গতকাল শনিবার দেশজুড়ে বিদ্যুত্ বিপর্যয়ের ঘটনা ঘটে। দিনভর টানা চেষ্টা করেও এ বিপর্যয় কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। এ কারণে সন্ধ্যার পর সারাদেশ অন্ধকার হয়ে পড়ে। রাজধানী ঢাকাও হয়ে ওঠে এক অচেনা নগরী। রাত নয়টা নাগাদ যানবাহন ও মানুষের আনাগোণা অনেক কমে যায়। রাজধানী জুড়ে ভুতুড়ে অবস্থার সৃষ্টি হয়। বিদ্যুতের অভাবে দেখা দেয় পানি সংকট। ব্যাংকগুলোর এটিএম বুথ অচল হয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীদের পড়ালেখা ও বিভিন্ন কাজে বিঘ্ন ঘটে। এতে সীমাহীন দুর্ভোগে পড়েন নগরবাসী।
জানা গেছে, বিদ্যুত্ বিপর্যয়ের কারণে রাজধানীর অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে দুপুরের পরপরই ছুটি ঘোষণা করা হয়। রাত ৯টার পর কর্মব্যস্ত শহর হঠাত্ পাল্টে যায়। রাজপথে মানুষের আনাগোনা কমে যায়। বাধ্য হয়ে যাদের বাইরে থাকতে হয়েছে তারা ছাড়া অন্যদের খুব একটা দেখা যায়নি সড়ক ও যানবাহনগুলোতে। সন্ধ্যার পর জমে ওঠেনি রাজধানীর বিপণী বিতানগুলো। অন্ধকারের গলি-ঘুপচি হয়ে ওঠে আরো অনিরাপদ। রিকশায় রিকশায় টক্কর লেগেছে প্রায় প্রতিটি গলিতেই। বেশ কয়েকটি ছিনতাইয়ের ঘটনাও ঘটেছে।
জাতীয় গ্রীডে বিদ্যুত্ বিপর্যয়ের ফলে রাজধানীর সকল এলাকায় বিশেষ করে মতিঝিল, কাকরাইল, উত্তরা, ধানমন্ডি, শাহবাগ, এলিফ্যান্ট রোড, হাতিরপুল, কারওয়ান বাজার, সেগুনবাগিচা, ফকিরাপুল, পুরানা পল্টনসহ বিভিন্ন এলাকায় রাত ১০ টা পর্যন্ত বিদ্যুত্ আসেনি।
সন্ধ্যার পরপরই রাজধানীর জুয়েলারী দোকানগুলোতে বেচাকেনা বন্ধ হয়ে যায়। অজানা আতঙ্কে নিজেরাই দোকানগুলোতে পাহারা দেবার ব্যবস্থা করে। বিপনী বিতানগুলোও নিরাপত্তার স্বার্থে নিজ দায়িত্বে বেচাকেনা বন্ধ করে দেয়। এদিকে দিনভর সিএনজি স্টেশনগুলোতে বিদ্যুত্ না থাকায় পাম্পগুলোর সামনে প্রাইভেটকারের দীর্ঘ লাইন তৈরী হয়। একারণে কোন কোন সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে পড়ে। অপরদিকে ব্যাংকিং ব্যবস্থা মুখ থুবড়ে পড়ে। বিদ্যুত্ না থাকায় রাজধানী সকল এটিএম বুথ অচল হয়ে পড়ে। এসব বুথ পাহারা দিতে বিশেষ নজরদারীর ব্যবস্থা করে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো। এর বাইরে ব্যাংকের ভোল্ট এর নিরাপত্তার জন্য ব্যাংকগুলো তাদের নিজস্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরো জোরদার করে।
বড় ধরনের এই বিপর্যয়ের কারণে নাগরিক সেবা ব্যবস্থায় তৈরি হয় নাজুক পরিস্থিতির। রাজধানীর অধিকাংশ এলাকায় ওয়াসার পানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। নাগরিক জীবনের নিত্যপ্রয়োজনীয় গৃহস্থালীর কাজ নিয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েন নগরবাসী। নভেম্বর মাসে প্রতিটি স্কুলে বার্ষিক পরীক্ষা থাকায় বিপাকে পড়ে শিক্ষার্থীরা। ঘরে আলোর ব্যবস্থা করতে মোমবাতি কেনার জন্য নগরবাসী স্থানীয় মুদিখানায় ভিড় করেন। মজুদ না থানায় অল্প সময়ের মধ্যে দোকানগুলোর মোমবাতি শেষ হয়ে যায়। রাতে সড়কগুলোতে আলো না থাকায় গাড়ির আলোর ওপর ভরসা করে চলাচল করতে হয় পথচারীদের।
এদিকে বিকাল থেকেই রাজধানীর জরুরি সেবাগুলো বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে পড়ে। বিশেষ করে হাসপাতালগুলোতে জেনারেটরের মাধ্যমে অপারেশনের ব্যবস্থা সচল রাখলেও সন্ধ্যার পর ওয়ার্ডগুলোতে অন্ধকার নেমে আসে। এছাড়া রাজধানীর অধিকাংশ এলকায় ইন্টারনেট, স্যাটেলাইট সেবাও বিকল হয়ে পড়ে। সাময়িক সময়ের জন্য এসব প্রতিষ্ঠানের সেবা বন্ধ রাখা হয়।
