রাজধানীর ক্যামব্রিয়ান স্কুল অ্যান্ড কলেজের ছাত্রাবাস থেকে জাহিদুল ইসলাম রায়হান (১৭) নামের এক শিক্ষার্থীর লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। শুক্রবার সকালে প্রতিষ্ঠানটির ভাটারা বাঁশতলা নতুন বাজারের ছাত্রাবাসের ষষ্ঠ তলার একটি কক্ষ থেকে ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়। জাহিদুল ক্যামব্রিয়ান কলেজের ৬ নম্বর শাখার উচ্চ মাধ্যমিক দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র ছিল। কলেজ কর্তৃপক্ষের দাবি— জাহিদুল আত্মহত্যা করেছে। তবে মৃতের পরিবারের দাবি, শিক্ষকদের নির্যাতনের কারণে জাহিদুল আত্মহত্যা করেছে। এ ঘটনায় অভিযুক্ত দুই শিক্ষক ওমর ফারুক ও আশরাফুল ইসলামকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করেছে ভাটারা থানা পুলিশ।
মৃত রায়হানের একজন সহপাঠী বলেন, বৃহস্পতিবার হোস্টেল সুপার রায়হানের ব্যাগ তল্লাশি করে সিগারেট পান। এরপর তাকে তিনি মারধর করেন। শুক্রবার ভোরে রায়হানকে ঘুম থেকে তুলতে গিয়ে তাকে রুমে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখে পুলিশকে জানায় হোস্টেল কর্তৃপক্ষ। সংবাদ পেয়ে পুলিশ এসে রায়হানের মরদেহ উদ্ধার করে।
ক্যামব্রিয়ান কলেজের বারিধারা শাখার উপাধ্যক্ষ মাহবুব হাসান বলেন, শুক্রবার সকালে ছাত্রাবাসের ষষ্ঠ তলার শেষ প্রান্তের একটি কক্ষে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় জাহিদুলের লাশ পাওয়া যায়। এর পরই পুলিশকে খবর দেয়া হয়। খবর পেয়ে পুলিশ লাশ উদ্ধার করে।
রায়হানের সহপাঠীরা জানায়— ক্যামব্রিয়ান স্কুল অ্যান্ড কলেজের দুই শিক্ষকের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়ে জাহিদুল ইসলাম রায়হান আত্মহত্যা করেছে। তারা জানায়— বৃহস্পতিবার রাতে ধূমপানের অভিযোগে শিক্ষার্থী জাহিদুল ইসলাম রায়হানকে মারধর করে হোস্টেল সুপার ওমর ফারুক ও সহকারী সুপার আশরাফুল ইসলাম। অভিভাবক ডেকে তাকে কলেজ থেকে টিসি দিয়ে বের করে দেয়ারও সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এই অপমান ও নির্যাতন সইতে না পেরে শুক্রবার ভোরে জাহিদুল তার নিজ কক্ষে আত্মহত্যা করেছে। তারা জানায়— জাহিদুলের বাবা-মা আসার কথা ছিল। আর তা নিয়ে রাতভর চিন্তার মধ্যে ছিল রায়হান। রায়হানের মৃত্যুর জন্য শিক্ষকদেরই দায়ী করলেন চাচাতো ভাই তারেক মাহমুদ।
তারেক মাহমুদ বলেন— রায়হানের ওপর নির্যাতন চালানো হয়েছে। অভিভাবককে ডেকে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার হুমকি দেয়া হয়। পুরো ব্যাপারটা সহ্য করতে না পেরেই আত্মত্যার পথ বেছে নেয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তবে নির্যাতনের বিষয়টি অস্বীকার করেছেন দুই শিক্ষক। হোস্টেল সুপার ওমর ফারুক বলেন— তার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ করা হচ্ছে তা সত্য নয়। তিনি সবার সাথেই ভালো ব্যবহার করেন।
হোস্টেল কর্তৃপক্ষ জানান— জাহিদুল ইসলাম হোস্টেলের ৬০৮ নম্বর কক্ষে থাকতেন। ৬১৩ নম্বর কক্ষের ছাত্ররা ছুটিতে রয়েছেন। সকাল ১০টার দিকে ওমর ফারুক ও তার সহকারি আশরাফ আলী গিয়ে দেখেন— ৬১৩ নম্বর কক্ষে ফ্যানের সঙ্গে বিছানার চাদর গলায় প্যাঁচানো অবস্থায় ঝুলছে জাহিদুল। পরে পুলিশে খবর দিলে পুলিশ গিয়ে লাশ উদ্ধার করে।
জাহিদুলের বাবার নাম শাখের উল্লাহ। পেশায় ব্যবসায়ী । বাড়ি কক্সবাজার জেলার খুরসকুলের দক্ষিণ বেলপাড়ায়। ২ ভাই, ২ বোনের মধ্যে জাহিদুল দ্বিতীয়।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গে জাহিদুলের চাচা হেলাল উদ্দিন হাসান জানান— তিনি নিজেও এক সময় ক্যামব্রিয়ান কলেজে পড়ালেখা করেছেন। ওই হোস্টেলে ধূমপান নিষিদ্ধ। বৃহস্পতিবার জাহিদুলের কাছে এক প্যাকেট সিগারেট পান হোস্টেল সুপার ওমর ফারুক। এ নিয়ে হোস্টেল সুপার তাকে বকাঝকা করেন। অভিভাবক ডেকে তাকে কলেজ থেকে টিসি দিয়ে বের করে দেয়ারও সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। জাহিদুলের বাবা অনেক কড়া লোক। সিগারেটের বিষয়টি তিনি জানতে পারলে সমস্যা হবে ভেবে হয়তো চিন্তায় পড়ে জাহিদুল। এ কারণে আত্মহত্যা করে থাকতে পারে বলে মনে করছেন তিনি।
ভাটারা থানার ওসি সারওয়ার হোসেন জানান— প্রাথমিকভাবে এটাকে আত্মহত্যা বলে মনে হচ্ছে। মানসিকভাবে নির্যাতন করা হয়েছে কি না, বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। হোস্টেল সুপার ও তার সহকারীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
উল্লেখ্য, এর আগে গত ১৫ আগস্ট ক্যামব্রিয়ানের গুলশানের ছাত্রীনিবাস থেকে নাঈমা বিনতে নাহিদ (১৪) নামের এক শিক্ষার্থীর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। নাঈমা ক্যামব্রিয়ানের স্কুল শাখার দশম শ্রেণিতে পড়ত। ওই ঘটনাটিকেও আত্মহত্যা বলে দাবি করে ক্যামব্রিয়ান কর্তৃপক্ষ।
