হাতির দাঁতের হাত পাখা, মৃৎশিল্প আর পুতুল দেখে বিমোহিত আফসারা নূর। পুরান দিনের ইতিহাস, ঐতিহ্য দেখতে তার অনেক ভালো লাগে বলে জানান। নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী আফসারা জাদুঘর দেখছিলেন বাবার হাত ধরে। সিলেটের হবিগঞ্জ থেকে এসেছেন তারা। আফসারা বলেন, সময়ের অভাবে সবকিছু খুঁটিয়ে দেখতে পারলাম না। তবে খুব ইচ্ছে করছে সময় নিয়ে দেখতে।
বাবা আমজাদ হোসেন বলেন, আজই ফিরে যেতে হবে সিলেটে যার কারণে তাড়াটা একটু বেশি। জাদুঘরে দেখার অনেক কিছু আছে, এরপরে সময় করে মেয়েকে নিয়ে আসবেন বলে জানান তিনি। ঢাকা শহরের প্রাণকেন্দ্র শাহবাগ মোড়ে চোখে পড়বে লাল বিল্ডিংয়ের চারতলা ভবন। এটিই জাতীয় জাদুঘর। সেখানে রয়েছে, বিভিন্ন ক্যাটাগরির সাতটি বিভাগ, ৪৪টি গ্যালারি, ২টি অডিটরিয়াম ও একটি চলচ্চিত্র প্রদর্শনের জন্য ‘হল’। বিভাগগুলোর মধ্যে রয়েছে—ইতিহাস ও ধ্রুপদী শিল্পকলা বিভাগ, জাতিতত্ত্ব ও অলঙ্করণ শিল্পকলা বিভাগ, সমকালীন শিল্পকলা ও বিশ্বসভ্যতা বিভাগ, প্রাকৃতিক ইতিহাস বিভাগ, সংরক্ষণ রসায়নাগার বিভাগ, প্রশাসন, অর্থ ও নিরাপত্তা বিভাগ।
আড়াই হাজার বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে তুলে ধরার ক্ষেত্রে অনন্য ভূমিকা পালন করে চলছে জাতীয় জাদুঘর। প্রাচীন বাংলার ঐতিহ্য তথা হিন্দু, বৌদ্ধ ও মুসলমানসহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক উপাদান, প্রত্ননির্দশন ও ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধের গৌরবোজ্জ্বল নির্দশন এ জাদুঘরের প্রদর্শনীর মূল আর্কষণ। ।
সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের অধীনে জাতীয় জাদুঘর এদেশের ইতিহাস, সাংস্কৃতিক ও প্রাকৃতিক ঐতিহ্যের নিদের্শনাদি সংগ্রহ, সংরক্ষণ, প্রদর্শণ ও এ সংক্রান্ত গবেষণায় নিয়োজিত একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠান। ১৯৮৩ সালের ১৭ নভেম্বর জাতীয় জাদুঘরের যাত্রা শুরু হয়। ১৯১৩ সালের ৭ আগস্ট বাংলার গর্ভনর লর্ড কারমাইকেল তত্কালীন সচিবালয়ের একটি কক্ষে ‘ঢাকা জাদুঘরের’ আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। তখন ৩৭৯টি নিদর্শনসহ জাদুঘরটি দর্শকদের জন্য খুলে দেয়া হয় ২৫ আগস্ট ১৯১৪ সালে।
জাতীয় জাদুঘরের নিবার্হী কর্মকর্তা সৈয়দ শামসুল করিম ইত্তেফাককে বলেন, আমাদের এক লাখ নিদর্শন সংরক্ষণ আছে। প্রতিদিন বাড়ছে এই সংগ্রহশালা। কিন্তু আমরা প্রদর্শন করতে পারছি মাত্র ১০ হাজার নির্দশন। যার কারণে প্রতিনয়ত জাদুঘরের নিদর্শন বদলে হচ্ছে। সেদিক থেকে জাদুঘর প্রতিদিনই নতুন রুপে সাজে। জাদুঘরটি ২০তলা ভবন নির্মানের প্রস্তাবনা রয়েছে। ২০তলা ভবন তৈরি হলে হয়তো নিদর্শন প্রদর্শনের সংকট আর থাকবেনা।
ঐতিহাসিক নিদর্শনের মধ্যে রয়েছে— প্রস্তর ও ধাতুর ভাস্কর্য, পোড়ামাটির ফলক, প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় মুদ্রা, শিলালিপি, তুলট কাগজ, তাল পাতায় লেখা সংস্কৃত, বাংলা, আরবি-ফার্সি পান্ডুলিপি, মধ্যযুগীয় অস্ত্রশস্ত্র, বাংলাদেশের কারুশিল্প এবং বিশ্বসভ্যতার নিদর্শন। এ ছাড়া রয়েছে—বাংলাদেশের গাছপালা, পশুপাখি, শিলা, খনিজ প্রভৃতি। প্রাকৃতিক নিদর্শন জাদুঘরের সংগ্রহে বা প্রদর্শণীতে আছে। প্রায় ৮৬ হাজার নিদর্শন সমৃদ্ধ বাংলাদেশের জাতীয় জাদুঘর দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহত্ জাদুঘর।
সময়সূচিঃ শীতকালে অক্টোবর থেকে মার্চ মাস পর্যন্তু শনি থেকে বুধবার পর্যন্ত সকাল সাড়ে ৯টা থেকে বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত দর্শনার্থীরা পরিদর্শন করতে পারবেন। শুক্রবার বেলা আড়াইটা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা পর্যন্ত খোলা থাকে। গ্রীষ্মকালীন এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর শনিবার থেকে বুধবার পর্যন্ত সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বিকাল সাড়ে ৫টা। শুক্রবার বিকাল ৩টি থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত।
বৃহস্পতিবার সাপ্তাহিক ছুটি ও অন্যান্য সরকারি ছুটির দিনে জাদুঘর বন্ধ থাকে। প্রবেশ মূল্য সার্কভূক্ত দেশের ১২ বছরের নিচে শিশুদের জন্য ২টাকা, বাংলাদেশসহ সার্কভূক্ত দেশের ১২ বছর থেকে উপরে ১০ টাকা, অন্যান্য বিদেশি নাগরিকদের জন্য ১০০টাকা। তবে প্রতিবন্ধী দর্শনার্থীদের জন্যে কোন প্রবেশমূূল্য লাগবে না। হুইল চেয়ারের মাধ্যমে প্রতিবন্ধী দর্শকদের সেবা প্রদান করা হয় ।
