শাহজালাল বন্দরে যাত্রীসেবা আন্তর্জাতিক মানের নয়

আপডেট : ০৪ ডিসেম্বর ২০১৪, ০০:০২

শাহজালাল বিমানবন্দরে যাত্রীসেবা আন্তর্জাতিক মানের হয়নি। বিমানবন্দরে নেমে দেশি-বিদেশি যাত্রীদের পোহাতে হচ্ছে ভোগান্তি। বিনা কারণে সাধারণ যাত্রীদের, বিশেষ করে বিভিন্ন দেশে কর্মরত শ্রমিকদের নাজেহাল করা হয়ে থাকে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

গত মঙ্গলবার সকাল সাড়ে আটটায় এমিরেটস এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে করে বিমানবন্দরে নেমে এ যাত্রীরা পোহাতে হয়েছে পদেপদে ভোগান্তি। ওই ফ্লাইটে করে আসা বিদেশি নাগরিকদেরও এসময় বিরক্তি প্রকাশ করতে দেখা গেছে। আর যাত্রীদের একজন ছিলেন এ প্রতিনিধি। তিনি স্বপক্ষে এসব দেখেছেন।
দেখা গেছে, কর্মকর্তারা তাদের নির্দিষ্ট দায়িত্ব পালন না করে কেউ তাদের আত্মীয়স্বজনদের রিসিভ করছেন, আবার কেউ কারো সুপারিশে যাত্রীদের রিসিভি করে বিমান বন্দর পার করানো নিয়ে ব্যস্ত। তাদের কাজ কর্মে দেখা গেছে ঢিলেমি। এসব দেখে মনে হচ্ছিল বিমানবন্দরের ভেতরে কর্মকর্তারা এভাবে দায়িত্ব পালন করলে এখান দিয়ে সোনা পচার তো হবেই।
প্রসঙ্গত: কয়েকদিন আগে সোনা পাচারের সঙ্গে জড়িত বাংলাদেশ বিমানের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা গ্রেফতার হন। জিজ্ঞাসাবাদে তারা এ কাজে জড়িত বিমানের অন্য ব্যক্তিদের নাম ও বিমানবন্দরের আর যারা যারা জড়িত তাদের নাম ফাঁস করে দেন।
যাত্রীরা যখন এমিরেটসের ওই ফ্লাইট থেকে নামছিল। বের হওয়ার গেটের মুখে এসময় বিমানবন্দরের কর্মকর্তারা তাদের পরিচিত লোকজনকে ও বিমানের স্টাফদের আগে বের করাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এ দৃশ্য দেখে বিদেশী যাত্রীরা বিরক্ত হন।
ইমিগ্রেশন এলাকায় যাওয়ার আগে অনেকে যান টয়লেটে। সেখানে গিয়েও তিক্ত অভিজ্ঞতা। টয়লেটে প্রচণ্ড দুর্গন্ধ, নেই পানি। এরপর যাত্রীরা ইমিগ্রেশনের ২০টি লাইনে দাঁড়ান। ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ তাদের দায়িত্ব পালন করেন। এসময় কুয়েত এয়ার লাইন্সের একটি ফ্লাইট অবতরণ করে। দুই ফ্লাইটের যাত্রীরা ইমিগ্রেশনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকেন। ইন্সপেক্টর হাসান ও অপর এক কর্মকর্তা যাত্রীদের সামাল দেন। এরপর ব্যাগেজ সংগ্রহের জন্য বেল্টে যায় যাত্রীরা। সেখানে গিয়ে অনেক যাত্রী দেখতে পান প্রায় একডজন ব্যাগের তালা নেই। অনেকের মালামালও খোয়া যায়।
এ অবস্থায় পরিচালক (বিমানবন্দর) গ্রুপ ক্যাপ্টেন জাকির হাসানকে ফোন করা হলে তিনি দ্বিতীয় দফায় ফোন রিসিভ করেন। তাকে এসব সমস্যার ব্যাপারে  প্রশ্ন করার আগেই বলেন আপনার কোন প্রয়োজন আছে? এ প্রান্ত থেকে না বললে ব্যস্ত আছি বলে তিনি লাইন কেটে দেন। 
