হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়া বাংলাদেশ বিমানের একটি ফ্লাইট ছিনতাইয়ের কবল থেকে রক্ষা পেয়েছে। একজন অস্ত্রধারী বিমানের ক্রু ও যাত্রীদের জিম্মি করে বিমানটি অন্যদিকে নিয়ে যেতে চাইছিলেন। পরবর্তীতে পাইলট বিমানটি চট্টগ্রামের হযরত শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করান। সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর কমান্ডোরা অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে বিমানে অভিযান চালায়। সেখান থেকে অস্ত্রধারী ওই যুবককে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় বের করে আনেন তারা। পরে যুবকের নাম মাহাদী বলে জানা যায়। ঢাকার শাহজালাল বিমানবন্দরের নিরাপত্তার বেড়াজাল ডিঙিয়ে অস্ত্র নিয়ে রবিবার বিমানের দুবাইগামী ফ্লাইটে উঠে পড়েন ওই ব্যক্তি। বিমানের বোয়িং ৭৩৭ মডেলের ‘ময়ূরপঙ্খী’ নামের ওই উড়োজাহাজটিতে ১৪৩ যাত্রী এবং ৫ ক্রু ছিলেন।
সেনাবাহিনীসহ বিভিন্ন সংস্থার ব্রিফিংয়ে জানা যায়, বিকাল ৫টা ১৩ মিনিটে বিমানের বিজি-১৪৭ ফ্লাইটটি ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের উদ্দেশে যাত্রা করে। সেখানে কিছু যাত্রী নামিয়ে এবং অপেক্ষমাণ যাত্রীদের নিয়ে বিমানটির দুবাই যাওয়ার কথা ছিল।
উড়োজাহাজটিতে থাকা একাধিক ক্রু ও যাত্রী ঘটনার বিবরণ দিয়ে জানিয়েছেন, আকাশে ওড়ার পরপরই উড়োজাহাজটি ছিনতাইয়ের চেষ্টা করা হয়। একজন কেবিন ক্রু বলেন, ময়ূরপঙ্খী আকাশে প্রায় ১৫ হাজার ফুট ওপরে আসার পর উড়োজাহাজের ভেতরে যাত্রীদের আসনে থাকা এক ব্যক্তি উঠে ককপিটের দিকে আসেন। এ সময় ওই ব্যক্তি এক ক্রুর কাছে যান। তিনি ওই ক্রুকে ধাক্কা দেন এবং সঙ্গে সঙ্গে একটি পিস্তল ও বোমাসদৃশ একটি বস্তু বের করে বলেন, ‘আমি বিমানটি ছিনতাই করব। আমার কাছে পিস্তল ও বোমা আছে। ককপিটের দরজা না খুললে আমি বিমান উড়িয়ে দেব।’ এর মধ্যে অন্য কেবিন ক্রুরা ককপিটে থাকা ক্যাপ্টেন ও ফার্স্ট অফিসারের কাছে গোপনে সাংকেতিক বার্তা দেন যে উড়োজাহাজে অস্ত্রধারী আছে, উড়োজাহাজ ছিনতাইয়ের চেষ্টা হচ্ছে। ঠিক এ সময় উড়োজাহাজটি চট্টগ্রাম ও ঢাকার মাঝামাঝি জায়গায় অবস্থান করছিল।
ওই ক্রু বলেন, এর মধ্যে ক্যাপ্টেন মো. শফি ও ফার্স্ট অফিসার মো. জাহাঙ্গীর চট্টগ্রামগামী উড়োজাহাজটির ককপিটের দরজা বন্ধ করে দেন এবং কৌশলে জরুরি অবতরণের জন্য চট্টগ্রাম শাহ আমানত বিমানবন্দরে বার্তা পাঠান। উড়োজাহাজে থাকা একটি সূত্র জানিয়েছে, ককপিটের দরজা না খোলায় অস্ত্রধারী ব্যক্তিটি চিত্কার করছিলেন। একপর্যায়ে ওই অস্ত্রধারী উড়োজাহাজের ভেতরে ‘বিস্ফোরণের’ মতো ঘটান। এরকম পরিস্থিতিতেই বিকাল ৫টা ৩২ মিনিটে উড়োজাহাজটি চট্টগ্রামের শাহ আমানত বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করে। উড়োজাহাজ অবতরণের পর কৌশলে উড়োজাহাজের ডানার পাশের চারটি ইমারজেন্সি গেট দিয়ে যাত্রীরা নেমে পড়েন। ছিনতাইকারী দু’জন ক্রু’কে বিমানের ভেতর জিম্মি করে রাখে। সন্ধ্যা পৌনে ৬টার দিকে প্রথমে পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা বিমানটিকে ঘিরে ফেলে। এ সময় বিমানের ভেতর থেকে গুলির শব্দও পাওয়া যায়।
খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, পুলিশ, র্যাব এবং বিমানবন্দরের নিরাপত্তা সংস্থার লোকজন রানওয়ের দিকে ছুটে যান। ছিনতাইকারীকে ধরতে কমান্ডোরা তাদের কৌশল ঠিক করেন। যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবেলায় অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থাও প্রস্তুত রাখা হয়। ময়ুরপঙ্খী নামের ওই বিমানটি প্রায় নতুন হওয়ায় সেটার যাতে কোনো ক্ষতি না হয় সেদিকেও নজর ছিল কমান্ডোদের। হোলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলার ঘটনা অবসানের নায়ক লে. কর্নেল ইমরুল হাসানের নেতৃত্বে কমান্ডো অভিযান পরিচালিত হয়। এই অভিযানে উদ্ধার হয় জিম্মি হওয়া দুই ক্রু। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় নামিয়ে আনা হয় ছিনতাইকারীকে।
