কোনো কাজকেই তিনি বোঝা হিসেবে দেখতেন না। কখনো কাজের ফাঁকে ফাঁকে, কখনো সবাই ঘুমিয়ে পড়লে রাত জেগে লিখেতেন। আবার সকালবেলা সকলের আগে বিছানা ছেড়ে উঠে গেছেন, সবার জন্য সকালের খাবার তৈরি করে ফেলেছেন। এসব বিষয়ে অবশ্য ছিল বাবার অতুলনীয় সহযোগিতা। কখনোই বাবাকে দেখিনি মার কাছ থেকে কোনো ব্যক্তিগত সেবা নিতে। সদাসর্বদা এই মানুষটি যেন মার কাজ হালকা করে দিতে অথবা কাজটা এগিয়ে নিতে হাতটা বাড়িয়েই আছেন।
তারাবাগের সেই বারান্দায়ই কচি-কাঁচার মেলার জন্ম। জন্ম ছায়ানট আর রবীন্দ্র জন্ম শতবার্ষিকী উদযাপন আন্দোলনের। সেই বারান্দায় বসেই লেখা হচ্ছে আলজেরিয়ার স্বাধীনতাকামী মানুষের ওপর ফ্রান্সের নির্যাতনের নিন্দাবাণী, শোকবাণী লেখা হচ্ছে প্যাট্রিক লুমুম্বার হত্যাকাণ্ড-রোমেনবার্গ দম্পতির মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে, গড়ে উঠেছে আন্দোলন। দেশের প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, সাংস্কৃতিক আন্দোলন, সব, সবকিছুর প্রস্তুতি। আর শত কাজের মাঝে শান্ত, স্থির, দৃঢ় প্রকৃতির মার সক্রিয় নেতৃত্বদান। এ যেন শুধু তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল।
পুরো ষাটের দশক ধরে অবিশ্রান্ত কাজ। ’৬৯-এর গণআন্দোলনে নেতৃত্বের পুরোভাগে তিনি। চরম অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও পরম আশ্রয়ের হাত বাড়িয়ে দিচ্ছেন রাজনৈতিক কর্মী, ছাত্র-শিক্ষার্থীদের দিকে। লেখক শহীদ সাবের মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তাঁকে পাবনায় পাঠানো হলো। পাবনা হাসপাতাল কিছুদিন পরে জানাল তাঁকে আর চিকিত্সা করার কিছু নেই—তাঁর প্রয়োজন সহানুভূতিশীল সেবাযত্নের আর একটি আশ্রয়ের। সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিলেন একমাত্র আমার মা-বাবাই সেটা দিতে পারেন। সাবের ভাইকে নিয়ে আসা হলো আমাদের বাড়িতে। আমরা ৫ ভাইবোন তখন ছোট। স্কুলের ছাত্র। এরই মাঝে মা নিবিড় স্নেহে, পরম যত্নে সাবের ভাইয়ের দেখাশোনা করতেন। ঢাকার বাইরে থেকে কেউ পড়তে আসবে—থাকার জায়গা নেই, খাবার খরচ চালাবার সংস্থান নেই—সুফিয়া খালাই একমাত্র ভরসা। এমন যে কত মানুষ আমাদের বাড়িতে থেকেছে। মা তাই আজ কোটি মানুষের মা—অথচ আমাদের নিজেদের কখনোই মনে হয়নি আমরা তাঁকে পাইনি। তাঁর বিরাটত্বে, তাঁর ব্যাপ্তিতে এমনই এক অনন্য মহিলা ছিল যে সবাই তাঁকে পূর্ণরূপেই পেত। তাঁকে খণ্ডিত করতে পারে এমন শক্তি যেন পৃথিবীতে নেই। কত সময়, কতজনের কথা তাঁর সামনে আলোচিত হয়েছে—কতজনের নিন্দা করার চেষ্টা করছে অপরজন। মুখের সেই হাসিটি নিয়ে যেন বুঝিয়ে দিতে চাইতেন সবসময়—মন্দ কিছুই নেই। পৃথিবীতে সবচেয়ে সত্য হলো মঙ্গল, সবচেয়ে দামি হলো মানুষের প্রতি বিশ্বাস রাখার মানসিকতা। তাই সবাই তাঁর সঙ্গে কাজ করেছে। কখনোই দলাদলিতে লিপ্ত হতে পারেনি প্রকাশ্যভাবে। কী যে অপার ভালোবাসা ছিল তাঁর সবার প্রতি, কী বিশ্বাস যে শুভবুদ্ধিরই জয় হবে। তাই বলে ঘৃণা কি তিনি কিছুতেই করতেন না?
করতেন। তিনি অন্তরের অন্তস্তল থেকে ঘৃণা করতেন ‘দেশদ্রোহীদের’। ঘৃণা করতেন যুদ্ধাপরাধী রাজাকার-আলবদরকে, ঘৃণা করতেন দেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে যারা ক্ষমতা দখল করে সমস্ত দেশটাকে পিছন দিকে টেনে নিয়ে যেতে চেয়েছে। ঘৃণা করেছেন যারা এখনো শুধুমাত্র নিজের স্বার্থে বাংলাদেশের মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে, ক্ষমতা দখলের জন্য অত্যাচারের চরম নিদর্শন রেখে যাচ্ছে। বলতেন, ‘এরা এত নির্লজ্জ আচরণ করছে, এই নির্লজ্জতার হাত থেকে মানুষ মুক্তি পাক। বাংলাদেশের মানুষ শান্তিতে, মানে-ইজ্জতে বাঁচুক।’ তাই তো তিনি দৃঢ় সিদ্ধান্ত রেখে গেছেন যে, মৃত্যুর পরে কোনো যুদ্ধাপরাধী, স্বাধীনতাবিরোধী রাজাকার তাঁর জানাজা পড়াবে না।
প্রচণ্ড ব্যথায় কষ্ট পাচ্ছেন, জ্বর আসছে, শ্বাসকষ্ট হচ্ছে—এর মাঝেও ধীরে ধীরে আমাকে বলতেন—কে এসেছিল দেখা করতে, কে কী বলে গেল—কে তাঁকে কী দিয়েছে। বলতেন, ‘মাগো, এত মানুষের ঋণ কি আমি শুধতে পারব?’ (অংশ)
সূত্র: সুফিয়া কামাল স্মারকগ্রন্থ/সম্পাদনা :লুত্ফর রহমান রিটন (আগামী প্রকাশনী, ২০০০)
