তারুণ্যের জেগে ওঠা প্রয়োজন

আপডেট : ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ২১:৩২

বাংলাদেশ একটি স্বাধীন দেশ, বিশ্বের বুকে যার আছে একটি স্বাধীন পরিচয়, যার অস্তিত্ব ছাড়া আমাদের পরিচয় কল্পনা করা যায় না। আমাদের এই দেশটা যাকে অর্জন করতে গিয়ে অনেক রক্ত দিতে হয়েছে, লক্ষ লক্ষ মা-বোনের ইজ্জত হারাতে হয়েছে, অনেকে পিতৃ-মাতৃহারা হয়েছে, তবুও তারা মাথা নত করেনি, বিশ্বের বুকে অসহায়, ভূলুণ্ঠিত মানুষকে কিভাবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হয়, তার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রেখেছেন আমাদের পূর্বপুরুষেরা। তাদের সংগ্রামের ইতিহাস স্বর্ণাক্ষরে আজ ইতিহাসের পাতায় লিপিবদ্ধ, আমরা সেই ইতিহাস জানার কত সুযোগ পাচ্ছি, কিন্তু জেনে কতটুকু অনুপ্রেরণা পাচ্ছি তরুণ প্রজন্মরা?

দুঃখের বিষয় আমাদের পূর্বপুরুষদের চেতনা আজ পরীক্ষার খাতায় নম্বর পাওয়ার বিষয়বস্তু হয়ে গেছে, মঞ্চে ভালো বক্তা হওয়ার বিষয়বস্তু হয়ে গেছে, কিন্তু প্রকৃত শিক্ষা লাভের বিষয় হচ্ছে না। প্রকৃত শিক্ষা লাভের বর্তমান বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে পাশ্চাত্য সংস্কৃতি, পাশ্চাত্য ভাবধারা। এখন অনেকে বলতে পারে আধুনিক যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে গেলে উন্নত দেশকে অনুসরণ তো করতেই হবে। তখন বলতে হয়, উন্নত দেশকে অনুসরণ করা মানে নিজের দেশের ঐতিহ্য, সংস্কৃতিকে ভুলে যাওয়া নয়।

আধুনিক যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে গেলে অন্য সংস্কৃতির ধারক, বাহক হতে হয় না। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় ইরানি, ভুটানি, ইংরেজ জাতির কথা, তারা নিজ ঐতিহ্য সংস্কৃতি সম্পর্কে খুবই সচেতন আর অনেক শ্রদ্ধাশীল। এর মানে তারা কি আধুনিক না? আরও কয়েকটা বিষয় হলো, যে ভাষা আমাদের আত্মার সঙ্গে এক হয়ে গেছে, যে ভাষার বিনিময়ে অন্যতম জাতি হিসেবে আমরা বাঙালিরাই সংগ্রাম করেছি, সেই ভাষাকে আজ আমরা নানাভাবে ব্যঙ্গ, বিদ্রূপ করছি, কথায় কথায় ইংরেজির বুলি ছড়াচ্ছি বাংলাভাষার মধ্যে। আমাদের মনে কি প্রশ্ন আসে না যে, ইংরেজি জাতি আমাদের বাংলাভাষাকে তাদের ভাষায় কতটুকু প্রয়োগ করছে?

এখন অনেকে এই ব্যাপারে বলে, বাংলায় তো বিভিন্ন দেশের পারিভাষিক শব্দ প্রচলিত, অতএব সেই শব্দ কিভাবে বাদ দিবো? আবার এও বলে বাংলাভাষা নাকি জগাখিচুরি ভাষা।

হ্যাঁ, এক্ষেত্রে বলতে হয় পারিভাষিক শব্দ আছে, এর মানে সবই তো আর পারিভাষিক শব্দ না। এখন আমাদের ভাষার এরকম অবস্থা দাঁড়িয়েছে, ইংরেজিকে ব্যবহার করছি মাতৃভাষা হিসেবে আর বাংলাকে ব্যবহার করছি পরিভাষা হিসেবে। আর বিদেশি বিলাসিতা এবং তাদের ভাবধারা আমাদের অঙ্গে এমনভাবে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে গেছে, যেন শক্ত আঠাকেও হার মানাবে। এখন বিদেশি প্রসাধনী আর দ্রব্য ছাড়া আমাদের কল্পনা করা যায় না, হায়রে বিলাসিতা!

আমরা বুদ্ধিমান জাতি, কিন্তু বুদ্ধিকে কাজে লাগাই যত দুর্নীতিমূলক কাজ আছে, সেসব ক্ষেত্রে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, আমাদের পূর্বপুরুষেরা কি এরকম ধ্যান-ধারণা আর চেতনার ধারক-বাহক ছিল? আমাদের স্বাধীনতা, আমাদের মুক্তভাবে প্রাণভরে শ্বাস নেওয়ার ব্যবস্থা আমাদের পূর্বপুরুষেরা ঠিকই করে দিয়েছে, কিন্তু স্বাধীনতাকে আমরা আজ কতটুকু দাম দিচ্ছি? ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে স্বাধীনতা, ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে বাঙালি চেতনা। আমরা দেখতে বাঙালি কিন্তু কাজ-কর্মে পরিচয় দিচ্ছি পাশ্চাত্য জাতির।

আমাদের দেশে যতটুকু সম্পদ আছে, তার যথাযথ ব্যবহার করতে পারলে, আমাদের জনসম্পদকে জনশক্তিতে রূপান্তরিত করতে পারলে একশ শতাংশ আমরা উন্নত জাতি হিসাবে বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবো। আমাদের যে মেধা আছে, তার যথাযথ ব্যবহার করতে পারলে সবচেয়ে উর্বর মস্তিষ্কের জাতি হিসাবে পরিচয় তুলে ধরতে পারবো। আর আমরা তো সাহসী জাতি, যার পেছনে আছে আমাদের পূর্বপুরুষেরা, তাদের আত্মা কি আমাদের আত্মার মধ্যে বিরাজমান নয়? অবশ্যই বিরাজমান, কেবল আবার সেই দীপ্তিময়তায় জাগানোটা বাকি।

আমরা প্রমাণ করবো আমরা বাঙালি কিন্তু আমরা ভিক্ষুক না। আমরা বাঙালি, আমাদের ভাষা আছে, যাকে আমরা প্রাণভরে ভালোবাসি যা আমাদের আত্মা। এই আত্মায় কখনো কলঙ্ক লাগতে দিবো না। আমরা বাঙালি, আমাদের আত্মা বাংলা বর্ণমালার ছাপে বর্ণিত, আমরা বাংলাকে ভালোবাসি।

তাই আমরা তরুণরা, আমরা বাঙালিরা আবার জেগে উঠবো যেভাবে জেগে উঠেছিল সূর্যসেন, ক্ষুদিরাম, প্রীতিলতা, মহাত্মা গান্ধী, নেতাজী সুভাষ বসু, শেরে বাংলা এ. কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, ভাসানী, কাজী নজরুল ইসলাম, সুকান্ত ভট্টাচার্য, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও মুক্তিকামী বাঙালি।

তাই সৈয়দ শামসুল হকের ‘নুরূলদীনের কথা মনে পড়ে যায়’ কবিতায় নুরূলদীনের সেই ডাকে আবার জেগে উঠবো—

জাগো বাহে, কোনঠে সবাই

n লেখক:শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়