‘আমি কী আমার ছেলেটারে আর দেখতে পাব না? মাকে বোধহয় আর পাবই না। মা আমার কাঁদতে কাঁদতে শেষ হয়ে যাবে’– এটুুকু বলেই গাজীপুর জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার ব্রাহ্মণগাঁও গ্রামের মহিউদ্দীন মোল্লার ছেলে মো. বাদল মোল্লা অঝোর ধারায় কাঁদতে শুরু করলেন। কান্না থামার পর জানালেন, ৮ দিন ধরে সকালে মাত্র দুটো রুটি খেয়ে তাদের দিন কাটছে। ৬ মাস তারা রুটির সাথে দুপুরে একবেলা খেতে পারলেও এখন দুপুরের খাবারটাও বন্ধ হয়ে গেছে। এভাবে এগিয়ে যাচ্ছেন নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে।
এই পরিস্থিতির মুখে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের ১৮০ জন শ্রমিক। ইরাকের নাজাফ শহরের আবু তোরাব হাউজিং কোম্পানিতে চাকরি নিয়ে এসব শ্রমিক গত ২২ মে দেশ ছাড়েন। ইরাকে যাবার পর থেকেই একটি ‘বন্দীশিবিরে’ তারা অবরুদ্ধ আছেন। ঢাকার ‘ক্যারিয়ার ওভারসিজ কনসালট্যান্ট লিমিটেড’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান চাকরির কথা বলে বাংলাদেশের যশোরসহ ৩৭টি জেলার ১৮০ জন বাংলাদেশিকে ইরাকে নিয়ে যায়। গত ১১ নভেম্বর এদের মধ্যে একটি বাসে ১৬ এবং আরেকটি বাসে ৬৩ জনকে তুলে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। ১৬ জনের দলটিকে নির্যাতনের পর সাদা কাগজে সই করিয়ে ২২ নভেম্বর পুরনো আস্তানায় ফিরিয়ে আনা হয়। বাকি ৬৩ জনের সন্ধান মেলেনি।
গতকাল শনিবার দুপুরে বন্দীশিবিরে আটক কয়েকজনের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। মেহেরপুরের গাংনির মিনারুল ইসলাম জানান, একটি রুমে গাদাগাদি করে সবাইকে রাখা হয়। দুপুরের খাবার বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। কোনো বাজার নেই। যে কেয়ারটেকার এবং বাবুর্চি ছিল, তারাও চলে গেছে। গাইবান্ধার মো. আহমেদ ফারুক বলেন, ‘একে-৪৭ রাইফেল দিয়ে পালাক্রমে ৪ জন আমাদের পাহারায় থাকে। আমরা আওয়াজ করলেই ওরা ফাঁকা গুলি করে। জীবনটা কখন চলে যাবে জানি না। টাকা-পয়সা কিছু চাই না। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমরা আমাদের প্রাণ ভিক্ষা চাই।’
মানবাধিকার সংগঠন রাইটস যশোরে একটি অভিযোগের ভিত্তিতে ১ অক্টোবর স্বরাষ্র্ব মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে অতিরিক্ত সচিব (রাজনৈতিক) ড. কামাল উদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় অতিরিক্ত ডিআইজি অর্গানাইজড ক্রাইম সিআইডি জানান, ক্যারিয়ার ওভারসিজ বিএমইটি’র ক্লিয়ারেন্সের ভিত্তিতে ১৮০ জন বাংলাদেশিকে ইরাকে পাঠায়। ইরাক বর্তমানে একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ। বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এ পরিস্থিতিতে কিভাবে বাংলাদেশের শ্রমিকদের ইরাকে পাঠিয়েছেন তা আমার বোধগম্য নয়।’ সভায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি জানান, তারা একটি সরকারি প্রকল্পের আওতায় চুক্তিবদ্ধ হয়ে ইরাকে গেছেন। কিন্তু তাদের যাবার পর ইরাকের রাজনৈতিক পরিস্থিতি অবনতি হবার কারণে তারা এই পরিস্থিতিতে পড়েছে। সভায় নাজাফে অবরুদ্ধ ১৮০ বাংলাদেশির সর্বশেষ অবস্থান সম্পর্কে ‘অতি জরুরি ভিত্তিতে’ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অবহিত করার জন্য অনুরোধ করা হয়।
এদিকে সভার পরদিনই ইরাকে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মেজর জেনারেল রেজানুর রহমান অবরুদ্ধ শ্রমিকদের সাথে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করেন। শ্রমিকদের সাথে তার কথোপকথনের ভয়েস রেকর্ডিংটি ইত্তেফাকের হাতে এসেছে। এতে দেখা যায়, রাষ্ট্রদূত শ্রমিকদেরকে ওই কোম্পানির বিরুদ্ধে মামলা করার ব্যাপারে নিরুত্সাহিত করেন।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশের ওইসব শ্রমিকরা জমি বিক্রি কিংবা বন্ধক রেখে অথবা এনজিওর চড়া সুদে ঋণ নিয়ে ২ লাখ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত দিয়ে সোনালি স্বপ্নের প্রত্যাশায় ইরাকে পাড়ি জমান। ৬ মাসেও তাদের সমস্যার সমাধান না হওয়ায় ওইসব শ্রমিকদের স্বজনরা বাংলাদেশের বিভিন্ন থানায় মামলা করেছেন। এর আগে ‘ইরাকে বিপদে ১৮০ বাংলাদেশি শ্রমিক’ শিরোনামে ৯ আগস্ট ইত্তেফাকে রিপোর্ট প্রকাশিত হয়।