ফুটপাত দিয়ে চলছে মোটর সাইকেল। মূল সড়কে যানজট দেখা দিলেই মোটর বাইক চালকরা তাদের বাহনটিকে উঠিয়ে দিচ্ছেন ফুটপাত দিয়ে। এছাড়া নানা পসরা সাজিয়ে বসছেন হকাররা। শুধু হকাররা নয়, রাখা হচ্ছে ভবন নির্মাণ সামগ্রী। ফলে নগরবাসীর চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হচ্ছে। যদিও জনসাধারণের চলাচলের সুবিধার্থে ফুটপাত উন্মুক্ত রাখার নির্দেশ দিয়েছিল হাইকোর্ট। এক যুগ আগে দেয়া ওই রায়ের বাস্তবায়ন নেই। রায় বাস্তবায়িত হলে শুধু জনগণ নয়, হকাররাও এর সুবিধা পেত। কারণ ফুটপাতের ‘দরিদ্র’ হকারদের সরকার ক্রমান্বয়ে পুনর্বাসন করতে পারে বলেও হাইকোর্ট রায়ে পর্যবেক্ষণ দিয়েছিলো।
সম্প্রতি নগরবাসীকে ফুট ওভারব্রিজ ও আন্ডারপাস ব্যবহারে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে পুলিশের পক্ষ থেকে পরিচালনা করা হয় ভ্রাম্যমাণ আদালত। ওভারব্রিজ ও আন্ডারপাস ব্যবহার না করে রাস্তা পার হওয়ায় নগরবাসীকে জরিমানার সম্মুখীন হতে হয়েছে। বেশ কিছু সামাজিক সংগঠনের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয় যে, ফুটপাত ও চলাচলের পথ পথচারীদের জন্য উন্মুক্ত না রেখেই এ ধরনের পদক্ষেপ নেয়া ঠিক হয়নি।
‘কার্যকর’ আইন থাকার পরও বারবার ফুটপাত অবৈধ দখলে চলে যাচ্ছে। এজন্য ফুটপাত ও চলাচলের পথ পথচারীদের জন্য উন্মুক্ত রাখার নির্দেশনা চেয়ে ২০০১ সালে জনস্বার্থে রিট আবেদন দায়ের করেছিলেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার ওমর সাদাত। এই রিটে বিবাদী করা হয়েছিলো গণপূর্ত সচিব, স্বরাষ্ট্র সচিব, ঢাকা সিটি করপোরেশনের মেয়র ও পুলিশের আইজির পাশাপাশি ঢাকার জেলা প্রশাসক, ঢাকা মহানগরীর সব থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি)। প্রাথমিক শুনানি নিয়ে হাইকোর্ট রুল জারি করে। রুলে ঢাকা সিটি ম্যানুয়াল-১৯৮২ এবং ঢাকা মেট্টোপলিটন পুলিশ অধ্যাদেশ ১৯৭৬ অনুসারে ব্যবস্থা নিতে বিবাদীদের কেন নির্দেশনা দেয়া হবে না- তা জানতে চাওয়া হয়। এই রুলের চূড়ান্ত শুনানি নিয়ে ২০০১ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি ‘জনস্বার্থে’ বেশ কিছু নির্দেশনা দেয় উচ্চ আদালত।
তত্কালীন বিচারপতি আবু সাঈদ আহাম্মেদ ও বিচারপতি খাদেমুল ইসলাম চৌধুরীর ডিভিশন বেঞ্চের ওই রায়ে বলা হয়, ঢাকা শহরে পথচারীদের ‘সহজ ও মুক্ত’ চলাচল নিশ্চিত করতে ‘স্পষ্ট ও কার্যকর’ আইন থাকলেও তা প্রয়োগের ক্ষেত্রে বিবাদীদের অবহেলা ও নিষ্ক্রিয়তায় তা বাস্তবায়ন হয়নি। আইনের মূলনীতিসমূহ সতর্কতা ও মনোযোগের সঙ্গে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে আমরা দেখতে পাচ্ছি, ফুটপাত ও মানুষের চলাচলের পথ দখলকারীদের বিরুদ্ধে বা রাস্তা, সড়ক, ফুটপাত ও চলচলের পথে নির্মাণ সামগ্রী ফেলে রাখা বা জমা করে রাখার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণে বিবাদীদের হাতে সন্দেহাতীতভাবে যথেষ্ট ক্ষমতা দেয়া হয়েছে; কিন্তু বর্ণিত দায়িত্ব ও আইনগত বাধ্যবাধকতা পালনে তাদের মধ্যে প্রমাণিত ব্যর্থতা দেখা যাচ্ছে।
রায়ে বলা হয়, ঢাকার ফুটপাত ও চলাচলের পথকে জনসাধারণের ব্যবহার এবং পথচারীদের জন্য অবশ্যই পরিচ্ছন্ন এবং উন্মুক্ত রাখতে হবে। অবৈধ স্থাপনা অপসারণে বিবাদীদের পরিকল্পিত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। সড়কের ফুটপাত ও চলাচলের পথে নির্মাণ সামগ্রী রাখা বন্ধ করতে হবে। এছাড়া ‘দরিদ্র’ হকারদের সরকার ক্রমান্বয়ে পুনর্বাসন করতে পারে বলেও রায়ে উল্লেখ করে আদালত; কিন্তু এই রায় বাস্তবায়িত না হওয়ার সুযোগ নিয়ে নগরীর বিভিন্ন স্থানে চলছে ফুটপাত দখলের প্রতিযোগিতা। এই প্রতিযোগিতায় কেউ লিপ্ত হচ্ছেন স্থানীয় প্রশাসনকে ম্যানেজ করে, আবার কেউ রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে। ফলে নগরবাসীর স্বার্থ দেখার যেন কেউ নেই; এমনই অভিযোগ তাদের।
এ প্রসঙ্গে আইন বিশেষজ্ঞরা বলেন, ফুটপাত দিয়ে চলাচল করতে গিয়ে নগরবাসী প্রতিনিয়তই প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হচ্ছেন। এই প্রতিবন্ধকতা নিরসনে হাইকোর্ট জনস্বার্থে রায় দিয়েছে; কিন্তু রায় ও নির্দেশনা বাস্তবায়িত না হয়ে তা ধোঁয়ায় মিলিয়ে যাচ্ছে। তারা মনে করেন, জনগণকে তার প্রাপ্য সাংবিধানিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা ঠিক নয়। তাই দ্রুত এসব রায় বাস্তবায়ন করা দরকার।