কৃষ্ণ প্রেমে মন মজেছে...

আপডেট : ১৪ অক্টোবর ২০১৪, ১৯:২৮


 
রাজশাহী শহর থেকে ২০ কিলোমিটার পশ্চিমে গোদাগাড়ী উপজেলার প্রেমতলী গৌরাঙ্গবাড়ি ভারত উপ-মহাদেশে বৈষ্ণব ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম তীর্থ স্থান হিসেবে পরিচিত। ১৫৮১/৮২ খ্রীস্টাব্দের দিকে গৌরাঙ্গবাড়িতে মন্দির নির্মাণ ও মহোৎসবের যে আয়োজন শুরু হয়েছিল তা এখনো চলছে। প্রতি বছরের ন্যায় রবিবার সন্ধ্যায় বসেছে কৃষ্ণ প্রেমিকদের তিন দিন ব্যাপী মিলন মেলা। এদিন সন্ধ্যায় শুভ অধিবাসের মধ্যে দিয়ে তিরোভাব তিথি মহোৎসব শুরু হয়। উদ্বোধন করেন শিল্প মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ওমর ফারুক চৌধুরী এমপি। তাঁর সঙ্গে ছিলেন নেপালে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত নিলয় কুমার ভৌমিক, গোদাগাড়ী উপজেলা চেয়ারম্যান ইসহাক আলী ও গোদাগাড়ীর ইউএনও খালিদ হোসেন।
জানা যায়, গত সোমবার অরুণোদয় হতে অষ্ট প্রহরব্যাপি তারক ব্রহ্মনাম সংকীর্ত্তন অনুষ্ঠিত হয়। আজ মঙ্গলবার প্রথম প্রহরে দধিমঙ্গল, দ্বি-প্রহরে ভোগ আরতি ও মহান্ত বিদায়ের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি হয় এবং আগামীকাল বুধবার থেকে ভক্তদের বিদায় শুরুর কথা রয়েছে। তিন দিনব্যাপী খেতুর মেলায় ধর্মীয় আমেজে এবারো বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, ত্রিপুরা, আসামসহ বিভিন্ন প্রদেশ এবং ফ্রান্স, আমেরিকা, নেপাল, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডার ইসকনের লাখো সদস্য বৈষ্ণব নারী-পুরুষর যোগ দিয়েছেন মেলায়। এসেছেন বিপুল সংখ্যক সাধারণ হিন্দু এমনকি মুসলমান ধর্মাবলম্বীও। আগে ভক্তের সংখ্যা কয়েক লাখ ছাড়িয়ে যেত। কিন্তু এখন নানা কারণে ভক্তের সংখ্যা কমেছে।
গৌরাঙ্গদেব ট্রাষ্টি বোর্ডের সম্পাদক শ্যামাপদ সান্যাল জানান, সারা পৃথিবীতে হিন্দু ধর্মাবলাম্বীদের ৬টি ‘ধাম’ রয়েছে। এর ৫টিই ভারতে, বাকী ১টি বাংলাদেশের খেতুরীধামে। এ কারণে প্রতিবছর উৎসবকে ঘিরে দেশ-বিদেশের লক্ষাধিক ভক্তের সমাগম ঘটে খেতুরীধামে। তিনি আরো জানান, পশ্চিমবঙ্গের নদিয়া জেলার শ্রীধাম মায়াপুর চন্দ্রোদয় মন্দিরে ফাল্গুনের দোল পূর্ণিমায় শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভূর তিরোধান তিথি উপলক্ষে সর্বভারতের সর্ববৃহৎ যে বৈষ্ণব মেলার আয়োজন হয় তার পরেই দ্বিতীয় বৃহত্তম বৈষ্ণব মেলা বসে রাজশাহীর প্রেমতলীর খেতুরীধামে। এখানকার তমাল বৃক্ষের নীচে পদ্মা নদীতে শ্রী চৈতন্যদেব স্নান করেছিলেন বলে তীর্থ যাত্রীরা ওই স্থানে স্নান করত খেতুরীর মন্দির দর্শনে যান। তার থেকে একটু দূরে শ্রী নরোত্তম ঠাকুরের ‘ভজনস্থল’ পরিদর্শন করে মনঃক্ষুধা মেটান। যদিও ভোজনালয়ের কোন চিহ্ন এখন আর নেই। আছে কেবল শুধুই স্মৃতি। ট্রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আগত ভক্তদের প্রয়োজনীয় প্রসাদ, বিশুদ্ধ পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ ছাড়া মন্দিরে যাওয়ার সংযোগ সড়কে আলোকসজ্জার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
