রাজধানীতে বিভিন্ন কৌশলে অজ্ঞানপার্টির সদস্যরা নিরীহ যাত্রীদের কাছ থেকে মূল্যাবান জিনিসপত্র ছিনিয়ে নেয়। এ সব ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে গত বুধবার দিবাগত রাতে ঢাকা মহানগর পুলিশের দুইজন ম্যাজিস্ট্রেট আবদুল কুদ্দুস ও সারোয়ার আলমের নেতৃত্বে ৩১ জন অজ্ঞানপার্টির সদস্যদের গ্রেফতার করে বিভিন্ন মেয়াদি সাজা দেয়া হয়। এদের মধ্যে ৩ জনকে ২ বছরের, ১ জনকে ১৯ মাসের, ১ জনকে ১৬ মাসের, ১ জনকে ১১ মাসের, ৯ জনকে ৩ মাসের, ৬ জনকে ৬ মাসের, ২ জনকে ৪ মাসের, ২ জনকে ৩ মাসের ও ১ জনকে ১ মাসের কারাদণ্ডাদেশ দেয়া হয়েছে।
দণ্ডাদেপ্রাপ্তরা হলো— মিজানুর রহমান পিন্টু, আবদুল জলিল ব্যাপরী, আবদুর রশিদ, বাবু, কামারুজ্জামান, জাহিদ, নিয়ামুল হক, খোকন মিয়া, মোসলেম মোল্লা, আলম, মিজানুর রহমান, শরিফুল ইসলাম, সানোয়ার, রেজাউল, ওসমান গনি, লালমিয়া, গিয়াস উদ্দিন, মামুন, শহিদ আহমেদ, ফেরদৌস, আবু তাহের, মোকসেদ মোল্লা, সুমন, বাবু, আবদুল কাদের, সুমন, মাওলা সরদার, ওলি, আমিনুল ইসলাম, জনি ও শাওন আহমেদ। এ সময় তাদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ চেতনানাশক ওষুধ, অজ্ঞান করার কাজে ব্যবহূত আচার, সিগারেট, বিস্কুট, চায়ের ফ্ল্যাক্স এবং ৫০ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার দুপুরে ঢাকা মহানগর পুলিশের মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম এ সব তথ্য জানান।
মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘অজ্ঞানপার্টির সদস্যরা কখনো বিলাসবহুল বাসের যাত্রী হয়ে পানির সাথে চেতনানাশক এটিভেট ট্যাবলেট মিশিয়ে দেন। আবার চা, বিস্কুটের সাথে, কখনো হালুয়ার সাথে মিশিয়েও অজ্ঞান করেন। এই ট্যাবলেট পাকিস্তানের তৈরি। আধুনিক চিকিত্সা বিজ্ঞানে মস্তিস্ক বিকৃত মানুষের চিকিত্সায় এটি কাজে লাগে। স্বল্পমাত্রায় ব্যবহার করলে ভালো ঘুম হয়। কিন্তু অজ্ঞানপার্টির সদস্যরা দ্রুত সময়ের মধ্যে তাদের টার্গেট ব্যক্তিদের অতিরিক্তমাত্রায় সেবন করানোর কারণে তাদের মৃত্যু পর্যন্ত হয়।’
যুগ্ম কমিশনার বলেন, গোয়েন্দা পুলিশ চেতনানাশক ওষুধ সরবরাহকারী ঢাকার ফকিরাপুল গাউসিয়া ফার্মেসির মালিক মিজানুর রহমান পিন্টুকে ৭২৫ পিস এটিভেন ট্যাবলেট, ১০টি মাইলাম ট্যাবলেট এবং ৬টি ডার্মিকাম ট্যাবলেটসহ গ্রেফতার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পিন্টু গোয়েন্দা পুলিশকে জানান— ভারত থেকে অবৈধ পথে বিভিন্ন ধরনের চেতনানাশক ওষুধ বাংলাদেশে এনে সক্রিয় অজ্ঞানপার্টির সদস্যদের কাছে বিক্রি করে আসছিলেন। নগরীর বেশ কয়েকটি অজ্ঞানপার্টির গ্রুপ তার কাছ থেকে ওষুধ কেনে। এদের মধ্যে ফকিরাপুলের শরীফুল গ্রুপের ৬ জন, গুলিস্তানের জাহিদ গ্রুপের ৫ জন, কমলাপুরের আবদুল জলিল ব্যাপারী গ্রুপের ৪ জন, মহাখালী বাসটার্মিনালের মাওলা গ্রুপের ৫ জন মিরপুরের কালসীর মামুন গ্রুপের ৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়।
গ্রেফতারকৃতরা প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গোয়েন্দা পুলিশকে জানিয়েছেন— তারা যাত্রীদের প্রথমে টার্গেট করে অথবা কৌশলে তাদের সাথে সখ্য তৈরি করে। খাদ্যদ্রব্য বা পানির সাথে চেতনানাশক মিশিয়ে খাইয়ে অজ্ঞান করে। তারপর তাদের সাথে থাকা মালামাল নিয়ে যায়। জিজ্ঞাসাবাদে তারা আরো জানান— বাসটার্মিনাল, ট্রেনস্টেশন ও ফুটপাতে টং দোকান বসিয়ে তারা চা, বিস্কুট, কলা, সিগারেট, চানাচুর, মুড়ি, হালুয়া ও কোমল পানির সাথে চেতনানাশক ওষুধ মিশিয়ে টার্গেটকৃত ব্যক্তিদের অজ্ঞান করে। এ কাজে পরিকল্পনা অনুযায়ী একেক সদস্য একক ধরনের দায়িত্ব পালন করে থাকে। গ্রেফতারকৃতরা পূর্বে একাধিকবার গ্রেফতার হয়েছিলেন। এদের মধ্যে আবদুল জলিল ব্যাপারী ১১ বার, মিজানুর রহমান ৩ বার, মাওলা ৭ বার, ওলি ৩ বার, শরিফুল ৩ বার, জাহিদ ২ বার এবং মনির ওরফে মনা ৫ বার গ্রেফতার হয়েছিল। গ্রেফতারকৃত মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা হয়েছে। অন্যদের ভ্রাম্যমাণ আদালতে সাজা দেয়া হয়েছে।
গ্রেফতার অভিযানে অংশ নেন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উত্তর বিভাগের ডিসি শেখ নাজমুল আলম, গোয়েন্দা পুলিশের এডিসি সাইফুল ইসলাম, এডিসি আবদুল আহাদ, গোয়েন্দা পুলিশের এসি মহরম আলি, লুবনা জাহান, এস এমনাজমুল হক, মেনহাজ উদ্দিন ও জামাল উদ্দিন।
