রাজধানীতে অননুমোদিত বাজারের সংখ্যা বাড়ছে। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অনুমোদনহীন এসব বাজারের সংখ্যা একশ ছাড়িয়ে গেছে। মহানগরীর বিভিন্ন স্থানে রাস্তা দখল করে অবৈধভাবে এসব বাজার গড়ে উঠেছে। এসব তরিতরকারি, মাছ ও সবজির বাজার ‘পরিচালনা’ করছেন স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি ও মাস্তানচক্র। আর এসব চক্রকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে আশ্রয় ও সহায়তা দিচ্ছে স্থানীয় প্রশাসন।
ডিসিসি সূত্র জানায়, পুলিশের মদদ নিয়ে রাজধানীতে শতাধিক বাজার গড়ে উঠেছে। এসব বাজার থেকে পুলিশ, মাস্তান ও রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা প্রতিদিন কোটি কোটি টাকা চাঁদা আদায় করছে। রাস্তার উপর এসব বাজার গড়ে ওঠায় দুর্ভোগ, যানজট ও দুর্ঘটনায় প্রাণহানি হচ্ছে।
গতকাল বুধবার মিরপুর মাজার রোডে গিয়ে দেখা গেছে ভয়াবহ চিত্র। এই রাস্তার উপর প্রতিদিনই বসে বাজার। ভোররাত থেকে সকাল ১০টা পর্যন্ত রাস্তার এক কিলোমিটার জুড়ে চলে তরিতরকারি, মাছ, মাংস, সবিজর পাইকারি বাজার। দূর-দূরান্ত থেকে আসেন সবিজ ব্যবসায়ীরা। শত শত ব্যবসায়ী ও ক্রেতার ভিড়ে বিশাল এই রাস্তা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রতিদিনই আশপাশের রাস্তায় তীব্র যানজট লেগে থাকে। চরম দুর্ভোগে পড়তে হয় মানুষকে। পাইকার ও ক্রেতাদের ভিড় যানবাহন চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। ভোর থেকে পুলিশের একটি টিম বাজার এলাকায় অবস্থান করলেও যানজট নিরসনে কোন ভূমিকা রাখে না। সবিজ ব্যবসায়ী হাসান উদ্দিন জানান, তিনি বাজার কমিটিরও একজন সদস্য। বললেন, স্থানীয় বাসিন্দাদের দৈনন্দিন চাহিদা মেটাতেই তারা প্রশাসনের সহায়তায় বাজার বসিয়েছেন। কেরানীগঞ্জ, সাভার, দোহার, নবাবগঞ্জ থেকে অনেকেই বিভিন্ন সামগ্রী নিয়ে এই বাজারে আসেন।
বাজারের পাইকার জসিম মিয়া বলেন, পুলিশ এখন প্রতি ব্যবসায়ীর কাছ থেকে দৈনিক দুইশ টাকা চাঁদা আদায় করছে। পুলিশের গোয়েন্দা সংস্থার প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরাও গণহারে চাঁদা আদায় করছেন। এসব অবৈধ চাঁদা দিতে গিয়ে তাদের প্রায়ই নাকাল হতে হয়।
মতিঝিল এলাকায় প্রতিদিন বিকালে রাস্তার পাশে বাজার বসছে। পথচারীদের চলাচল দুরূহ হয়ে উঠেছে। মতিঝিল অগ্রণী ব্যাংকের নাম প্রকাশের অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, রাজধানীর রাজপথে গড়ে ওঠা বাজারগুলোর কারণে যানজট সৃষ্টি হচ্ছে এ কথা যেমন সত্য, এসব বাজারগুলো অনেক ক্ষেত্রেই উপকারে আসছে সে কথাও সত্য। সকালে অফিসে আসার কারণে বাজার করা সম্ভব হয় না। বিকালে অফিস থেকে বের হয়ে অনেকেই ফুটপাত থেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনে ঘরে ফেরেন। একই অবস্থা দেখা গেছে, মানিকনগর, যাত্রাবাড়ী, নয়াবাজার, মালিবাগ, গোড়ান, খিলগাঁওসহ বিভিন্ন স্থানে। জুরাইন ও খিলগাঁও এলাকায় রেললাইনের উপর বসে খোলা বাজার। অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এসব বাজারের ভয়াবহতা দিন দিন বেড়েই চলেছে। এছাড়া মিরপুর মাজার রোডেই কাঠ-বাঁশের জমজমাট ব্যবসা চলছে। বাঁশ, কাঠ, ইট, বালির ব্যবসা গড়ে তোলা হয়েছে রাস্তার উপর। এছাড়া পাশেই অবৈধ বাসস্ট্যান্ড। এখান থেকে সাভার, আশুলিয়া, আবদুল্লাহপুরসহ নানাস্থানে বাস ছেড়ে যাচ্ছে। প্রতি গাড়ি থেকে পুলিশ ‘পার্কিং বাবদ’ এক শত টাকা চাঁদা আদায় করছে বলে অভিযোগ চালকদের। চিড়িয়াখানা রোডেও বসছে তরিতরকারীর বিশাল বাজার। অনেক বাজার কমিটি চাঁদা তুলে পুলিশকে ‘ভাগ’ দেয়। ভুক্তভোগীরা জানান, শুধু থানা পুলিশই নয়, ফাঁড়ি পুলিশ, টহল পুলিশ বাজারগুলো থেকে চাঁদা আদায় করছে।
উপ-পুলিশ কমিশনার (মিরপুর) নিসারুল আরিফ বললেন ভিন্ন কথা। তিনি ‘ইত্তেফাক’কে বলেন, বহু বছর ধরে মাজার রোডে তরিতরকারি ও সবিজর বিশাল বাজার গড়ে উঠেছে। বাজারটি নগরবাসীর সবিজর চাহিদা পূরণ করছে। ভোর থেকে সকাল ১০টা পর্যন্ত বিকিকিনি হয়। ১০টার পর রাস্তা খুলে দেয়া হয়। তিনি বলেন, শাহ আলী মাজারের পিছনে একটি পুকুর ভরাট করে বাজারটি স্থানান্তর করার পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি পুলিশের বিরুদ্ধে ঢালাও অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, সবকিছু পুলিশর কাঁধে এনে ফেলা উচিত না। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে অবশ্যই দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।
ডিসিসির ভাষ্য
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বিএম এনামুল হক বলেন, রাস্তায় অবৈধভাবে গড়ে ওঠা কোন বাজারের অনুমোদন সিটি করপোরেশন দিতে পারে না। অবৈধ এসব বাজার উচ্ছেদ করার দায়িত্ব পুলিশ প্রশাসনের, ডিসিসি’র নয়।
