নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলেছেন, ‘পিলখানা হত্যাকাণ্ড ছিল স্বাধীনতার পক্ষের শক্তির বিরুদ্ধে স্বাধীনতা বিরোধী শক্তির সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র। নবগঠিত আওয়ামী লীগ সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে দেশকে অস্থিতিশীল করাই ছিল এর লক্ষ্য।’ গতকাল রবিবার পিলখানা হত্যাকাণ্ডের ১০ বছর পূর্তি উপলক্ষে জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে ‘পিলখানা হত্যাকাণ্ড নিয়ে প্রচার-অপপ্রচার’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় বক্তারা এ কথা বলেন। বাংলাদেশ অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট ফোরাম (বোয়াফ) এই সভার আয়োজন করে। বক্তারা আরো বলেন, ২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় বিডিআর বিদ্রোহ নিয়ন্ত্রণে সেনা অভিযান চালানো হলে সারাদেশে গৃহযুদ্ধ লেগে যেত। প্রসঙ্গত, ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের মাত্র ২২ দিনের মাথায় ২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়। হত্যা করা হয় সেনাবাহিনীর উচ্চ পর্যায়ের ৫৭ জন চৌকস অফিসারসহ মোট ৭৪ জন নিরীহ মানুষকে।
মেজর জেনারেল (অব) মোহাম্মদ আলী সিকদার বলেন, ‘ষড়যন্ত্রকারীদের উদ্দেশ্য ছিল নবগঠিত আওয়ামী লীগ সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা।’ তিনি বলেন, ষড়যন্ত্রকারীরা দেশে নৈরাজ্য ও গৃহযুদ্ধ সৃষ্টি করতে তত্কালীন বাংলাদেশ রাইফেলস (বিডিআর)-এর সৈন্যদের তথাকথিত বিদ্রোহ মঞ্চায়নের জন্য জড়ো করেছিল। আর এ বিদ্রোহ চলাকালে তারা একই সঙ্গে বিভ্রান্তিকর অপপ্রচার চালানোর চেষ্টা করে। তিনি বলেন, পিলখানা বিদ্রোহ নতুন সরকারকে এক কঠিন পরীক্ষার মুখে ঠেলে দেয়, যা সরকার সফলভাবে উতরে যেতে সক্ষম হয়। তিনি বলেন, ২০০ বছরের পুরানো বাহিনীতে হঠাত্ করেই বিদ্রোহ হয়নি। এটি পূর্বপরিকল্পিত। ষড়যন্ত্র ছাড়া এতো বড় হত্যাকাণ্ড হতে পারে না। তিনি বলেন, অনেকে বলেন- সেনা অভিযান হলে এতো হত্যাযজ্ঞ হতো না। এটি ঠিক নয়। কারণ ঘটনার দিন এক ঘণ্টার মধ্যে সেনা সদস্যদের হত্যা করা হয়। এছাড়া বিদ্রোহীদের কাছে মর্টার সেলসহ ভারী অস্ত্র ও গোলাবারুদ ছিল। যদি সেনা অভিযান চালানো হতো তাহলে বিদ্রোহীরা নিজেদের বাঁচাতে হামলা করতো। সারাদেশে ৪৮টি ব্যাটিলিয়নে সংঘর্ষ ছড়িয়ে যেতো। এতে সাধারণ লোকজনের হতাহতের সংখ্যা বাড়তো। ওই ঘটনার পর ৪০ জন সেনা সদস্য জীবিত বেঁচে আসেন। তারাও মারা যেতেন। অর্থাত্ বিডিআর বিদ্রোহে সেনা অভিযান না করা সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল।
মেজর জেনারেল (অব) আব্দুর রশিদ বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাজনৈতিক মেধা, ধৈর্য ও বুদ্ধিমত্তা দিয়ে বিদ্রোহ নিয়ন্ত্রণ করেন, বৈশ্বিক পরিমণ্ডলেও প্রশংসিত হয়।’ জাতীয় প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি মুহম্মদ শফিকুর রহমান এমপি বলেন, ‘পিলখানা হত্যাকাণ্ডের ঘটনা সেদিন মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তি রাজনৈতিক মেধায় নিয়ন্ত্রণ করেছিলেন। অথচ বিএনপি-জামায়াত চক্র তা মেনে নিতে পারেনি। তারা সেদিনও অপপ্রচার চালিয়েছিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে। এখনো চালাচ্ছে।’ তিনি বলেন, তারা এখনো অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু তাদের সেই অপপ্রচার কোনো কাজে আসছে না।’ আবদুর রশিদ বলেন, এ ধরনের হত্যাকাণ্ড সব সময় রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হয়। যেমনটা হয়েছিল ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। এটি কারা ঘটিয়ে থাকে? বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিশ্বের কট্টর ও মৌলবাদীরা এ ধরনের ঘটনা ঘটিয়ে থাকে। আমাদের এখানে যে ঘটনা ঘটেছে তাতে কট্টর ও স্বাধীনতা বিরোধীদের মদদ রয়েছে। তিনি আরও বলেন, অনেকে বলে থাকে সেনা অভিযান না করা ভুল সিদ্ধান্ত ছিল। সেনা অভিযান করলে এত হত্যাযজ্ঞ হতো না। তাদের এ বক্তব্য ঠিক নয়। এটি একটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে অপপ্রচার বলে মনে করেন তিনি।
সম্প্রীতি বাংলাদেশের আহ্বায়ক পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘পিলখানা হত্যাকাণ্ড ছিল একটি অভিনব ষড়যন্ত্র। সেদিন ভ্রান্ত রাজনীতিবিদরাই সেনাবাহিনীর সদস্যদের উস্কানি দেওয়ার জন্য লিফলেট বিতরণ করেছিল।’ পিলখানা হত্যাকাণ্ডের প্রচার-অপপ্রচার শীর্ষক আলোচনা সভাটিতে সভাপতিত্ব করেন আয়োজক সংগঠনের সভাপতি কবীর চৌধুরী তন্ময়। সঞ্চালনা করেন আয়োজক সংগঠনের সদস্য তুলি হোসেন। সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং জনসংযোগ পরিচালক ড. মিল্টন বিশ্বাস। আরও বক্তব্য রাখেন- ফয়সাল আহসান উল্লাহ, মতিউর রহমান নান্টু, অধ্যাপক সিদ্দিকুর রহমান, অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম, এম এ জলিল, জহুরুল কাইয়ূম প্রমুখ।
