পিলখানা হত্যা মামলার রায় লেখা শেষ করেছেন বৃহত্তর বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি মো. শওকত হোসেন। তার লেখা রায়টি বেঞ্চের অপর দুই বিচারক বিচারপতি মো. আবু জাফর সিদ্দিকী ও বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদারের কাছে পাঠানো হয়েছে। জ্যেষ্ঠ বিচারপতির লেখা রায়টি ১১ হাজার ৪১২ পৃষ্ঠার। গতকাল রবিবার রায় লেখার বিষয়টি ইত্তেফাককে নিশ্চিত করেছেন এ মামলার রাষ্ট্রপক্ষের অন্যতম কৌঁসুলি ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল জাহিদ সারওয়ার কাজল। তিনি বলেন, ‘আমরা পূর্ণাঙ্গ রায়ের অনুলিপির অপেক্ষায় আছি। ওই অনুলিপি পেলেই হাইকোর্ট মৃত্যুদণ্ড হ্রাস করে যেসব আসামিকে যাবজ্জীবন দণ্ড দিয়েছে তাদের বিরুদ্ধে আপিল করা হবে। রায়ের অনুলিপি পাওয়ার জন্য ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট শাখায় আবেদন দাখিল করা হয়েছে।’ তিনি বলেন, ২০১৭ সালে রায় ঘোষণাকালে হাইকোর্ট জানায় বেঞ্চের তিন বিচারপতিই আসামিদের দণ্ড প্রদানের ক্ষেত্রে ঐকমত্যে পৌঁছেছেন। তবে তারা আলাদা আলাদা পর্যবেক্ষণ দেবেন। যা মূল রায়ের ভিত্তি হিসাবে গণ্য হবে। সেই হিসাবে বিচারপতি আবু জাফর সিদ্দিকী পর্যবেক্ষণসহ আলাদা রায় লেখবেন। বিচারপতি নজরুল ইসলাম তালুকদার মূল রায়ের সঙ্গে একমত পোষণ করে নিজস্ব পর্যবেক্ষণ দেবেন। পূর্ণাঙ্গ রায় লেখা শেষে তিন বিচারপতির স্বাক্ষরের পরই তা প্রকাশ পাবে।
প্রসঙ্গত পিলখানা হত্যাকাণ্ডে নিম্ন আদালতে সর্বোচ্চ সাজাপ্রাপ্ত ১৫২ জনের মধ্যে ১৩৯ বিডিআর জওয়ানের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখে হাইকোর্ট। মৃত্যুদণ্ড হ্রাস করে যাবজ্জীবন দণ্ড দেওয়া হয় আট জওয়ানকে। আর খালাস পান ৪ জন। এছাড়া নিম্ন আদালতে যাবজ্জীবন পাওয়া ১৬০ জনের মধ্যে ১৪৬ জনের সাজা বহাল রাখা হয়। আর খালাস পাওয়া ৩১ জনকে নতুন করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয় হাইকোর্ট। এছাড়া বিভিন্ন মেয়াদে দণ্ডপ্রাপ্ত ২২ জনের সাজা বহাল রাখে উচ্চ আদালত। ২০১৭ সালের ২৬ নভেম্বর বিচারপতি মো. শওকত হোসেনের নেতৃত্বাধীন তিন বিচারপতির বৃহত্তর বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেন। ওইদিন প্রকাশ্য আদালতে ঘোষিত রায়ে হাইকোর্ট বলেন, অপরাধের ইতিহাসে পিলখানা হত্যাকাণ্ড এক নজিরবিহীন ঘটনা। ৫৭ সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ বেসামরিক নাগরিককে বিডিআর বিদ্রোহীরা নৃশংসভাবে হত্যা করে যে জঘন্য অপরাধ করেছে তা খুবই মর্মান্তিক, বিভীষিকাময়, নারকীয় ও ভয়ঙ্কর। এই অপরাধ সভ্য সমাজের মানুষের কাছে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। বিডিআর জওয়ানদের অপরাধ বর্বরতা ও সভ্যতার সব সীমা ছাড়িয়ে গেছে। রায়ে বলা হয়, বিডিআর বিদ্রোহের মূল লক্ষ্য ছিলো সেনাবাহিনী ও বিডিআরকে সাংঘর্ষিক অবস্থানে দাঁড় করানো। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন নবনির্বাচিত একটি গণতান্ত্রিক সরকারকে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মধ্যে নিপতিত করা। দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা নষ্ট করা।
এদিকে শুধু রাষ্ট্রপক্ষই নয় মামলার দণ্ডিত আসামি ও তাদের পরিবারের সদস্যরাও রায়ের অনুলিপি অপেক্ষায় আছেন। রায়ের অনুলিপি পেলেই হাইকোর্টের দেওয়া দণ্ড বাতিল চেয়ে আপিল বিভাগে তারা আবেদন করবেন।
বিচারের প্রথম ধাপই পেরোয়নি বিস্ফোরক মামলা
পিলখানার ঘটনায় বিস্ফোরক আইনে দায়ের করা মামলাটির বিচার এখনো শেষ হয়নি। কবে শেষ হবে তা জানে না রাষ্ট্র ও আসামি পক্ষের আইনজীবীরা। বর্তমানে এ মামলায় ৭৮ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করেছে ঢাকা মহানগরের বিশেষ ট্রাইব্যুনাল। আগামী ৪ মার্চ পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য রয়েছে। মামলায় ৮৩৪ জন আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দিয়েছে তদন্তকারী কর্মকর্তা। সাক্ষী রয়েছেন ৬৫৪ জন। সকল সাক্ষীর সাক্ষ্য নিয়ে বিচার শেষ করতে কত বছর লাগবে তা নিশ্চিত করে জানে না আসামি ও রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা। রাষ্ট্রপক্ষের অন্যতম আইনজীবী অ্যাডভোকেট শেখ বাহারুল ইসলাম বলেন, বিস্ফোরক মামলায় এখন নিয়মিত সাক্ষ্যগ্রহণ হচ্ছে। এই বছরই মামলাটির বিচার শেষ হয়ে যাওয়া উচিত। আসামি পক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট এম. আমিনুল ইসলাম বলেন, ৭৮ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য নিতেই কেটে গেছে আট বছর। বিচার কবে শেষ হবে জানি না।
প্রসঙ্গত, ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় দণ্ডবিধি এবং বিস্ফোরক দ্রব্যাদি আইনে দুইটি মামলা করা হয়।
