সম্পাদকীয় লিখিয়া কী হইবে?

আপডেট : ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ২১:৩০

অগ্নিকাণ্ড লইয়া বারংবার সম্পাদকীয় লিখিলে, সতর্কতামূলক রিপোর্ট প্রকাশ করিলে কি আদৌ কোনো লাভ হয়? যাহাদের সতর্ক হওয়া প্রয়োজন, তাহারা কি এইসকল লেখা কিংবা প্রতিবেদন পড়েন? পড়িয়া সতর্ক হন?  কিংবা সকল কিছুর ঊর্ধ্বে তাহাদের নিজেদের জীবন ও সম্পদের প্রতি কি কোনো ভালোবাসা নাই? বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের ২০১০ হইতে ২০১৮ সাল অবধি প্রাপ্ত পরিসংখ্যান হইতে জানা যায়, দেশে গত ১০ বত্সরে ছোট-বড় অন্তত ১৬ হাজার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটিয়াছে। ইহাতে প্রাণ হারাইয়াছেন ১ হাজার ৫৯০ জন। ফায়ার সার্ভিস বলিতেছে, গত ১০ বত্সরে বড় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাটি ঘটিয়াছিল ২০১০ সালে, পুরাতন ঢাকার নিমতলীতে। ইহাতে নিহত হন ১২৪ জন। ইহার পরের বত্সর সাভারের আশুলিয়ায় তাজরীন ফ্যাশনসের অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারান ১১১ জন। আর ২০১৬ সালে টঙ্গীর টাম্পাকো ফয়েলস কারখানার অগ্নিকাণ্ডে মারা যান ৪১ জন। সম্প্রতি চকবাজারে যে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটিল, তাহার কয়েকদিন পূর্বেই শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। নিমতলী ট্রাজেডির অনুরূপ পরিবেশেই নয় বত্সর পর বিধ্বংসী আগুন লাগে চকবাজারে।

সকল ধরনের সতর্কতা বজায় রাখিবার পরও অনেক ক্ষেত্রে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটিতে পারে। কিন্তু কোনো এলাকা বা প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ যখন ভয়ানক অগ্নিকাণ্ডের জন্য সামান্য স্ফুলিঙ্গের অপেক্ষায় থাকে, তখন সেই পরিবেশকে বারুদের স্তূপ ছাড়া আর কী বলা যায়? আমরা দেখিয়াছি, নিমতলী হইতে শিক্ষা গ্রহণ করে নাই চকবাজার। চকবাজারে এখন অনিয়মতান্ত্রিকভাবে সংরক্ষিত দাহ্য রাসায়নিক পদার্থ অপসারণের অভিযান চলিতেছে। কিন্তু ইহার পর কি নিয়মিত নজরদারি করা হইবে, যাহাতে এই ধরনের দাহ্যপদার্থ অবৈধভাবে সংরক্ষণ করা না হয়? একটি পরিসংখ্যান হইতে জানা যায়, গত পাঁচ বত্সরে দেশে অগ্নিকাণ্ডে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হইয়াছে। বিগত ১০ বত্সরে কেবল রাজধানীতে বহুতল ভবন বৃদ্ধি পাইয়াছে ৫১৪ শতাংশ। কিন্তু এইসকল ভবনে কতটুকু অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করা গিয়াছে? একটি ভবনের মাটির নিচের জলাধারের ধারণক্ষমতা, অবস্থানকারীর সংখ্যা, প্রবেশদ্বারের প্রশস্ততা, স্মোক/হিট ডিটেক্টর, মেঝের আয়তন, জরুরি নির্গমন সিঁড়ি, লিফট ইত্যাদি বিষয় যাচাই করিয়া সাধারণত অগ্নিঝুঁকি নিরূপণ করা হয়। অনেক প্রতিষ্ঠানেই নামকাওয়াস্তে ডিস্টিংগুইশার বা অগ্নিনির্বাপক থাকিলেও ফায়ার অ্যালার্ম বা হিট ডিটেক্টর নাই। কেবল তাহাই নহে, ওইসকল ডিস্টিংগুইশার প্রকৃত বিপদের সময় কাজ করিবে কিনা, অগ্নিকাণ্ডের সময় তাত্ক্ষণিকভাবে উপস্থিত ব্যক্তিরা ওই সকল ডিস্টিংগুইশার চালাইতে সক্ষম কিনা— অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাহারও কার্যকর কোনো মহড়া বা প্রশিক্ষণ হয় না বলিলেই চলে। 

কেন কীভাবে কী কারণে আগুন লাগে, তাহা প্রায় সকলেই জানেন। কী কী ধরনের সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে হইবে—তাহাও প্রায় সকল প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজমেন্টের লোকজন জানেন। ইহার পরও দুর্ভাগ্যজনক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা বৃদ্ধির মূলে রহিয়াছে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের উদাসীনতা ও অবহেলা। স্ব স্ব প্রতিষ্ঠানেরই গ্যাসলাইন, বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ও অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ঠিক আছে কিনা—তাহা নিয়ম করিয়া যাচাই করা নিশ্চয়ই খুব কঠিন কাজ নহে।