আফগানিস্তানে শান্তি কতদূর?

আপডেট : ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ২১:৩৯

আফগান জনগণের শান্তির আকাঙ্ক্ষা জোরদার হয়েছে। দীর্ঘায়িত মার্কিন দখলে জনগণের মাঝে ক্ষোভ বিরাজ করছে। অপরদিকে বিজয়হীন যুদ্ধে হতাশ খোদ পেন্টাগন। সাম্প্রতিক সময়ের বিভিন্ন উদ্যোগ থেকে বোঝা যাচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান থেকে একটি সম্মানজনক প্রত্যাহার কামনা করে। যুদ্ধরত বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী বিশেষত তালেবানরা ক্লান্ত-শ্রান্ত ও অবসন্ন। তারাও চায় যতশীঘ্র সম্ভব সেখানে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হোক। সে লক্ষ্যে দুটো সমান্তরাল শান্তি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। একটি দোহাভিত্তিক, অপরটির কেন্দ্র হচ্ছে মস্কো। অভিন্ন লক্ষ্যে উভয় বৈঠকই আলাপ-আলোচনা অব্যাহত রেখেছে। শান্তি প্রক্রিয়ায় মার্কিন প্রতিনিধি আফগান বংশোদ্ভূত জালমে খলিলজাদ গতমাসে দোহায় তালেবানদের সঙ্গে বেশ কয়েকবার নিবিড় বৈঠকে মিলিত হন। অপরদিকে এ মাসের ৫ ও ৬ তারিখে মস্কোতে তালেবান এবং যুদ্ধরত অন্যান্য গোষ্ঠীগুলো অপর এক বৈঠকে অংশগ্রহণ করেন। তবে ক্ষমতাসীন কাবুল সরকার উভয় শান্তি প্রক্রিয়ার প্রতি নাখোশ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সার্বিক প্রত্যাহারের ব্যাপারেও আফগান প্রতিপক্ষ সন্দিহান। তার কারণ সাবেক প্রেসিডেন্ট ওবামা সকল মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের যে সময়সীমা দিয়েছিলেন তা অনেক আগেই অতিক্রান্ত হয়েছে। বরং পরবর্তী প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আফগানিস্তানে নতুন করে সেনা সমাবেশ ঘটিয়েছেন। এখন তিনি মার্কিন স্বার্থ ও সম্মান বজায় রেখে ক্রমশ সেনা প্রত্যাহারের কথা ভাবছেন। এই প্রেসিডেন্টের অস্থিরতার কথা সুবিদিত। কোনো কোনো রণকৌশলী রুশ, ইরান ও পাকিস্তান— এই ত্রিপক্ষীয় ভূ-রাজনীতির কারণে আফগানিস্তানে কোনো না কোনোভাবে চিরস্থায়ী মার্কিন অবস্থানের আশঙ্কা করছেন। তাহলে শান্তি প্রক্রিয়ার তাত্পর্য কী? ভূ-রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞগণ বলছেন, কুশলী কূটনীতির মাধ্যমে তারা তাদের স্বার্থ ও সুবিধে সংরক্ষণ করতে চাচ্ছে। মার্কিন পক্ষ দোহা বৈঠকে সকল পক্ষের অন্তর্বর্তীকালীন কেন্দ্রীয় সরকার প্রতিষ্ঠা করতে চাচ্ছে। পরে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে প্রতিনিধিত্বশীল সরকার দেখতে চায়। তালেবানরা চায় নিঃশর্তভাবে সকল মার্কিন ও বিদেশি সেনার প্রত্যাহার। তারা আফগানের মাটিতে কোনো মার্কিন ঘাঁটি স্থাপনেরও ঘোর বিরোধী।