রাত সাড়ে ৯ টার দিকে রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র মতিঝিলের চিত্র ছিল একেবারেই ভিন্ন রকম। সড়কে কয়েকটি রিকশা, দু-চারটি বাস-গাড়ি ও অল্প কিছু পথচারী দেখা গেছে। রাতে শুধু মতিঝিল নয়, পুরো রাজধানী জুড়েই নীরবতা নেমে আসে। এই সময়ে ঢাকার এই রূপ যেন অবিশ্বাস্য। কারণ বছরে দুই ঈদের ছুটি ছাড়া রাজধানীতে এমন দৃশ্যের দেখা পাওয়া দুষ্কর।
তবে আলোবিহীন রাস্তাঘাট নগরবাসীর জন্য আতংকের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। রাতে গুলশান ও রামপুরা এলাকায় ছিনতাইয়ের শিকার হয়ে বেশ কয়েকজন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন। এদের মধ্যে গাড়ি ব্যবসায়ী আব্দুর রশিদ (৪৫) গুলশান আযাদ মসদের সামনে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে ছিনতাইকারীর হামলার শিকার হন। এসময় চারজন ছিনতাইকারী তাকে উপুর্যুপরি আঘাত করে এক লাখ ৩২ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেয়। অপরদিকে চাকরীজীবি আনিসুর রহমান স্বপন গুলশান থেকে রামপুরার বনশ্রীর বাসায় ফেরার পথে সন্ধ্যা ৬ টার দিকে বনশ্রী রোডে ছিনতাইয়ের শিকার হোন। এসময় ছিনতাইকারীরা তার পেটে ছুরিকাঘাত করে মানিব্যাগ ও মোবাইল ছিনিয়ে নেয় বলে জানা গেছে।
পানির জন্য হাহাকার
জাতীয় বিদ্যুত্ গ্রিডে কারিগরি ত্রুটি দেখা দেয়ায় পুরো রাজধানী জুড়ে গতকাল পানি সংকট দেখা দেয়। ঢাকা ওয়াসার নিজস্ব জেনারেটরগুলো একটানা পাওয়ার সাপ্লাইয়ে ব্যর্থ হচ্ছে। তাই ভূগর্ভস্থ পানিও উত্তোলন করা যায়নি। ফলে ওয়াসার পানিবাহী গাড়িগুলো দিয়েও পানি সরবরাহ করতে পারেনি। নগদ টাকা দিয়েও এক গাড়ি পানি যোগাড় করা সম্ভব হয়নি।
রাজধানীর মতিঝিল, মগবাজার, গুলিস্তান, কাকরাইল, আজিমপুর, চানখারপুল, লালবাগ, স্বামীবাগ, মুগদা, গোড়ান, টিকাটুলী, বেচারাম দেওড়ি, মিটফোর্ড, আরমানিটোলা, ইসলামপুর, ঝিগাতলা, মিরপুর, মোহাম্মদপুর, চকবাজার, পোস্তগোলা, শ্যামপুরসহ রাজধানীর সর্বত্র এই সংকট ছড়িয়ে পড়ে।
ঢাকা ওয়াসা সূত্র বলছে, বিদ্যুত্ সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে পানি সরবরাহ সম্ভব নয়। এতে করে ঢাকা জুড়ে পানির জন্য হাহাকার পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বাসাবাড়িতে পানি না থাকায় বাধ্য হয়ে অনেকেই রাস্তায় নেমেছেন এক বালতি পানির আশায়। কিন্তু পথের ধারের কল থেকেও পানি সংগ্রহ করা যায়নি।
ধানমন্ডির ঝিগাতলা এলাকার বাসিন্দা জুনায়েদ আহাম্মেদ ইত্তেফাককে বলেন, গতকাল দুপুর থেকে ওয়াসার লাইনে পানি পাওয়া যাচ্ছে না। এলাকায় পানি সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। আরেক ভুক্তভোগী মাহাবুবুর রহমান বলেন, সেনপাড়া-পর্বতা এলাকার কর্ণফুলী গলির ঘরে ঘরে এখন পানির জন্য হাহাকার।
ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী তাকসিম এ খান ইত্তেফাককে বলেন, গতকাল দুপুর থেকে ওয়াসার পানি সরবরাহে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়। ফলে রাজধানীর অনেক স্থানে পানির সরবরাহ ব্যাহত হয়। তবে তিনি আশ্বস্ত করে বলেন, বিদ্যুত্ সরবরাহ স্বাভাবিক হলেই পানি সংকট দুর হবে।
