বাংলাদেশ শুধু বাংলা ভাষাভাষীর দেশ নয়, এদেশে বহু নৃ-গোষ্ঠী বসবাস করেন যাদের ভাষা যেমন বাংলা নয়, তেমনি এদেশে বাংলা ভাষাও এক রূপে প্রচলিত নয়। কিন্তু শিক্ষা ব্যবস্থার এককেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি ও নগরকেন্দ্রিক সংস্কৃতিচর্চা ও মিডিয়ার প্রভাবে এক রূপের বাংলাভাষা এবং এক ভাষার বাংলাদেশকে দেখতেই আমরা বেশি অভ্যস্ত। এমনকি আমাদের গবেষণা তত্পরতার ভেতর প্রকাশনায় তেমন গুরুত্ব নিয়ে আঞ্চলিক ভাষা ও সংস্কৃতির দিকটি বিবেচনা করা হয় না। অমর একুশে গ্রন্থমেলা উপলক্ষে প্রকাশিত অসংখ্য গ্রন্থের মধ্যে আঞ্চলিক ভাষার সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক গ্রন্থের সন্ধান করলে হতাশ হতে হয়।
ভৌগোলিকভাবে দেশের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলে কয়েক ধরনের আঞ্চলিক ভাষা রূপ এবং সংস্কৃতি দেখা যায়। যেমন—পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, রংপুর ও নীলফামারী জেলার ভাষা রূপ ও সংস্কৃতির মধ্যে যে ঐক্য রয়েছে তার মধ্যেই চর্চিত হচ্ছে জনপ্রিয় পরিবেশনশিল্প বিষহরির গান বা কান্দনী বিষহরির গান, এই পরিবেশনশিল্পটি মূলত কৃত্যমূলক ও গীতপ্রধান। অন্যদিকে একই এলাকায় প্রচলিত রামায়ণের আখ্যান নিয়ে রামযাত্রার অভিনয় চলে সংলাপাত্মক নাট্যাভিনয়ের রীতিতে, আর এই রীতিতে কাঠের নির্মিত মুখোশের ব্যবহারও থাকে বেশ আকর্ষণীয় ভঙ্গিতে। একই ভৌগোলিক অঞ্চলে অবস্থিত লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধার আঞ্চলিক ভাষার রূপের সাথে তার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যও স্বতন্ত্র্য বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। যেমন—এই অঞ্চলে বাল্মীকি-কৃত্তিবাস ও অদ্ভুত রামায়ণের সাথে লোকায়ত রামকাহিনীর মিশ্রণে পরিবেশিত কুশানগান ও গিদালের আখড়ার আসরে পরিবেশিত রূপকথা বা কিচ্ছাগানের তুলনা অন্য অঞ্চলে মেলে না। ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহী জেলার ভাষা ও সংস্কৃতির মধ্যে কিছু ঐক্য রয়েছে, উক্ত অঞ্চলের ভাষার কাঠামোর সাথে নিবিড়ভাবে যুক্ত রয়েছে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য আলকাপ ও গম্ভীরার পরিবেশনশিল্প। চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহীর ভাষা ছাড়া এই দুটি পরিবেশনরীতিকে যেমন ভাবা যায় না, তেমনি এই দুটি পরিবেশনশিল্পের নৃত্যরীতি, অভিনয়-উপকরণ, পোশাক ইত্যাদি সকল কিছুই আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্যকে ধারণ করেছে।
কুষ্টিয়া জেলার একটি গ্রামে জন্মসূত্রে কুষ্টিয়ার আঞ্চলিক ভাষার মাধুর্য ও শক্তিকে উপলব্ধি করে সে ভাষায় মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট নিয়ে ‘শুরু করি ভূমির নামে’ শীর্ষক নাটক রচনা করেছিলাম। নাটকটি ২০১১-১২ শিক্ষাবর্ষে আমেরিকার শিকাগোর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাউথ এশিয়ান ল্যাঙ্গুয়েজেস অ্যান্ড সিভিলাইজেশনস বিভাগের বাংলার শিক্ষার্থীর জন্য পাঠ্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত হয়। নাটকটি নির্বাচনের কারণ সম্পর্কে অধ্যাপক থিবো দুবের জানিয়েছিলেন— নাটকটি পাঠের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা জানাতে পারবে বাংলাভাষার শুধু একটাই পাঠ্য রূপ নয়। এ ভাষার রয়েছে আঞ্চলিক নানান বৈশিষ্ট্য। এছাড়াও নাটকটি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে রচিত। মূলত সাহিত্যকে (তাদের বিভাগে) পাঠ করা হয় সভ্যতা ও জাতীয়তাবোধের ক্রমবিকাশের ইতিহাস হিসেবে। এ ধরনের মন্তব্য পাঠের পর আঞ্চলিক ভাষার সাহিত্য রচনার বিষয়ে আমাদের ভেতর নতুন পর্যবেক্ষণ জন্ম লাভ করে। কিন্তু বাংলাদেশের বৃহত্তর সাহিত্য সৃষ্টিতে, গবেষণায় ও প্রকাশনায় আঞ্চলিক ভাষা ও সংস্কৃতি, এমনকি এদেশে বসবাসরত বিচিত্র নৃ-গোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতির মহিমাকে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। অথচ বর্তমান বিশ্বে আঞ্চলিক ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির নন্দনতত্ত্বের পাশাপাশি বিচিত্র নৃ-গোষ্ঠীর বিলুপ্তপ্রায় ঐতিহ্যের প্রতি প্রচণ্ড আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে, অমর একুশে গ্রন্থমেলার প্রকাশনশিল্পে সেদিকে গুরুত্ব দেওয়া দরকার।