বিদেশি কয়েকজন যাত্রীকে বিমানবন্দরের এ অবস্থা দেখে বিরক্তি প্রকাশ করতে দেখা গেছে। ওই সময় বেল্টে কয়েকজন যাত্রী বলেন, কারো বাড়িতে গেলে বাথরুমের পরিবেশ দেখলেই বোঝা যায় তাদের অবস্থা কেমন। বিমানবন্দরে নেমেই  বাংলাদেশ সম্পর্কে একটি বিরূপ ধারণা জন্মে বিদেশিদের।
কেউ কেউ বলেন, সরকার শাহজালাল বিমান বন্দরকে সম্প্রসারিত করে আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর করেছে। চট্টগ্রাম ও সিলেট আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেরও উন্নয়ন করেছে। কিন্তু এগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ, নিরাপত্তা ও যাত্রী সেবার মান বাড়ানোর দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের। কিন্তু তারা তাদের দায়িত্ব পালন না করে জড়িয়ে পড়ছেন দুর্নীতিতে। 
দোতলা ৬ নম্বর গেটে গিয়ে দেখা যায়, টাকা দিয়ে টিকিট কেটে দলে দলে অনেকে প্রবেশ করছে বিমানবন্দরে। নেই পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা। নিরাপত্তা কর্মীদের শিথিলতায় যেকোন সময় ঘটতে পারে অনাকাঙ্খিত ঘটনা।
যাত্রীরা বেল্ট থেকে লাগেজ নিয়ে কাস্টমস হয়ে গাড়িতে উঠার জন্য ক্যানপি হলে যান। ক্যানপি হলে গিয়ে দেখা যায় ট্যাক্সি প্রবেশ করছে সারিবদ্ধভাবে। আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন ও আনসার সদস্যদের ক্যানপি হলের প্রবেশ গেটে দেখা গেলেও কোন ট্যাক্সি ক্যাব চেক করতে দেখা যায়নি। অথচ তারাই কিনা যাত্রীদের গাড়ি প্রবেশের সময় নানা প্রশ্ন করছেন।
বিরক্ত যাত্রীরা ট্যাক্সি ক্যাব চালকদের প্রশ্ন করেন, ভেতরে আসলেন কিভাবে। তারা অকপটে বলেন, বাদশা ভাই ক্যানপি হল নিয়ন্ত্রণ করেন। এজন্য কতিপয় কর্মকর্তাদের নিয়মিত টাকা দেন তিনি। বাদশা ভাইয়ের ট্যাক্সি ক্যাবের ক্যানপি হলে ঢুকতে কোন বাধা নেই।
মঙ্গলবার রাত ৮টা ১০ মিনিট থেকে ৮টা ২৯ মিনিট পর্যন্ত দুই দফা গ্রুপ ক্যাপ্টেন জাকির হোসেনকে ফোন করলে তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। এরপর বিমানবন্দর থানার ওসিকে ফোন করলে তাকেও পাওয়া যায়নি।

উপ-পুলিশ কমিশনার (উত্তর) ইকবাল হোসেন বলেন, ক্যানপি হল ও বিমান বন্দরে নিরাপত্তার দায়িত্ব তার বিভাগের চেয়ে আর্মড ব্যাটালিয়নের বেশি। আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন বিমানবন্দরে সারাক্ষণ নিয়োজিত। তারপরও ক্যানপি হলের আশেপাশে ও যাত্রী হয়রানি বন্ধে তিনি কঠোর ব্যবস্থা নেবেন বলে জানান। বিমান বন্দরে এসব ঘটনা প্রতিদিন কর্মকর্তাদের চোখের সামনেই ঘটছে বলে বিমান বন্দরে নিয়োজিত অপর দুইটি সংস্থার দুই কর্মকর্তা জানান।