রপ্তানির জন্য ইএক্সপি ফরম বাতিলের সিদ্ধান্ত হয়েছে। নতুন পদ্ধতিতে এখন ঘরে বসে রপ্তানিকারকরা রপ্তানির জন্য ফরম পূরণ করতে পারবেন। তবে নতুন পদ্ধতির নাম কী হবে সে বিষয়টি এখনো ঠিক হয়নি। রপ্তানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের মনিটরিং কমাতে রপ্তানিকারকদের চাপে এমন সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে জানা গেছে। অন্যদিকে রপ্তানিকারকরা বলছেন, ব্যবসা সহজীকরণের জন্য যেসব তথ্য-উপাত্ত দিতে হয় সেগুলো কমানোর জন্যও ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক ও ব্যবসায়ীসহ তিন পক্ষের মধ্যে এ বিষয়ে কয়েক দফায় মিটিং হয়েছে। রপ্তানির ক্ষেত্রে ইএক্সপি ফরম বাতিল হচ্ছে এ বিষয়ে তিনপক্ষই সম্মত হয়েছে। তবে নতুন পদ্ধতি কেমন হবে সে বিষয়ে একটি মডেল দাঁড় করাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আগামী জুলাই মাস থেকে নতুন পদ্ধতিতে রপ্তানি হবে বলে জানা গেছে। তখন রপ্তানির ক্ষেত্রে ইএক্সপি ফরম পূরণ করতে হবে না। ইএক্সপি ফরম পূরণের ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীরা কাগজের ফরম (হার্ডকপি) পূরণ করে নিয়ে আসার পর রপ্তানিকারক ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে রপ্তানি-সংক্রান্ত ঘোষণা দেয়। এখন সেখানে রপ্তানিকারক সরাসরি বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েব পোর্টালে নির্দিষ্ট ইউজার আইডি ও পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে রপ্তানি-সংক্রান্ত ঘোষণা দেবে। এরপর রপ্তানি পণ্য জাহাজীকরণ হওয়ার আগ পর্যন্ত সেখানে সংশোধন করার সুযোগও থাকবে। এখন কোনো কিছু সংশোধন করতে হলে তাতে অনেক সময়ক্ষেপণ হয়। তবে পণ্য জাহাজীকরণ হয়ে যাওয়ার পর কোনো ধরনের সংশোধন করার সুযোগ পাবেন না রপ্তানিকারকরা।
সাধারণত, বাংলাদেশ থেকে যেকোনো পণ্য বেসরকারিভাবে বিদেশে রপ্তানির ক্ষেত্রে ইএক্সপি ফরম পূরণ করা বাধ্যতামূলক। গ্রাহকের পক্ষ হয়ে সংশ্লিষ্ট অথোরাইজড ডিলার (এডি) ব্যাংক ওই ফরমের মাধ্যমে পণ্য রপ্তানির ঘোষণা দেয়।
এদিকে রপ্তানিকারকদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ যে, রপ্তানি প্রক্রিয়ায় এখন ১৪ ধরনের নথি দিতে হয়। যা ব্যবসায়ীদের জন্য কোনোভাবেই সুখকর নয়। অন্যদিকে এটি রপ্তানিতে দীর্ঘসূত্রিতারও কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এ কারণে গতমাসে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত ‘ইজি অব ডুয়িং বিজনেস’-এর ‘ট্রেডিং অ্যাক্রোস বর্ডার’ সূচকে কাস্টমস ও বন্দরের দক্ষতা বাড়ানোর মাধ্যমে ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়ন শীর্ষক এক সভায় ব্যবসায়ীরা নথির সংখ্যা কমানোর দাবি করেন। ওই সভায় দাবি অনুযায়ী ইএক্সপি ফরম বাতিলের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ইএক্সপি ফরম বাতিল করতে তাদের বৈদেশিক মুদ্রায় লেনদেন নিয়ন্ত্রণ নীতিমালায় প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনতে হবে। এজন্য আগামী মাসে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), রপ্তানি উন্নয়নব্যুরো (ইপিবি), এফবিসিসিআই, এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ (ইএবি), বিজিএমইএ ও বিকেএমইএসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে বৈঠক করবে বাংলাদেশ ব্যাংক।
