শেষ কথাটা বলা হলো না কাইয়ুম চৌধুরীর। না বলেই পাড়ি জমালেন অনন্তলোকে। কী বলতে চেয়েছিলেন তিনি? তিনি জানতেন মৃত্যু ঘনিয়ে এসেছে। সেই জন্য এত আকুতি ছিল কথাটি বলার। তা না হলে এভাবে বক্তৃতা শেষ হওয়ার পরে কেউ ফিরে আসে, উপস্থিত দর্শকদের উদ্দেশে, জাতির উদ্দেশে সেই কথাটি বলার জন্য! বক্তৃতার মাঝে তার কথায় মৃত্যু চিন্তাও ফুটে উঠেছিল। সেই চিন্তা থেকেই কী কিছু বলতে চেয়েছিলেন?
গতকাল রবিবার বেঙ্গল উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত উত্সবের চতুর্থ দিনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসাবে বক্তৃতা দেন তিনি। বক্তৃতা শেষ করে মঞ্চে তাঁর আসনেও ফিরে আসেন। এ সময় প্রধান অতিথি প্রফেসর এমিরেটাস আনিসুজ্জামানকে বক্তৃতার জন্য ঘোষণা দেন উপস্থাপক ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায়। তখন ৮টা ৩৫ মিনিট। আনিসুজ্জামান ডায়াসে এসে বক্তৃতা শুরু করবেন এই সময় কাইয়ুম চৌধুরী আবার উঠে দাঁড়িয়ে বলে ওঠেন, ‘আমার একটি কথা বলা হয়নি’। বলে ডায়াসের কাছে এগিয়ে এসেই লুটিয়ে পড়েন তিনি। এসময় মাথায় গুরুতর আঘাত পান। এসময় পুরো অনুষ্ঠানস্থলে আতংকের শীতল স্রোত বয়ে যায়। সবাই হন্তদন্ত হয়ে কাইয়ুম চৌধুরীকে ভেতরে নিয়ে যান। এসময় উদভ্রান্তের মত বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান আবুল খায়ের লিটুকে মঞ্চের মাইক থেকে অ্যাম্বুলেন্সের ড্রাইভারকে খুঁজতে দেখা যায়। একটু পরে ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায় উত্সব মঞ্চ থেকে ঘোষণা দেন যে কাইয়ুম চৌধুরী গুরুতর আঘাত পেয়েছেন। তাকে সিএমএইচ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
এদিকে, রাত সাড়ে দশটায় তার মৃত্যু সংবাদ জানাতে মঞ্চে আসেন অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। নাট্যজন রামেন্দু মজুমদার, বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক লুভা নাহিদ চৌধুরীসহ মঞ্চে আসেন।
তিনি বলেন, আমার বন্ধু কাইয়ুম চৌধুরী নেই। এভাবে জানাতে হবে কল্পনা করিনি কোনদিন। কাইয়ুম চৌধুরী এ দেশের সেরা চিত্রকর ছিলেন। তিনি প্রচ্ছদ শিল্পী হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন। এদেশের মানুষ ও প্রকৃতিকে তিনি যেভাবে উপস্থাপিত করেছেন তা আমাদের কাছে বিশেষ মূল্য রয়েছে। তার আঁকা মুক্তিযোদ্ধার ছবি আমাদের ইতিহাসে স্থায়ী আসন পেয়েছে। তাঁর মৃত্যুতে বেঙ্গল ফাউন্ডেশন গভীর শোক প্রকাশ করছে। তাঁর ইচ্ছাকে কল্পনা করে আমরা অনুষ্ঠান চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। অনুষ্ঠান চলবে, যেমন জীবন বয়ে চলে। কাইয়ুম সঙ্গীত ভালবাসতেন। তিনি চাইতেন না তার জন্য কোন অনুষ্ঠান বন্ধ হোক। অনুষ্ঠান চলবে।
এসময় রামেন্দু মজুমদার বলেন, এমন আলোকিত মৃত্যু ক’জনের ভাগ্যে ঘটে। তিনি বক্তৃতা শেষ করলেন, তিনি কী বলতে চেয়েছিলেন আমার পালা সাঙ্গ হলো আজ। কিন্তু তিনি হারিয়ে যাবেন না। আমাদের আলোকিত করবেন, সবসময়।
অথচ খুব সাবলীল ছিলেন কাইয়ুম চৌধুরী। খুব সুন্দরভাবে গুছিয়ে কথা বলেছেন। সবসময় যা বলেন। বলেছিলেন নিজের বিশ্বাসের কথা। বলছিলেন তাঁর জীবনের অভিজ্ঞতার কথা।
গতকাল বক্তৃতায় তিনি বলেন, ‘‘শ্রোতাদের বিপুল উপস্থিতি আমাকে মুগ্ধ করেছে। এরপরই তিনি অতীতের দিকে ফিরে যান। এই অঞ্চলের চিত্রকলার ইতিহাস তুলে ধরে কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, ‘‘১৯৪৭ সাল পর্যন্ত এই ভূখণ্ডে চারুকলার চর্চায় কোনো প্রতিষ্ঠান ছিলো না। সেই সময় জয়নুল আবেদিনের নেতৃত্বে চারুকলার মহাবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। কেবল বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেই তিনি ক্ষান্ত হননি, তিনি শিল্প আন্দোলনের সৃষ্টি করেছিলেন।’’
তিনি বলেন, ‘‘জয়নুল আবেদিন বলতেন, শুধু ছবি আঁঁকলে শিল্পী হওয়া যায় না, যতক্ষণ পর্যন্ত একজন শিল্পী সংস্কৃতির সঙ্গে না জড়ান।’’
শিল্পচর্চার সঙ্গে সংস্কৃতির বিভিন্ন মাধ্যমের গভীর সম্পর্কের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘‘সেই সময় আর্ট কলেজে আব্দুল আলীম, মমতাজ উদ্দিন, কানাইলাল শীল বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গান শোনাতেন।’’
জয়নুল আবেদিন শিল্প আন্দোলন শুরু করেছিলেন বলেই বিগত ৭০ বছরে আমাদের শিল্পকলার ইতিহাস পাল্টে গেছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
দেশে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের চর্চা নিয়ে চিত্রকলার ক্রমবিকাশের প্রাসঙ্গিকতা বর্ণনা করে কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, ‘‘৭০ বছর আগে যদি একজন সংগঠক থাকতেন, তাহলে এই দেশে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতচর্চা কোথায় দাঁড়াতো তা বলা সত্যিই কঠিন।’’
এসময় মৃত্যু শঙ্কাও তাঁর মুখে ফুটে উঠে। তিনি বলেন, ‘‘আমি বেঁচে থাকতে হয়তো সেই অবস্থা দেখতে পারবো না।’’- তবে ভবিষ্যতে দেশের উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের চর্চা উচ্চ শিখরে যাবে বলে জোর আশাবাদ জানান তিনি।
অতীতে দেশে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত চর্চা থাকলেও পৃষ্ঠপোষকতা না পাওয়ায় তা সঠিক গন্তব্যে যেতে পারেনি বলেও মন্তব্য করে কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, ‘‘আগেও উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত এখানে ছিলো। পৃষ্ঠপোষকতা ছিলো না। ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ, বাহাদুর হোসেন খাঁ, ফুলঝুঁরি খাঁ-রা পৃষ্ঠপোষকতার অভাবেই তখন ভারতে চলে গিয়েছিলেন’’।
