বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ তনয়া শারমিন আহমদ রিতি বলেন, `নূরুল হক হয়তো বঙ্গবন্ধুর হয়ে রেডিওতে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন'। জেলহত্যা দিবসের আগে কানাডায় এসে আবারও রিতি বিতর্কের ঝড় তুললেন। মন্ট্রিয়েল এবং টরন্টোতে তার বিতর্কিত বইয়ের "তাজউদ্দিন আহমেদ- নেতা ও পিতা" গ্রন্থের আলোচনার পর স্থানীয় সাপ্তাহিক বাংলা মেইলের সঙ্গে সাক্ষাতকারে রিতি আরো বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান (মুজিব কাকু) স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করতে চাননি। দেশদ্রোহিতার জন্য পাকিস্তান সরকার তাঁর বিচার করতে পারে এমন আশংকায় তিনি ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর থেকে বিরত থাকেন। রিতি সেই পুরনো সুত্র ধরে বলেন, পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী ২৫ মার্চ ভয়াল কালো রাতে আব্বু গেলেন মুজিব কাকুকে আনতে। মুজিব কাকু আব্বুর সঙ্গে আন্ডারগ্রাউন্ডে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করবেন। সে ব্যাপারে আব্বু মুজিব কাকুর সঙ্গে আলোচনা করেছিলেন। মুজিব কাকু সে ব্যাপারে সম্মতিও দিয়েছিলেন। আর সে মোতাবেক স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র এবং টেপ রেকর্ডার নিয়ে আব্বু হাজির হন মুজিব কাকুর বাড়িতে। কিন্তু টেপে বিবৃতি দিতে বা স্বাধীনতার ঘোষণায় স্বাক্ষর প্রদানে মুজিব কাকু অস্বীকৃতি জানান। কথা ছিলো, মুজিব কাকুর স্বাক্ষরকৃত স্বাধীনতার ঘোষণা ইন্টারকন্টিনেন্টালে (বর্তমানে রূপসী বাংলা) অবস্থিত বিদেশী সাংবাদিকদের কাছে পৌঁছে দেয়া হবে। আব্বু বলেছিলেন, ‘মুজিব ভাই, এটা আপনাকে বলে যেতেই হবে, কারণ আমাদের সবাইকে যদি গ্রেফতার করে নিয়ে যায়, তাহলে কেউ জানবে না, কি তাঁদের করতে হবে।’ মুজিব কাকু তখন উত্তর দিয়েছিলেন, ‘এটা আমার বিরুদ্ধে দলিল হয়ে থাকবে। আর এক্ষেত্রে পাকিস্তানিরা আমাকে দেশদ্রোহের জন্য বিচার করতে পারে।’ সাক্ষাতকারে তিনি আরো বলেন, আব্বুর লেখা ঐ স্বাধীনতা ঘোষণাপত্রের প্রায় হুবহ কপি পরদিন গার্ডিয়ান, নিউইয়র্ক টাইমসসহ আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় প্রচারিত হয়। ধারণা করা হয় ঘোষণাটি আব্বু তাঁর আস্থাভাজন কোনো ছাত্রকে দেখিয়ে থাকতে পারেন। স্বাধীনতার সমর্থক সেই ছাত্র হয়তো স্ব উদ্যোগে বা আব্বুর নির্দেশেই স্বাধীনতার ঘোষণাটিকে বহির্বিশ্বের মিডিয়াতে পৌঁছে দেন। তিনি বলেন, ২৫ মার্চ রাত ৯ টার ঘটনা। কিন্তু রাত ১২ টার পর মুজিব কাকু অন্যভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। বিভিন্ন তথ্য ও সূত্র থেকে জেনেছি মুজিব কাকুর মতো ভরাট গলার অধিকারী ইঞ্জিনিয়ার নূরুল হক হয়তো বঙ্গবন্ধুর হয়ে রেডিওতে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। তাহলে স্বাধীনতার প্রথম ঘোষক কে? কেউ বলেন চট্টগ্রামের এম এ হান্নান, বিএনপি বলে জিয়াউর রহমান, বেলাল মোহাম্মদের কালুঘাট স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে আবুল কাশেম। আপনার মতে সঠিক তথ্য কোনটি? বিএনপি কেনো বলে জানিনা। জিয়াউর রহমান বেঁচে থাকতে তো কখনো এমন দাবি শুনি নাই। আসলে আমার মতে, দেশ স্বাধীনের ইতিহাস যদি সত্যিকারভাবে তুলে ধরা হতো তাহলে