সারি সারি ঘর। ঘরে যাবার জন্য আছে সরু গলি। সেই গলিতে দুইজন মানুষ পাশাপাশি হাঁটা যায় না। গলির দু’ধারে সারি সারি ঘর। হাড়ি-পাতিল, বিছানা, কাপড়-চোপড়, খাটের নীচে নানান জিনিস। কোন মতে মাথা গোঁজার ঠাঁই।
রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশানে করাইল বস্তি যেন প্রদীপের নীচে অন্ধকার। উঁচু উচুঁ ভবনের কাচ ঘেরা জানালা থেকে দেখতে খুব মনোহর মনে হয়। নৌকায় করে বস্তির বাসিন্দারা যাওয়া আসা করছে। গ্রাম-বাংলার চির পরিচিত দৃশ্য। কিন্তু বস্তির ভেতরে ঢুকলে সেই রোমান্টিক চিন্তা হাওয়ায় মিলায়।
গুলশান লেকের কয়েক কিলোমিটার জুড়ে গড়ে উঠেছে এই বস্তি। মহাখালি টিএন্ডটি কলোনির পাশে লেক ঘেঁষে যে বস্তি গড়ে উঠতে শুরু করেছিল তা এখন মহাখালী- গুলশান -১ এর মূল সড়ক ছুঁই ছুঁই করছে। ব্র্যাক এর হেড অফিসের উল্টোদিকের লেক দিয়ে নৌকায় যাওয়া-আসা করে এখানকার বাসিন্দারা।
এটা ঠিক যে, গুলশান লেক দখল করে যে বস্তি গড়ে উঠেছে তা লেকের ক্ষতি করেছে। ক্ষতি করেছে পরিবেশের। পাশাপাশি এটাও বাস্তবতা যে, রাজধানীমুখী গৃহহীন মানুষের ঢল এসে আশ্রয় খোঁজে এইসব বস্তিতেই। ধীরে ধীরে এই রাজধানী তাদের বুকে ধারণ করে। তাদের জীবন-জীবিকা চলে এই রাজধানীকে অবলম্বন করেই। তারা এই দেশেরই মানুষ। পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করে এদের উচ্ছেদ করাটাও চরম অমানবিক আচরণ।
করাইল বস্তির বাজারের পাশে মসজিদ মার্কেটের দোকানি ইউনুস জানালেন ২০ বছর ধরে এই বস্তিতে বাস করছেন তিনি। বললেন, উচ্ছেদের ভয় এখন আর নেই। দুই বছর আগে সরকার উচ্ছেদ করেছিল। কিন্তু আমাদের আন্দোলনের মুখে সে পথ থেকে সরে আসে প্রশাসন। এখন আমরা শান্তিতেই আছি।
নৌকার ঘাটে কথা হয় তিতুমীর কলেজের ব্যবস্থাপনায় অনার্সের শিক্ষার্থী লিজার সঙ্গে। তিনি জানালেন, তার বাবা-মা দুজনেই গার্মেন্টসে চাকরি করেন। কিন্তু তারা দুই ভাই বোন লেখাপড়া করছেন। পটুয়াখালী থেকে নদী ভাঙনের শিকার হয়ে তাদের পরিবার ২০ বছর আগে এসেছিল ঢাকায়। এখন তারা ভাল আছেন।
বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই এখানকার জীবনযাত্রা। গৃহহীন মানুষ মাথার ঠাঁই খুঁজে নিতে যেখানে বসবাস শুরু করেছিল, জীবনের প্রয়োজনে সেই বস্তিতেই এখন কয়েক লাখ মানুষের বাস। গড়ে উঠেছে স্কুল, মসজিদ। রয়েছে বাজার। এমনকি দীর্ঘদিন বাস করতে করতে অনেকে এখানকার জায়গার মালিক বনে গেছেন। সেই জায়গায় টিনের বাড়ি বানিয়ে ভাড়া দেন রীতিমত। এই বস্তিতে প্রতি রুমের ভাড়া ২ থেকে ৩ হাজার টাকা। অবশ্য ওয়াসার পানি আছে, আছে গ্যাসের লাইনও। বিদ্যুত্ সংযোগও পাবেন।
লেক দখল করে গড়ে ওঠা এই করাইল বস্তি উচ্ছেদের জন্য অনেক চেষ্টা হলেও এখন আর সে ধরনের কোন অভিযান চোখে পড়ে না। বরং বৈধ ওয়াসার লাইন পেয়েছে বস্তিবাসী। অবৈধ হলেও বিদ্যুত্ লাইন আছে। আছে অবৈধ গ্যাস লাইনও। বস্তিবাসীরাই নিজেদের টাকায় ঢালাই রাস্তা তৈরি করে নিয়েছেন। সরু সেই রাস্তায় দু’জন মানুষ পাশাপাশি চলা যায় কোনমতে।
গৃহহীন মানুষদের কাছে এই বস্তি যেমন মাথা গোঁজার ঠাঁই, তেমনি সেই অসহায় মানুষদের জিম্মি করে এই বস্তিতে চলে মাদক ব্যবসা। চলে অস্ত্র কেনাবেচা। ঘিঞ্জি পথ-ঘাট বেওয়ারিশ বাড়ি-ঘরের কারণে অপরাধীদের জন্য এই বস্তি যেন স্বর্গরাজ্য।
কিন্তু বাসিন্দারা সে কথা মানতে নারাজ। গুলশানের একটি রেস্টুরেন্টে বসে আলাপচারিতায় চাকরিজীবী মোখলেসুর রহমান বললেন, বস্তিতে চাঁদাবাজি, মাস্তানি, মাদক ব্যবসা এখন আর নেই। কয়েক বছর আগে এসবের দৌরাত্ম্য ছিল। সেসব এখন একেবারেই কমে এসেছে। বস্তিবাসীরাই এসব প্রতিরোধ করে।
