্ছেন।

দূর থেকে দেখা গেল অপরূপ জাদুকাটা নদীর তীরের লাল টকটকে শিমুল বন। যেন আগুন লেগেছে বনে। তবে পথ তখনও বেশ দূরের। মোটরসাইকেলে পাড়ি দিতে হবে জাদুকাটা নদী। নদীতে পানি কম, যতদূর চোখ যায় ধূ ধূ বালুচর। প্রখর রোদ। মোটরসাইকেল থেকে নেমে বালুচরের মধ্যে হাঁটছি। তখন সাড়ে ৩টা। জাদুকাটা নদী পার হয়ে পৌঁছালাম ওপাশের সবুজ বারিক টিলায়। ওপারে কুয়াশায় মোড়ানো মেঘালয় পাহাড়। সবুজ এ পাহাড়ের বুক চিড়ে চলা নীল নদীটি বর্ষায় প্রাণ ফিরে পায়। তখন জাদুকাটা নদীর অপরূপ দৃশ্য দেখতে পর্যটকেরা ভিড় করেন। 

বারিক টিলা থেকে নিচের দৃশ্যটি আরো মুগ্ধকর। ধূসর ছোট-বড় ঢেউ ওঠা বালুর প্রান্তর। সারিসারি নৌকা। নদীর টলটলে জল। শিল্পীর তুলির আঁচড়ে ক্যানভাসে ফুটে ওঠা ছবির মতোই। কেবল মুগ্ধতা বাড়ে। 

টিলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখে যে কেউ বিমোহিত হবে। ওখানে সবাই মিলে স্মৃতি ধরে রাখতে ছবি তুললাম। বারিক টিলা থেকে রওনা করে পৌঁছালাম শিমুল বাগানে। সারিসারি শিমুল গাছে আগুনের ছোঁয়া। আগুন যেন হাওয়ায় ভাসছে। টকটকে লাল শিমুল ফুলে ছেয়ে গেছে পুরো বাগান। ওখানে আগুনের শিমুল ফুল দেখে মনটাই জুড়িয়ে গেল! ডালে ডালে খুনসুটিতে ব্যস্ত পাখিরা। এসব দৃশ্য দেখে যাত্রাপথের সমস্ত ক্লান্তি নিমিষেই উধাও।

জাদুকাটা নদী তীর ঘেঁষে ভারতীয় সীমান্ত লাগোয়া টিলাভূমি। এর নাম লাউড়ের গড়। লাউড়েরগড়ের এই বিশাল শিমুল বাগানটি পর্যটকদের কাছে এখন নতুন আকর্ষণ। এই এলাকাজুড়ে টকটকে লাল শিমুল ফুল গাইছে বসন্তের জয়গান। প্রতিদিন শিমুলের রক্তরাঙা সৌন্দর্য দেখতে অসংখ্য পর্যটক দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে হাজির হন এখানে। এই দিনও এর ব্যতিক্রম ছিল না। একপাশে মরুপ্রায় জাদুকাটার বালুর চর পেরিয়ে বারিক টিলার নৈসর্গিক সৌন্দর্য। অন্যপাশে লাল ফুলের এই বাগান চোখ আটকে থাকে। ইচ্ছে করে আরো কিছুটা সময়, আরো কিছুটা ক্ষণ এখানে কাটুক। প্রকৃতি এখানে আপন সত্তায় উদার।

স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা গেল, ২০০২ সালে টাঙ্গুয়ার হাওর তীরবর্তী লাউড়ের গড় গ্রামে বাণিজ্যিক এই শিমুলের বাগান গড়ে তোলেন বাদাঘাট (উত্তর) ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদীন। তার পরিচর্যায় বেড়ে ওঠে দেশের সবচেয়ে বড় শিমুল বাগান। ২ হাজার ৪০০ শতক জমিতে এই শিমুল বাগান গড়ে তোলেন তিনি। ফাগুনের শুরুতেই হাজার দুয়েক গাছে যখন একই সাথে ফুল ফোটে তখন অসাধারণ এক দৃশ্য পর্যটকদের আকৃষ্ট করে। শিমুল বনের রক্তরাঙা সৌন্দর্যের দেখা মেলে বছরে এই একটি ঋতুতেই। মধু আহরণের টানে ছুটে আসে হরেকরকমের পাখ-পাখালি। বাগান মালিক জয়নাল আবেদীন প্রয়াত হয়েছেন। কিন্তু রয়ে গেছে তার বাগানটি। এখন তার বড় ছেলে সাবেক চেয়ারম্যান আফতাব উদ্দিনের তত্ত্বাবধানে শিমুল গাছের ফাঁকে ফাঁকে লাগানো হয়েছে লেবু গাছ, এতে বাগানের সৌন্দর্য বৃদ্ধি পেয়েছে কয়েকগুণ।

