রাজধানীতে চলছে অবৈধ বিদেশি নাগরিক শনাক্তকরণ অভিযান। অভিযানের প্রথম দিন বৃহস্পতিবার রাতে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ নগরীর তিনটি এলাকা থেকে গ্রেফতার করে ৩১ জনকে। তারা হলেন- নাইজেরিয়ার ১১ জন, উগান্ডার ৫ জন, কেনিয়ার ১ জন, ক্যামেরুনের ৫ জন, আইভোরিকোস্টের ২ জন, টোগোর ১ জন, মালির ১ জন, মোজাম্বিকের ১জন, গাম্বিয়ার ৩ জন ও সেনেগালের ১ জন। এদের মধ্যে উগান্ডার ২ জনের কাছ থেকে মেয়াদ উত্তীর্ণ দুটি পাসপোর্ট উদ্ধার করা হয়। বাকিদের কাছে বাংলাদেশে অবস্থানের পক্ষে কোন বৈধ কাগজপত্র পাওয়া যায়নি। তাদের বিরুদ্ধে উত্তরা পশ্চিম, রামপুরা ও গুলশান থানায় অবৈধভাবে বাংলাদেশে বসবাসের অভিযোগে মামলা হয়েছে। গতকাল শুক্রবার তাদেরকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপ-কমিশনার শেখ নাজমুল আলম জানান, বিভিন্ন সময় কোকেন, জাল ডলার বাংলাদেশে পাচারসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত অভিযোগে বেশ কয়েকজন দক্ষিণ আফ্রিকান, ক্যামেরুন, নাইজেরিয়ানকে পুলিশ গ্রেফতার করে। যাদের সিংহভাই বাংলাদেশে অবৈধ ভাবে বসবাস করছিল। বিষয়টি নিয়ে সে সময় খুব একটা গুরুত্ব দেয়া হয়নি। কিন্ত সর্বশেষ রাজধানীর উত্তরায় চার নম্বর সেক্টরে গত ৫ সেপ্টেম্বর এক আলজেরিয় নাগরিকের হাতে মর্মান্তিকভাবে নিহত হয় ইংলিশ মিডিয়ামের ছাত্র জুবায়ের আহমেদের (১৭)। এ ঘটনা তদন্তে গিয়ে বেরিয়ে আশে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে রাজধানীর রামপুরা, বনশ্রী, গুলশান ও উত্তরায় কয়েকটি দেশের নাগরিকদের বাসা শনাক্ত করা হয়। এরপর বৃহস্পতিবার রাতে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের ৪০টি টিম একযোগে এসব এলাকায় অভিযান শুরু করে। রাত দশটা থেকে ভোর চারটা পর্যন্ত এ অভিযানে প্রায় ৪শ’ বিদেশি নাগরিকের কাগজপত্র পরীক্ষা করা হয়। এদের মধ্যে ৩১ জনের কাছে বৈধ কাগজপত্র না থাকায় তাদেরকে গ্রেফতার করে থানায় সোপর্দ করা হয়। তিনি বলেন, এ অভিযান অব্যাহত থাকবে।
ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে গতকাল শুক্রবার সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপ-কমিশনার (দক্ষিণ) কৃষ্ণপদ রায় জানান, এসব বিদেশি নাগরিক বিভিন্ন পরিচয়ে যেমন-ছাত্র, ব্যবসায়ী, খেলোয়াড় ইত্যাদি পরিচয়ে ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে বসবাস করে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে রয়েছেন। তিনি ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকায় সম্মানিত নাগরিকবৃন্দকে বৈধ কাগজপত্র ব্যতীত কোন বিদেশি নাগরিককে বাসা ভাড়া না দেয়ার জন্য অনুরোধ জানান।
উত্তরা পশ্চিম থানার অফিসার ইন-চার্জ রফিকুল ইসলাম জানান, গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে ডিবি পুলিশ ১৫ জনকে থানায় সোর্পদ করে। এদের মধ্যে দু’জনের কাছে পাসপোর্ট ছিল। তবে তাদের কোন ধরনের ভিসা নেই। অপর ১৩ জনের কাছে কোন পাসপোর্ট নেই। তিনি জানান, গ্রেফতারকৃতদের অনেকে জানিয়েছে, তারা ভারত থেকে দালালদের মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। রামপুরা থানা অফিসার ইনচার্জ মাহবুব হোসেন জানান, তার থানায় সোর্পদ করা হয়েছে ১২ জনকে। এদেরকে বনশ্রী এলাকার ‘বি’ এবং ‘ই’ ব্লক থেকে গ্রেফতার করে ডিবি। তবে এদের কারো কাছেই কোন বৈধ কাগজপত্র নেই। গুলশান থানার অফিসার ইনচার্জ রফিকুল ইসলাম জানান, গুলশান থানায় সোর্পদ করা হয়েছে ৪ জনকে। এর মধ্যে তিনজন উগান্ডার ও একজন কেনিয়ার। তাদের কাছে কোন বৈধ কাগজপত্র ছিল না।
র্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল জিয়াউল আহসান জানান, গত কয়েক বছরে র্যাব বিভিন্ন অপরাধের জড়িত আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের ৯১ জন নাগরিককে গ্রেফতার করেছে। গ্রেফতারকৃতদের বেশিরভাগই জঙ্গি, মাদক, জাল মুদ্রা তৈরি ও মানব পাচারে জড়িত। এরা দেশে ঢুকেই তাদের পাসপোর্ট ফেলে দেয়। ঢাকায় ঐসব দেশের দূতাবাস না থাকায় তাদের নিজ নিজ দেশে পুশব্যাকও করা যায় না। পোশাক শিল্প, বায়িং হাউস, আইটি ও টেলিকম সেক্টর, বিজ্ঞাপনী সংস্থা, রেস্টুরেন্ট এবং এনজিওসহ নানা প্রতিষ্ঠানের ঢাল ব্যবহার করে তারা অপরাধ করে থাকে।
পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি) থেকে থেকে জানা যায়, দেশে বৈধ ও অবৈধ বিদেশি নাগরিকের সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার। এদের মধ্যে আফ্রিকা মহাদেশের ১৫ হাজার বৈধ ও অবৈধ নাগরিক দেশে অবস্থান করছে। কঙ্গো, ঘানা, নাইজেরিয়া, আলজেরিয়া, আইভরিকোষ্ট, সিয়েরালিওন, সেনেগাল, ক্যামেরুন, ইথিওপিয়া ও লাইবেরিয়া থেকে আগত প্রায় ৮ হাজার নাগরিকের ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। গত ৫ বছর ধরে এসব নাগরিক বিভিন্ন সময়ে দেশে এসে আর ফিরে যায়নি। এরাই বিভিন্ন সময়ে ঢাকায় ভিনদেশির আড়ালে অপরাধ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।