অতীতের ভুল: বর্তমান শান্তি প্রক্রিয়া উভয় পক্ষের অতীত থেকে শিক্ষার ফলাফল বলে অভিহিত করা যায়। আফগান সংকটের শুরুটা সোভিয়েত দখলদারি থেকে। ১৯৭৯ সালে তত্কালীন অন্যতম পরাশক্তি এবং আফগান প্রতিবেশী সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তান দখল করে নেয়। তারা সেখানে সোভিয়েত ধরনের বামপন্থী তল্পিবাহক সরকার কায়েম করে। আফগান জনগণ দীর্ঘ এক দশক ধরে এর বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে লিপ্ত  হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই প্রতিরোধ যুদ্ধে আফগান জনগণকে সর্বাত্মক সহায়তা দেয়। ১৯৮৯ সালে সোভিয়েত বাহিনী পাততাড়ি গোটায়। ১৯৯০ সালে সৃষ্ট রাজনৈতিক শূন্যতায় এবং বিবদমান জাতিগোষ্ঠীর পারস্পরিক হানাহানির কারণে তালেবানদের উত্থান ঘটে। মোল্লা উমরের শক্ত ইসলামি অনুশাসনের প্রতিশ্রুতির কারণে আফগান জনগণের গরিষ্ঠ অংশ তালেবানদের স্বাগত জানায়। ১৯৯৬ সালে প্রেসিডেন্ট বোরহান রব্বানির সরকারকে কাবুল থেকে বিতাড়ন করে তালেবানরা। এ সময়ে আল-কায়েদা নেতা উসামা বিন লাদেন তালেবানদের সহযোগী হয়ে তালেবান সরকারকে ক্ষমতা সংহতকরণে সহায়তা করেন। পরে তিনি ২০০১ সালে ৯/১১ ঘটনার প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবে অভিযুক্ত হন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য ২০০১ সালের ৭ অক্টোবর আফগানিস্তানে হামলা শুরু করে। মাত্র কয়েকদিনের যুদ্ধে তালেবান সরকারের পতন ঘটে। কাবুল ত্যাগের আগে তালেবানরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে একটি শান্তি চুক্তির প্রয়াস চালায়। আফগানিস্তানের অভ্যন্তরীণ মার্কিন তাঁবেদার এবং তালেবানবিরোধীরা এই শান্তি প্রক্রিয়ার প্রবল বিরোধিতা করেন। জার্মানির বনে অনুষ্ঠিত একটি শান্তি বৈঠকে তাদের সঙ্গে সমঝোতা তো দূরের কথা বেঁচে থাকার অধিকারটুকুও অস্বীকার করা হয়। ৯/১১ এর দগদগে ঘা নিয়ে মার্কিন সরকারও জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে যেতে সাহসী হয়নি। এখন অনেক রক্তপাত ঘটিয়ে, আফগান ও মার্কিন জনমতকে বিষিয়ে উভয় পক্ষ শান্তি প্রক্রিয়ায় সম্মত হয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে প্রমাণ করে যে, জেদ বা প্রতিশোধ স্পৃহা অবশেষে বিজয়ী হয় না।

দোহা বৈঠক: কাতারের রাজধানী দোহায় মার্কিন ও তালেবান পক্ষের সপ্তাহব্যাপী বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ২৮ জানুয়ারি আলোচনা বৈঠকে মার্কিন প্রতিনিধি দলের নেতা জালমে খলিলজাদ বার্তা সংস্থাকে জানান যে, উভয় পক্ষ কাবুল সরকারের সঙ্গে আলোচনার পথ সুগম করতে পারে, এমন একটি চুক্তির খসড়া কাঠামো তৈরিতে সম্মত হয়েছে। এই ঘোষণা উভয় পক্ষের শান্তির সম্ভাবনা জাগিয়েছে। উল্লেখ্য যে, দোহা বৈঠকের আগেও উভয় পক্ষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অনেক আলোচনা বৈঠকে মিলিত হয়েছে কিন্তু সুফল আসেনি। দৃশ্যত এই অঞ্চলে মার্কিন স্বার্থ এবং তালেবান তথা মার্কিনবিরোধীদের ওপর অন্যায়-অত্যাচারের স্মৃতি আলোচনা বৈঠকের প্রধান প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটি বিশ্লেষণে রাজনৈতিক বিশ্লেষক সৈয়দ নাকভি দেখিয়েছেন, আফগানিস্তান ঘিরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সুদূরপ্রসারী নীলনকশা রয়েছে। এই সেদিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, ইরাকে মার্কিন বাহিনীর অবস্থান ইরানকে সামলাতে কাজে লাগবে। তিনি আরো বলেছেন, আফগানিস্তানে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করা হলেও সেখানে মার্কিন ঘাঁটির অবস্থান থাকবে। তিনি তার টুইটে উল্লেখ করেন যে, ৫ বছর আগে রাশিয়ানরা আফগানিস্তানে ৩০টি ঘাঁটির ব্যাপারে একমত ছিল। বর্তমানে আফগানিস্তানের গুরুত্বপূর্ণ শহর ও জনপদে মার্কিন ঘাঁটি রয়েছে। এগুলো হচ্ছে— বাগরাম, জালালাবাদ, কান্দাহার, হেলমান্দ, হীরাত এবং মাজার-ই-শরীফ। একদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সেনা প্রত্যাহারের কথা বলছে, অপরদিকে মাজার-ই-শরীফে কনস্যুলেট সম্প্রসারণ করছে। আফগানিস্তানের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক রাষ্ট্র থেকে মার্কিন বাহিনী প্রত্যাহার বা রাজনৈতিক কর্তৃত্বের অবসান কামনা একটি সুদূরপরাহত স্বপ্ন মাত্র। ইহুদিবাদী মার্কিন থিংকট্যাংকগুলো পরামর্শ দিচ্ছে, একমাত্র মুসলিম পারমাণবিক শক্তির ওপর নজর রাখতে আফগানিস্তানে মার্কিন অবস্থান আবশ্যক। এরা আরো প্রশ্ন তুলছেন, মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহারই যদি হবে তাহলে এত জীবন ও সম্পদের অপচয় কেন করা হলো? ২০০৯ সালের ১ ডিসেম্বর ওবামা যখন সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা করেন তখন আন্তর্জাতিক রাজনীতিবিশেষজ্ঞরা মন্তব্য করেছিলেন, এটা কথার কথা মাত্র। ঘোষিত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ২০১১ সালের জুলাই মাসের মধ্যে সেনা প্রত্যাহার করার কথা থাকলেও আজও সেখানে মার্কিন সেনাবাহিনী রক্তপাতের কারণ হয়ে আছে। আসলে আফগানিস্তান ঘিরে একটি আঞ্চলিক সমীকরণও ঘটছে। ২০১৮ সালের জুলাই মাসে মার্কিন প্রতিনিধি জালমে খলিলজাদ এবং রুশ উপ-রাষ্ট্রমন্ত্রী ভ্লাদিমিরোভিক দিল্লিতে এক বৈঠকে মিলিত হয়েছিলেন। এরপর এ মাসের ৫ ও ৬ তারিখে মস্কোতে যে বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হলো তা দিল্লি বৈঠকের ফলাফল মনে করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। বিগত ১৭ বছরের আফগান সংকটে ভারত সবসময়ই সক্রিয় থেকেছে। পাকিস্তান বার বার অভিযোগ করছে যে, পাকিস্তানের অভ্যন্তরে আফগানদের পরিচালিত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে ভারতের হাত রয়েছে। আফগান শান্তি প্রক্রিয়ায় পাকিস্তান-ভারত বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন। পর্যবেক্ষক মহলের আরো মন্তব্য যে, এ ক্ষেত্রে রুশ-মার্কিন গোপন সমঝোতা প্রয়াস রয়েছে। উল্লেখ্য যে, মস্কো বৈঠকটি রুশ সরকারের তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তবে রুশ মার্কিন পাল্টাপাল্টি অভিযোগেরও ঘাটতি নেই। রুশ উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভ্লাদিমিরোভিক