রাত আটটার দিকে বিমানবাহিনীর এয়ারভাইস মার্শাল মফিদুর রহমান সাংবাদিকদের জানান, অভিযুক্ত যাত্রীটি বিমানে অস্ত্র প্রদর্শন করে। সে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলার দাবি জানায়। এ অবস্থায় যাত্রীরা সবাই ভয় পেয়ে যায়। পরে চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে অবতরণের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিমানটি ঘিরে ফেলে। সব যাত্রীকে নিরাপদে নামিয়ে আনা হয়। অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে। অভিযুক্তের কাছে একটি অস্ত্র পাওয়া গেছে। তবে সেটা আসল নাও হতে পারে। আটক ব্যক্তিকে মানসিক ভারসাম্যহীন বলে মনে হয়েছে।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল এম নাঈম হাসান জানান, কমান্ডো অভিযান শুরুর ৮ মিনিটের মধ্যে সন্ধ্যা ৭টা ২৪ মিনিটে বিমানটি মুক্ত করা হয়। রাত ৮টার দিকে সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ছিনতাইয়ের চেষ্টাকারী ব্যক্তিকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় আটক করা হয়েছে। এই ঘটনায় পর সন্ধ্যা পৌনে ৬টা থেকে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিমান চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়। অভিযান শেষে রাত ৮টা পর বিমানবন্দরে উড়োজাহাজ ওঠানামা স্বাভাবিক হয়।
পরে সেনাবাহিনীর ২৪ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি এসএম মতিউর রহমান আরেক ব্রিফিংয়ে জানান, সন্ধ্যা ছয়টার দিকে যৌথ বাহিনীর সমন্বয়ে এক অভিযান পরিচালিত হয়। প্রথমে ওই ছিনতাইকারীকে আত্মসমর্পণ করতে বলা হয়। সে আহবান প্রত্যাখ্যান করে আক্রমণাত্মক হওয়ার চেষ্টা করলে তার ওপর একশনে যাওয়া হয়। পরে গোলাগুলিতে ছিনতাইকারী নিহত হয়। প্রাথমিকভাবে তার নাম মাহাদী বলে জানা গেছে। বয়স ২৫/২৬ এর মতো হবে। তবে তার বিস্তারিত পরিচয় জানা যায়নি। বিমানের কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। বিমানবন্দরের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে সেনাবাহিনী। কেউ আহত হয়নি।
ছিনতাইকারীর সঙ্গে কথোপকথনের বরাত দিয়ে এই সেনা কর্মকর্তা বলেন, ‘ছিনতাইকারীর সঙ্গে আমাদের খুব অল্প সময় ধরে কথা হয়। সে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলতে চাইছিল। তার স্ত্রীর সঙ্গেও কথা বলতে চায়। তবে তার পরিবারের বিস্তারিত কিছু জানায়নি। ফোন নম্বরও দিতে পারেনি। সে যাত্রীদের কোনো ক্ষতি করার চেষ্টা করেনি। তবে কেবিন ক্রুদের জিম্মি করে। পরে তার সব কথা শোনা হবে বলে আশ্বাস দেওয়া হলে সে ক্রুদের মুক্ত করে দেয়।’
এ সময় বিমানের ওই ছিনতাইকারী গুলি ছোঁড়েনি জানিয়ে এই সেনা কর্মকর্তা বলেন, ‘তার কাছে একটি পিস্তল পাওয়া গেছে। তবে সেটা যাচাই বাছাই করে দেখতে হবে। তদন্ত সাপেক্ষে বলা যাবে। তবে সে গুলি ছোঁড়েনি। এরকম একটা ঘটনা ঘটলে উপস্থিত লোকজনের কাছ থেকে নানা ধরনের বিভ্রান্তকর তথ্য ছড়ায়। এটাও সে রকম।’ আরো বিস্তারিত জানার জন্য অপেক্ষা করতে হবে বলে জানান এই সেনা কর্মকর্তা।
এদিকে এ ঘটনায় চট্টগ্রাম শাহ আমানত বিমানবন্দরের যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেকে তাদের নির্ধারিত ফ্লাইট বাতিল করে ফিরে যান।