বিএনপি এ দাবিটা করার সুযোগই পেতো না। কারণ, এটা সত্যি বঙ্গবন্ধু ছিলেন স্বাধীনতার প্রেরণা আর আমার আব্বু তাজউদ্দিন আহমদ ছিলেন তার বাস্তবায়ক। দু’জনায় ছিলেন একে অপরের পরিপূরক। মুজিব কাকুকে বাদ দিয়ে যেমন স্বাধীনতার ইতিহাস রচনা সম্ভব নয়, তেমনি আমার আব্বুকেও ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে ফেলা সম্ভব নয়। সম্ভব নয় জাতীয় চার নেতাকে বাদ দিয়ে স্বাধীনতার ইতিহাস লেখা। অস্বীকার করার সুযোগ নেই জেনারেল ওসমানীর অবদানকেও। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতিতে ব্যক্তি স্বার্থটা এতো প্রকট যে সমষ্টিগত অবদানকে অস্বীকার করে শুধু একজনকেই স্বাধীনতার অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে ইতিহাসে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, মেজর জিয়া ছিলেন একজন সেক্টর কমান্ডার। মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অবদানকে অস্বীকার করার জো নেই, কিন্তু তিনি তো আব্বু বা মুজিব কাকুর মতো রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না। ছিলেন একজন সৈনিক, যিনি মুক্তিযুদ্ধ করেছেন। তিনি আরেক প্রশ্নের জবাবে বলেন, আসলে বই লেখার হয়তো প্রয়োজন হতো না। যদি দেখতাম স্বাধীনতা যুদ্ধে আমার আব্বুর অবদানকে ইতিহাসে মূল্যায়ন করা হয়েছে। কিন্তু না, স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসে কোথাও তো দেখিনা আব্বুর নাম। দেখিনা চার জাতীয় নেতার নাম। এমনকি এখনকার প্রজন্মের সিংহভাগই জানে না, আমার আব্বু ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী। তাই নতুন প্রজন্মকে সঠিক ইতিহাস জানাতেই আমার এই বই প্রকাশের উদ্যোগ। তার ভাই সোহেল তাজ এমপি, মন্ত্রী হয়েও পদত্যাগ করলেন। এ প্রসঙ্গ রিতি বলেন, আপনারা সবাই জানেন, সোহেল তাজ দীর্ঘদিন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছে। বাংলাদেশের রাজনীতির ঘরানায় সে ছিলো নতুন। এতো বছর বিদেশে থেকে বাংলাদেশের মতো দেশের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হওয়া কঠিন। সে পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলো। বলেছিলো, তাঁর কাছে মন্ত্রীত্বের চেয়ে আত্মসম্মানবোধ অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ। নিশ্চয়ই এমন কোনো পরিস্থিতি তাঁকে ঘিরে তৈরী হয় যে, সে পদত্যাগে বাধ্য হয়েছিলো।
রিতিকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, তাজ পদত্যাগ করে আপনার বাবার মতোই আপোষহীন ইমেজ সৃষ্টি করেছিলো। তাহলে পরবর্তীতে বোন সিমিন তাজ সংসদ সদস্যা হবার জন্য রাজী হলেন কেনো? এ প্রশ্নের জবাবে বলেন, আওয়ামী লীগের প্রয়োজনেই সিমিনকে নমিনেশন দেয়া হয়েছে। আমাদের তিন বোনকে এমপি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য উপর্যুপরি আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিলো। সাজেদা চৌধুরী, মতিয়া চৌধুরীরা লেগেই ছিলেন। আমাদের বাড়ীতে গিয়ে আমার মা জোহরা তাজউদ্দিনকেও খোদ প্রধানমন্ত্রী অনুরোধ করেছেন। আর আপনারা জানেন আমার মা আওয়ামী লীগের অসময়ের কান্ডারীর ভূমিকায় ছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন ব্যক্তির চেয়ে দল বড়। আর তাই রাজী হয়েছিলেন সিমিনের নমিনেশনের ব্যাপারে।