এখন বিকেল। শিমুল রাজ্যের মায়া ছেড়ে এবার ফেরার পালা। মোটরসাইকেল চালকরা নিয়ে গেলেন তাহিরপুরের আরেক পর্যটন স্পট ‘শহীদ সিরাজ লেকে’। যদিও এর পরিচিতি ‘নিলাদ্রী’ নামে। নিলাদ্রী (শহীদ সিরাজ) লেকে যাওয়ার রাস্তার অন্তত ২০০ গজ ওপারে ভারতের কাটাতারের বেড়া। দৃষ্টিনন্দন চুনা পাথরের বড় বড় পাহাড়। এর সৌন্দর্যে চোখ জুড়িয়ে যায়। চোখ জুড়ানো অসংখ্য দৃশ্যপটে ভরা এক পর্যটন স্থান।

আমরা পৌঁছালাম নিলাদ্রী লেকে। ওপরে নীল আকাশ। আর আকাশের সব নীল যেন গিয়ে ঠেকেছে লেকের পানিতে। চোখের সামনে বিশাল পাহাড় আর পাশে সুবজে ভরা লেকের মাঠ। যেন প্রকৃতিপ্রেমী শিল্পীর হাতে আঁকা এক ছবি। ততক্ষণে সূর্য পশ্চিম আকাশে হেলেছে। অস্তগামী সূর্যের আলো পড়েছে লেকের জলরাশিতে। লেকের আকাশে তখন রক্তরঙের হোলি খেলা। অন্য এক আকাশ। সেই রঙ লেগেছে লেকের আশেপাশে। এক নৈসর্গিক দৃশ্য। সবাই অনেক আনন্দের সাথে ছবি তুললাম। সন্ধ্যা নেমেছে। এবার ফিরতে হবে।

তাহিরপুরের বালিয়া ঘাট নতুন বাজার হয়ে বিশ্বম্ভরপুরের দিকে রওনা দিলাম। জাদুকাটা নদী পৌঁছানোর আগেই সন্ধ্যা হয়ে গেল। নৌকায় আমরা নদী পাড়ি দিচ্ছি। এই সময় গলা ছেড়ে একজন বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিমের ‘কেন পীরিতি বাড়াইলারে বন্ধু ছেড়ে যাইবা যদি’ গান ধরলেন। গান শুনতে শুনতে নদী পাড়ি দিলাম। প্রকৃতির অংশ বলেই কি-না মানুষ সেই প্রকৃতির কাছেই বারবার ছুটে যায়।

 

যেভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে বাসে করে যান সুনামগঞ্জ, অথবা ট্রেনে যেতে চাইলে প্রথমে ট্রেনে করে সিলেট যেতে হবে, সেখান থেকে বাস অথবা গাড়ি ভাড়া করে সুনামগঞ্জ শহরে। সুনামগঞ্জের আব্দুজ জহুর সেতুর গোড়া থেকে বাইক অথবা লেগুনায় সরাসরি লাউড়ের গড় চলে যেতে পারবেন। বাইকে জনপ্রতি ভাড়া পড়বে ২০০ টাকা ও লেগুনায় ১৪০০ থেকে ১৫০০ টাকা রিজার্ভ। চাইলে প্রাইভেট গাড়ি নিয়েও চলে যেতে পারেন লাউড়ের গড়। তারপর বালুচর দিয়ে হেঁটে শিমুল বন।’