আলাপে ভক্তরা জানান, শ্রী নরোত্তম ঠাকুরের তিরোধান তিথি কার্ত্তিকে অর্থাৎ লক্ষীপূর্ণিমার প্রতিমা বিসর্জনের নবম দিনে কৃষ্ণ পক্ষের চতুর্থ তিথিতে অধিবাস দিয়ে শুরু বৈষ্ণব মেলার কার্যক্রম। পঞ্চমীতে অষ্ট প্রহর, নাম সংকীর্ত্তন, পরের দিন দধি মঙ্গল। বাংলাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন স্থানসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে হাজার হাজার শুভ্র বসত বৈষ্ণব ধর্মাবলম্বী নারী-পুরুষ ও লাল বসনের সংসার বিরাগী ব্রহ্মচারী হাড়ি-কুড়ি চাল-ডাল পোটলায় বেঁধে এনে তিন দিন অবস্থান করেন গৌরাঙ্গ বাড়িতে। মেলা উপলক্ষ্যে খেতুরীধামে মঞ্চ তৈরি করে প্রসাদ বিতরণ, পুস্তক বিপনী, গ্রন্থ বিতরণ, ধর্মসভা, পদাবলি কীর্তন, নগর সংকীর্তনের আয়োজন চলে। বসে বিভিন্ন পন্যের মেলা। মিলেছে মিঠায় মন্ডাসহ সব ধরণের পণ্য।
ভক্ত কার্তিক রবি দাস ও তপন পাল জানান, বৈষ্ণব ধর্মাবলম্বীরা বিশ্বাস করেন, কলির কৃষ্ণ নিমাই সন্ন্যাসী যে অনাগত শিশুর (শ্রী নরোত্তম দাস ঠাকুর) জন্য শ্রী কৃষ্ণের প্রেমধন নিয়ে এসেছিলেন আজকের গোদাগাড়ী তৎকালীন গৌড় পরগনার অন্তর্গত রাজা কৃষ্ণনন্দ দত্তের রাজ্য পদ্মার তীরে। গচ্ছিত রেখেছিলেন প্রেমধন পদ্মার তীরের তমাল বৃক্ষের নীচে। প্রেম ভরে ডেকে ছিলেন সেই শিশুকে ‘নরা-‘নরা’ বলে। যে ‘নরা’ পরে ১৫৩১ বাংলা ১৫৪০ খ্রীস্টাব্দের কোন এক মাঘী পূর্ণিমার গোধুলী লগ্নে অথবা মাঘী শুল্কা পঞ্চমীতে জন্মেছিলেন খেতুরীধামের রাজা শ্রী কৃষ্ণানন্দ দাস ও শ্রীমতি নারায়নী দেবীর ঔরসে। ছোট বেলা থেকেই শ্রী নরোত্তম ছিলেন ভাবুক। রাজপুত্র রাজসিংহাসনে বসে হবেন রাজা। কিন্তু তিনি সংসার ও ভোগবিলাসের প্রতি ক্রমেই উদাসীন হয়ে পড়লেন। এমন সময় খেতুরীতে অবস্থানকারী জনৈক ব্রাহ্মনের নিকট নবদ্বীপে শ্রী গৌরাঙ্গের আবির্ভাবের কথা শুনে তার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে রাত দিন এ নাম জপ করতে থাকেন। তিনি ব্রাহ্মনের নিকট এ কথাও প্রাপ্ত হলেন যে, শ্রী গৌরাঙ্গ বৃন্দাবনে যাবেন বলে লাখ লাখ লোক সমবিহারে নৃত্য করতে করতে পদ্মার অপর প্রান্তে এসেছিলেন। তাই তিনি পদ্মার ধারে তন্ময় হয়ে চেয়ে থাকতেন। আর বিহব্বল হয়ে ভাবতেন এই বুঝি শ্রী গৌরাঙ্গ হরিবোল ধ্বনিতে ঝংকার তুলে নৃত্য করতে করতে এসে পড়লেন।