জানা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের অনলাইন মনিটরিংয়ের কারণে এখন সব ধরনের আমদানি ও রপ্তানির উপর নজর রাখতে পারে বাংলাদেশ ব্যাংক। ফলে এক্ষেত্রে ব্যবসায়ীরা বৈদেশিক মুদ্রা আনা-নেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের অনিয়ম করতে পারে না। আবার পণ্য রপ্তানির ১২০ দিনের মধ্যে অর্থ দেশে না আসলে সরকার ঘোষিত রপ্তানি প্রণোদনাও পান না ব্যবসায়ীরা। ফলে রপ্তানির ক্ষেত্রে ইএক্সপি ফরম পূরণে আপত্তি করেন তারা। তবে নতুন মডেলও যেহেতু অনলাইনের আওতায় থাকবে সেক্ষেত্রে ব্যবসায়ীরা আগে চেয়ে খুব বেশি লাভবান হবেন না বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
এ বিষয়ে এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ (ইএবি) এর প্রেসিডেন্ট আব্দুস সালাম মুর্শেদী বলেন, এখন রপ্তানির ক্ষেত্রে শুক্র শনি মেনে ব্যাংকে গিয়ে ইএক্সপি ফরম পূরণ করতে হয়। নতুন পদ্ধতি চালু হলে রপ্তানিকারকদের জন্য তা অনেক সহজ হবে।
ইএক্সপি ফরম বাতিল করা বিষয়ে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, পৃথিবীর সব জায়গায় আমদানি-রপ্তানির মাধ্যমে অর্থ পাচারের একটি প্রবণতা আছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের অনলাইন মনিটরিংয়ের কারণে অনেক অসাধু ব্যবসায়ী সেটা করতে পারছেন না। তাই ইএক্সপি বাতিল করার জন্য দাবি করছে তারা।
ব্যবসায়ীদের দাবি ছিল, ইএক্সপি ফরম বাতিল করে কেবল বিল অব এক্সপোর্ট দিয়েই রপ্তানি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা সম্ভব। তবে মূল বিষয় হচ্ছে বিল অব এক্সপোর্ট এমন একটি নথি যেটাতে কাস্টমস কর্তৃক রপ্তানি-সংক্রান্ত একটি ঘোষণা থাকে। যেখানে রপ্তানি-সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য থাকলেও কবে নাগাদ পণ্য জাহাজীকরণ করা হবে এবং এর মূল্য কবে নাগাদ আসবে তার উল্লেখ থাকে না। ফলে বাংলাদেশ ব্যাংক কেবলই বিল অব এক্সপোর্টের মাধ্যমে দেশে রপ্তানি মূল্য প্রত্যাবাসিত হলো কি না, তা তদারকি করতে পারবে না।
এদিকে ব্যবসায়ীরা রপ্তানিতে যে ১৪টি নথি দাখিল করার কথা বলছেন, সেসব নথির মধ্যে এমন কয়েকটি নথি রয়েছে, যা রপ্তানিকারক জীবনে একবারই নিয়ে থাকে। পরে কিছু নথি বছর বছর নবায়ন করতে হয়। যেমন, রপ্তানি নিবন্ধন সনদ (ইআরসি), বিন এবং টিআইএন। রপ্তানির সময় এগুলোর নাম্বার দিলেই হয়। এছাড়া লেটার অব ক্রেডিট (এলসি), কন্ট্রাক্ট এবং পারচেজ অর্ডার এই তিনটি নথির যে কোনো একটি প্রয়োজন হয়। রপ্তানি করতে অবশ্যই ইনভয়েস, সার্টিফিকেশন অব অরিজিন, ফ্রেইট সার্টিফিকেট অবশ্যই প্রয়োজন। পণ্য রপ্তানি করে মূল্য দেশে আনতে সংশ্লিষ্ট আমদানিকারক দেশের ব্যাংককে অবশ্যই বিল অব এক্সচেঞ্জ পাঠাতে হবে। এছাড়া কিছু প্যাকিং লিস্ট, বিল অব লেন্ডিংসহ কিছু নথি সময়ে সময়ে দিতে হয়। বর্তমানে ইজি অব ডুয়িং বিজনেস সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১৭৬তম। ভারত এটাতে ৭৭তম অবস্থানে আছে। আর সিঙ্গাপুর রয়েছে ২য় অবস্থানে। তবে আমাদের দেশের ব্যবসায়ীরা সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে এখনই সিঙ্গাপুরের সঙ্গে তুলনা করেন। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে যে বাধাগুলো আছে তা পর্যায়ক্রমে না সরিয়ে একবারে সমাধান করতে গেলে লাভের পরিবর্তে উল্টো ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
