জীবনের মাধুর্য ঢেলে গড়ে তুলতে হয় প্রকৃত কাব্যপ্রতিমা

আপডেট : ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ২২:৫৫

দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, সবাই কবি নন, ‘কেউ কেউ কবি’। ‘কেউ কেউ’ হয়ে ওঠার পেছনে ঐশীপ্রাপ্তি থাকতে পারে কিনা কে জানে। কেননা কবিতার বিষয়টা পুরো ভিন্ন, অন্যরকম। কবিতায় মথিত হতে হতে কবি জীবন-যৌবনের স্বাভাবিক আকাঙ্ক্ষা থেকে ছিটকে পড়েন। সারাক্ষণ বাস করেন অন্য এক জগতে। কবিতার জন্য এ ত্যাগ একজন কবিকে মেনে নিতেই হয়। এ কারণে দায়দেনার হিসেব চলে না কবিতার সঙ্গে। যদি কোনোভাবে একটি উত্তম কবিতা লেখা হয়ে যায়, তা বরং আনন্দের।

কিন্তু কী করে বুঝবো কবিতাটি উত্তম? এ রহস্যময় প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে উত্তর খোঁজার চেষ্টা করি। প্রতিবছর গ্রন্থমেলায় প্রকাশিত হয় অসংখ্য কবিতার বই। অসংখ্য কবিতা তো লেখা হয়ে ছাপা হয়ে ঝরে যায়, সংখ্যাহীন কবিতাগ্রন্থ প্রকাশিত হয়ে পাঁচ-দশজনের হাত ঘুরে হারিয়েও যায়। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে, সময় থেকে সময়ে, স্বদেশ-স্বকালে প্রবাহিত হতে পারে না অনেকেরই কবিতা। কেন এ রকম হয়? কেন কবিতা সবাইকে আলোড়িত করে না? সত্যি কথা কী, আমার কাছে এর সঠিক উত্তর জানা নেই। আমার মনে হয়, মূলত জীবনবিমুখ কবিতা থেকে পাঠক মুখ ফিরিয়ে নেয়। জীবনকে উপেক্ষা করে, স্পর্শ ও স্পন্দনকে ব্যাহত করে কবিতার মুখোমুখি হওয়া ঠিক নয়। জীবনকে ছুঁয়ে-ছেনেই হদিস করতে হয় কবিতার। একজন কবির কাজ এক্ষেত্রে কঠিন ও রোমাঞ্চকর। কবিকে সেই রোমাঞ্চকর জগতে বাস করতে হয় প্রতিদিনই। তারপর, হঠাত্ করেই স্ফুলিঙ্গের মতো ঝলসে ওঠে পঙিক্তমালা। কবিতার পঙিক্ততে যদি জীবনকথা সামষ্টিক হয়ে ওঠে, তবেই কবিতাকে পাঠক আপন করে নেয়।  আধুনিক কবিতার বিরুদ্ধে ছন্দহীনতার অভিযোগ প্রায়ই উচ্চারিত হয়। ক্ষেত্রবিশেষ পুরোপুরি অভিযোগ মিথ্যাও নয়। আমাদের সময়ের অনেক কবি ছন্দের ‘ছ’ জানেন না, বোঝেনও না। ছন্দ জানেন না বলেই ‘ছন্দবিমুখ’ তারা। তবে সবার জন্য এ কথা প্রযোজ্য নয়। কেননা আমাদের সময়ে অনেকেই আছেন ছন্দকুশলী। তাদের সংখ্যা হাতেগোনা। ছন্দে তাদের দখল, পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রশ্নাতীত। তাদের কবিতার ভাঁজে ভাঁজে ছন্দের নিপুণ কারিশমা জড়িয়ে। প্রতিনিয়ত তারা লয়-তাল-মাত্রার খেলায় ভাঙছেন, গড়ছেন ছন্দকাঠামো; তৈরি করছেন নতুনতর ছন্দবিন্যাস। প্রথাগত ছন্দের বাইরে গিয়েও তারা আবিষ্কার করছেন ছন্দের নতুন চৌহদ্দি।  নিজের কথা যদি বলি, তবে বলবো ছন্দ আমার রক্তে, আমার বোধে; কবিতামানসে। ছন্দকে আমি ছাড়তে পারিনি, ছন্দও আমাকে ছাড়েনি। এ কারণে ছন্দের সঙ্গে আমার এক অম্ল-মধুর ভালোবাসার সংসার। আমার অধিকাংশ কবিতাই ছন্দে লেখা। ছন্দের ভেতর দিয়ে, সুরের ভেতর দিয়ে আমি গড়ে তুলতে চেয়েছি আমার সুশৃঙ্খল দৃঢ় কাব্যভুবন।

কয়েক দশকের কাব্যধারা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ছন্দ জানা ও ছন্দে লেখা কবি ও কবিতার সংখ্যা কমছে প্রতিদিনই। আমার দৃষ্টিতে এটার কারণ একটিই। সেটি হলো কবিতার জন্য প্রকৃত সাধনা ও ভালোবাসার অভাব। দীর্ঘ দীর্ঘ দিবস সাধনা করে ভালোবেসে একটি পঙ্?ক্তির জন্য, একটি শব্দের জন্য ব্যয় করতে হয় ত্যাগ-তিতিক্ষা। জীবন-যৌবনের মাধুর্য ঢেলে দিয়ে সাজাতে হয় কাব্যসুষমা, গড়ে তুলতে হয় কাব্যপ্রতিমা। কবিদের ওই সাধনা ওই ভালোবাসার এখন বড় অভাব।

আধুনিকতা-উত্তরাধুনিকতার নামে নানা ইজম-ফিজমের ফাঁদে পা দিয়ে, নিরীক্ষার নামে উত্কট নাড়িছেঁড়ার মধ্য দিয়ে জটিল থেকে জটিলতর হয়ে উঠেছে বাংলা কবিতা। কবিতা চারদিকের জটিলতা কিংবা সরলতা নিয়ে এগিয়ে চলেছে তরতর গতিতে। স্রোতধারা যখন এগিয়ে যায়, তখন কখনো ঘোলা স্রোত কখনো নির্মল ধারা এতে সংযোগ হতে পারে। সব পানীয় পানযোগ্য নয়,  প্রয়োজনীয়ও নয়। কবিতার ক্ষেত্রে এ কথা বলা যায়। লেখক: কবি, সাংবাদিক