প্রচলিত আছে, এক দিবসে শ্রী নরোত্তম পদ্মার জলে স্নান করতে গিয়ে আর বাড়ি ফিরলেন না। রাজপরিবারের লোকজন কোথাও তার খোঁজ পেল না। এরপর পিতাসহ বহু লোকজন দেখতে পেলেন যে একটি বালক পদ্মার ধারে নৃত্য করছে। তবে কেউ বালকটিকে চিনতে পারলেন না। পুত্র পদ্মায় ডুবে মারা গেছে বলে সকলে মাতা নারায়নী দেবীকে স্থির ধারণা দিলেন। পুত্র শোকে অস্থির নারায়নী দেবী ‘নরা নরা’ বলে চিৎকার করে কাঁদতে লাগলেন। বাহ্যজ্ঞান শুন্য ওই বালকটি যে এতক্ষণ নৃত্য করছিল ‘নরা’ ডাক শুনে কঞ্চকিত সম্বিত ফিরে পেয়ে দৌড়ে এসে নারায়নী দেবীর কোলে বসে বলল, ‘মা তুমি কাঁদছ কেন?’ এইতো আমি তোমার ‘নরা’। সমবেত লোকজন বালকের মুখপানে নিরীক্ষন করে আশ্বত হলো হ্যাঁ এই বালকই ‘নরা’। তবে তার গায়ের শ্যামবর্ণ এখন উজ্জল গৌরবর্ণে রূপান্তরিত হয়েছে এবং মনঃমর্ধে উক্ষিত ভারের তরঙ্গাভিখাতে তার মুখের অবয়ব কিছুটা পরিবর্তন ঘটেছে। বাড়িতে ফিরে ‘নরা’ পিতা-মাতাকে বললেন, ‘আমি প্রায় অর্ধচেতন অবস্থায় পদ্মায় স্নান করতে গিয়েছিলাম। স্নান করা মাত্র আমার কি অপরুপ ভাব হলো। আমি দেখলাম যে, গৌরবর্ণ এক পরম সুন্দর বালক নৃত্য করতে করতে আমার কাছে এসে আমাকে আলিঙ্গন করত, আমার হৃদয়ে প্রবেশ করে নৃত্য করাতে লাগলেন। আর আমি কাঁদতে লাগলাম। তারপর আর আমার কিছু মনে নেই। অতঃপর তোমার ক্রন্দন ধ্বনি ও সমধুর ডাক আমার কর্নে প্রবিষ্ট হয়ে সম্বিত ফিরে এলো। পদ্মা তবেই বহু কালের (প্রায় ৭ শত বছর) প্রাচীন হিরহরিৎ তমাল বৃক্ষ যা কালের সাক্ষী হয়ে আজও বিদ্যমান। শ্রী নরোত্তম এই পদ্মা স্নানে স্বয়ং দেহ ধারন করে তাঁকে শ্রী গৌরাঙ্গ গচ্ছিত প্রেমধন দান করে।’
সংশ্লিষ্টরা জানান, শ্রী নরোত্তম ঠাকুর মাত্র ১৬ বছর বয়সে তার বিশাল সম্পদ ও রাজপ্রসাদ ত্যাগ করে বহু কষ্ঠে পদব্রজে দূর্গম পথ পাড়ি দিয়ে শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভূর চরণে আশ্রয় গ্রহনের উদ্দেশ্যে নবদ্বীপ-বৃন্দাবন গমন করেন। কিন্তু তার ভাগ্যে তা মেলেনি। কারণ ততদিনে শ্রী চৈতন্য দেব বৃন্দাবনে তার শিষ্য শ্রী লোকনাথ গোস্বামীকে রেখে অন্যত্র গমন করেছেন। দু’বছর খেদমত করার পর শ্রী লোকনাথ গোস্বামী ব্যবহারে তুষ্ট হয়ে শ্রী নরোত্তমকে দীক্ষা দেন। সেখানে তিনি শ্রী জীব গোস্বামীর নিকট ভক্তিশাস্ত্র অধ্যয়ন করেন। অতঃপর গুরুর আদেশে স্বদেশে ফিরে এসে হরিভক্তি প্রচার ও কীর্ত্তনে আত্মনিয়োগ করেন। তার সাধনা জীবন বৈষ্ণবদের উদ্বুদ্ধ করে। তিনি বাংলাদেশের স্তিমিত প্রায় বৈষ্ণব ধর্মাবলম্বীদের পুনরুজ্জীবন দান করেন। এভাবে তিনি কালক্রমে কৃষ্ণ প্রেমিক বৈষ্ণব সমাজের হয়েছিলেন প্রেমভক্তির মহারাজ। যার অফুরন্ত প্রেম ভান্ডারের জন্য রাজশাহীর গোদাগাড়ীর ওই বাসস্থানের নাম হয়েছিল প্রেমতলী। প্রায় ৫০০ বছরের আগের সে কাহিনী।