সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক বলেছেন, অনন্যা সাহিত্য পুরস্কারের ধারাবাহিক তালিকা দেখে বোঝা যায় নামের দিকে নয় গুণ বিবেচনায়ই এ পুরস্কার দেয়া হয়। অনন্যা অপরিচিত গুণসম্পন্ন নারী লেখকদের অনন্য সম্মাননা দিয়ে আমাদের সামনে নিয়ে আসে। নারী লেখকদের জন্য ক্ষেত্র তৈরি করে। অনন্যা যেন নিজেকে বলে আমি দশজনের মধ্যে নই। আমি একাদশতম।
গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় জাদুঘরের কবি সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে ‘অনন্যা সাহিত্য পুরস্কার ১৪২১’ প্রদান কালে তিনি এসব কথা বলেন। সাহিত্যে বিশেষ অবদান রাখার জন্য এবছর পুরস্কার পেলেন বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক জাহানারা নওশিন।
পাক্ষিক অনন্যার সম্পাদক ও দৈনিক ‘ইত্তেফাকে’র ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক তাসমিমা হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক। বিশেষ অতিথি ছিলেন কবি আসাদ চৌধুরী ও কবি শামীম আজাদ। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনার দায়িত্বে ছিলেন কথাসাহিত্যিক ঝর্না রহমান।
পুরস্কার হিসেবে লেখককে একটি ক্রেস্ট, পঞ্চাশ হাজার টাকার চেক ও উত্তরীও পরিয়ে দেয়া হয়।
অনুষ্ঠান শুরুতে সদ্যপ্রয়াত শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী, অধ্যাপক জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, সাংবাদিক জগলুল আহমেদ চৌধুরীসহ সকলের জন্য এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।
সৈয়দ শামসুল হক বলেন, সাহিত্যে নারীর আত্মপ্রকাশ ঐতিহ্যগতভাবে এক কুণ্ঠার বিষয়। দীর্ঘদিন ধরে নারী সাহিত্যে নিজের নাম লেখাতে বড়ই কুণ্ঠাবোধ করে। তাদের কুণ্ঠা ভাঙতে সওগাত সম্পাদক নাসির উদ্দিন বেগম প্রকাশ করেছেন। সেই লেখাগুলো পড়লে মনে হতো বড়ই কাঁচা সাহিত্য। কিন্তু তার গভীরে ছিল তাদের জীবনের উপলব্ধি সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ। আজ কথাসাহিত্যিক জাহানারা নওশিনও সেই কুণ্ঠার কথা বললেন। কুণ্ঠার জন্যই তিনি বড় দেরি করে সাহিত্যের জগতে নাম লিখিয়েছেন। কিন্তু তার লেখাগুলো মান বিচারে অসামান্য। তাই তিনি বেশি সময় ধরে নিজেকে তৈরি করেছেন। যারা অনন্যা সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন তারা প্রত্যেকেই আমাদের সাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। অনন্যা প্রায় উপেক্ষিত ও আড়ালে থাকাদের সামনে এনে পুরস্কার দিয়ে সম্মাননা জানিয়ে আসছে।
কবি আসাদ চৌধুরী বলেন, জাহানারা নওশিন বিনয় করে বললেন, তিনি লেখা প্রকাশ করতে লজ্জা পেতেন। তিনি আসলে নিজেকে তৈরি করেছেন। তার গদ্যের ডিটেলিং, প্রকৃতির বর্ণনা এসব ক্ষেত্রে অনেকের থেকে আলাদা। প্রেম ও পারিজাত-এ তিনি পুরুষ মনস্তত্বকে দারুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। অনন্যা সাহিত্য পুরস্কার দেশের নারী সাহিত্যিকদের দেয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে মজা করে বলেন, এই পুরস্কারটি কেবল নারীদের দেয়ায় আমরা উপেক্ষিত থাকছি।
কবি শামীম আজাদ বলেন, আমরা সাধারণত বলতে ভালবাসি। কিন্তু জাহানারা নওশিন এমন একজন মানুষ যিনি বলার চেয়ে শোনাকেই বেশি গুরুত্ব দেন। পড়ায় বেশি গুরুত্ব দেন যারা, তারাই লেখার জন্য অনন্যা পুরস্কার পান। যে লেখক বেশি পড়বেন সেই অনন্যা পাবেন। সকল অতিথি ভবিষ্যতে এই ধারা অব্যাহত থাকবে বলেও আশা করেন।
পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক জাহানারা নওশিন তার প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেন, আজ এই পুরস্কারের মধ্য দিয়ে আমি মনে করি আমার কাজের মূল্যায়ন হয়েছে। আর নিজের সাহিত্য জগতে কিছু করছি তাই এই সম্মাননা বলে গর্ববোধ করছি। কাজের মূল্যায়ন হলে কার না ভাল লাগে! আমি আমার পাঠক-প্রকাশক ও আজকের এই আয়োজক সকলকে ধন্যবাদ জানাই।
সভাপতির ভাষণে অনন্যা সম্পাদক তাসমিমা হোসেন বলেন, আমরা সাহিত্যে অবদান রাখার ক্ষেত্রে নারীর ভূমিকাটা তার উপলব্ধি থেকে দেখার চেষ্টা করি। ‘অনন্যা’ অন্য এক দৃষ্টিকোণ বিবেচনায় প্রতি বছর লোকচক্ষুর অন্তরালের নারী লেখকদের মনোনীত করে। যারা সাহিত্য জগেক সমৃদ্ধ করার জন্য সত্যিকার অর্থে কাজ করেন এমন একজনকে মনোনীত করতে পেরে প্রতি বছরই এই সময় এমন ভাললাগা কাজ করে।
কথাসাহিত্যিক জাহানারা নওশিন ৬ মার্চ ১৯৩২ সালে ভারতের বর্ধমান জেলার যবগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পেশায় শিক্ষক জাহানারা নওশিনের প্রবন্ধ, গল্প, উপন্যাস, শিশুসাহিত্য মিলে এযাবত্ প্রকাশিত গ্রন্থসংখ্যা ৯টি। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলোঃ বৃক্ষে বৃক্ষে বিষকরবী, পিতামহীর পাখি, দুহিতা, প্রেম ও পারিজাত, হাড়িকাঠ, আহা ভূত বাহা ভূত ইত্যাদি। গত বছর তিনি বাংলা একাডেমী পুরস্কার পান।
বাংলা ১৪০১ সন (১৯৯৩ সাল) থেকে ‘অনন্যা সাহিত্য পুরস্কার’ প্রবর্তন করা হয়েছে। সাহিত্যে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ প্রতিবছর একজন কৃতী নারী, সাহিত্যিক অথবা সাহিত্য গবেষককে এ পুরস্কার প্রদান করা হয়। অনুষ্ঠানে তরুণ কবিরা স্বরচিত কবিতা আবৃত্তি করেন।