অভিযোগ করেছেন সিরিয়া থেকে পলায়নপর আইএস যোদ্ধারা বিমানে করে আফগানিস্তানের উত্তরে সমবেত হচ্ছে। আফগানিস্তানের আকাশসীমা মার্কিন ও কাবুল সরকারের যৌথ তত্ত্বাবধানে রয়েছে। এ কথার দ্বারা রুশ উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কিন সহায়তার ইঙ্গিত করছেন। অবশ্য তাত্ক্ষণিকভাবে মার্কিন প্রতিনিধি খলিলজাদ তাও স্বীকার করেছেন। এক্ষেত্রে ইরানের আধ্যাত্মিক নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনীর বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য। ইরানের প্রধান নেতা তার এক সাম্প্রতিক বক্তৃতায় অভিযোগ করেছেন, ‘সিরিয়া থেকে মার্কিন সহায়তায় আইএস যোদ্ধাদের আফগানিস্তানে প্রেরণের কারণ হলো, সেখানে মার্কিন অব্যাহত অবস্থানের যৌক্তিকতা প্রমাণ করা। নাকভি মন্তব্য করেন যে, ইসলামিক জঙ্গিদের লালন পালন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি আরো অভিযোগ করেন যে, ওয়াশিংটন, তেলআবিব এবং রিয়াদ তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী এদের ব্যবহার করবে। এভাবে ইসলামি যোদ্ধাদের ব্যবহার করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চীনের জিনজিয়াং বা উইঘুর, রাশিয়ার ককেশাস অঞ্চল, বৈরি ইরান এবং পারমাণবিক পাকিস্তানে হামলার কারণ সৃষ্টি করতে পারবে। আরো একটি ভয়াবহ খবর হলো, বিশ্বের সবচেয়ে বড় ভাড়াটে সৈনিক কোম্পানির প্রধান এরিক প্রিন্স আফগানিস্তানে মার্কিন সেনা উপস্থিতির বদলে তার ভাড়াটে বাহিনীর অবস্থান ও নিয়ন্ত্রণের প্রস্তাব দিয়েছে। এক অসমর্থিত খবরে প্রকাশ, মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এইচ আর ম্যাক মাস্টার এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রী জেমস ম্যাটিস এ প্রস্তাব সমর্থন করেছেন। আর এ প্রস্তাব খলিলজাদের জ্ঞাতসারে আলোচিত হয়েছে। অবশ্য কাবুল সরকারের প্রধান প্রেসিডেন্ট গনি ঐ প্রস্তাবকের সঙ্গে সাক্ষাত্ করতে অস্বীকার করেছেন। এসব উল্টাপাল্টা প্রস্তাবের মধ্যেও দোহা এবং মস্কোর শান্তি আলোচনা অব্যাহত থেকেছে। সংশ্লিষ্ট সবাই শান্তির অন্বেষায় সচেষ্ট রয়েছে।

যেকোনো শান্তি প্রচেষ্টার অনিবার্য অনুষঙ্গ হলো সমঝোতার মনোভাব। আমরা বিশ্বাস করতে চাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সকল সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও শান্তি আলোচনার প্রতি আন্তরিক থাকবে। দোহায় তালেবান পক্ষ এককভাবে সরকার গঠনের আবদার না করে, যুদ্ধরত সকল পক্ষের সমন্বয় চেয়েছে। অপরদিকে ‘মস্কো ঘোষণা’ ভবিষ্যতের জন্য একটি শান্তির পথরেখা তৈরির কথা বলেছে। আরো ইতিবাচক খবর হলো, দোহা বৈঠকের প্রতিও তারা তাদের সমর্থন ঘোষণা করেছে। শান্তির সম্ভাবনা যেকোনো সময়ের চেয়ে উজ্জ্বল হয়েছে। আসুন আমরা উত্তম বা ভালো কিছুর জন্য অপেক্ষা করি।

n লেখক:অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়