ঢাকার ঐতিহ্যবাহী মসজিদ

সুবর্ণ অতীত বিবর্ণ বর্তমান

আপডেট : ০৬ ডিসেম্বর ২০১৪, ০১:২২

হারিয়ে গেছে অনেকগুলো, সচেতনতার অভাবে বিকৃতি ঘটেছে অনেক স্থাপনার, সংরক্ষণে অব্যবস্থাপনা-অবহেলা, ইতিহাস জানানোর উদ্যোগ নেই

মসজিদটি নির্মিত হয় খ্রিষ্টীয় ১৭ শতকে। তখন এর চারপাশে ছিল বহির্দেয়াল। প্রবেশপথে ছিল একটি শিলালিপি। এখন দেয়াল বা শিলালিপির চিহ্নটি পর্যন্ত নেই। তবে সেই প্রবেশ পথের পাশে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের একটি উপড়ে ফেলা নোটিস স্ট্যান্ড হেলানো রয়েছে। এতে মসজিদের যেন কোন ক্ষতি করা না হয়, তা সর্বসাধারণের উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে। এ নোটিসে কোন কাজ হচ্ছে না। উপড়ে ফেলা নোটিস বোর্ডই সাক্ষ্য দেয় মসজিদটির সংরক্ষণে অযত্নের বিষয়টি। মসজিদের গা কালচে হয়ে গেছে দীর্ঘদিনের শেওলা জমে। দেয়ালের এখানে-ওখানে ধরেছে ফাটল। গম্বুজে ফাটল ধরে বৃষ্টির পানি পড়ে মসজিদের ভেতরে।
জাতীয় ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য এ স্থাপনাটি বাংলায় মোগল শাসনামলের অন্যতম নিদর্শন। এটি মুসা খাঁর মসজিদ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হল-শহীদুল্লাহ হল এলাকায় অবস্থিত। আগে যে মসজিদটি বাংলায় মোগল শাসনের সুবর্ণ ইতিহাসের সাক্ষ্য দিত, সেটি এখন রুগ্ন-জীর্ণ। শুধু মুসা খাঁর মসজিদ নয়, মসজিদের শহর ঢাকার অনেক ঐতিহ্যবাহী মসজিদই এখন জীর্ণ-শীর্ণ অবস্থায় টিকে আছে। বহু মসজিদ ধ্বংস হয়ে গেছে, হারিয়ে গেছে। কোন কোন মসজিদের জমি বেদখল হয়ে গেছে বা অবৈধ দখলের পায়তারা চলছে। মসজিদগুলোর স্থাপনাতো নয়ই, এসবের ইতিহাসও সংরক্ষণ করা হচ্ছে না ঠিকমতো।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর, ইসলামিক ফাউন্ডেশন সূত্র এবং বিভিন্ন শিলালিপি ও ইতিহাসের বই ঘেঁটে ঢাকার ঐতিহ্যবাহী মসজিদের তথ্য জানা যায়। ১৮৩২ সালে ঢাকার তখনকার ম্যাজিস্ট্রেট জর্জ হেনরি ওয়াল্টার এক প্রতিবেদনে সে সময় ঢাকায় ১৫৩টি মসজিদ থাকার কথা উল্লেখ করেন। বর্তমানে ঢাকায় কতটি মসজিদ রয়েছে তার সঠিক হিসাব নেই। তবে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তার মতে ঢাকায় বর্তমানে মসজিদ ১০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। সম্প্রতি এ প্রতিবেদক ঢাকার পুরনো মসজিদ ও সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলো সরেজমিন ঘুরে বেড়িয়েছেন। অনুসন্ধানে ঐতিহ্যবাহী মসজিদগুলোর কয়েকটির অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। অনেকগুলো বিকৃত ও পরিবর্তিত অবস্থায় টিকে আছে। কয়েকটি টিকে আছে গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্য সঙ্গী করেই। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই স্থানীয়রা জানে না মসজিদের ইতিহাস ও ঐতিহ্য। নয়টি মসজিদকে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ঢাকার ঐতিহ্য হিসেবে সংরক্ষণের তালিকাভুক্ত করেছে। এখন পর্যন্ত নোটিস ঝুলিয়ে দিয়েই তারা সংরক্ষণের দায়িত্ব সেরেছে। আবার কোনক্ষেত্রে সেই নোটিসও নেই।
এ প্রসঙ্গে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের ঢাকা অঞ্চলের পরিচালক রাখি রায় বলেন, ঢাকার সব পুরনো মসজিদ আমাদের সংরক্ষণের তালিকায় নেই। সংরক্ষণের চেষ্টা চলছে। তবে যেভাবে সংরক্ষণ করা দরকার সেভাবে করা হচ্ছে না। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই স্থানীয়রা মসজিদ সংস্কারের উদ্যোগ নেন। তাদেরকে আদি নকশা অনুসরণ করে সংস্কার করতে বললেও অনেক ক্ষেত্রে তা মানা হয় না। আবার প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর মসজিদগুলোর দায়িত্ব নেয়ার আগেই তার আদি নকশা ধ্বংস বা নষ্ট হয়েছে। তবে এখন সংরক্ষণ ও সংস্কার কাজে গতি এসেছে। 
এ প্রসঙ্গে জাতীয় আর্কাইভসের সাবেক পরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক শরিফ উল্লাহ ভুঁঁইয়া বলেন, ঢাকার মসজিদগুলোর আমাদের ইতিহাস নির্মাণের গুরুত্বপূর্ণ উত্স। দুঃখজনকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এ স্মৃতিচিহ্ন-মসজিদগুলো সংরক্ষণে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি।
ঢাকার পুরাকীর্তি বিষয়ে বিশেষজ্ঞ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপক ড. আয়শা বেগম বলেন, ঢাকা শহরের আনাচে-কানাচে মোঘল-প্রাক মোগল-সুলতানি আমলের মসজিদ ছড়িয়ে রয়েছে। ধীরে ধীরে এগুলোর ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি দেখা দিয়েছে। ফলে জরাজীর্ণ হয়ে গেছে অনেক মসজিদ। ঐতিহ্য সংরক্ষণে অসচেতনতা এবং অবহেলার কারণেই এমনটি হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
জীর্ণ মুসা খাঁর মসজিদ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হল প্রাঙ্গণে শহীদুল্লাহ হলের উত্তর-পশ্চিম কোণে মুসা খাঁর মসজিদ নির্মিত হয় আনুমানিক ১৬৭৯ সালে। একটি উঁচু প্লাটফর্মের উপর নির্মিত মসজিদটির নিচতলায় কয়েকটি কক্ষ রয়েছে। এগুলোতে আগে মসজিদ সংশ্লিষ্টরা বাস করলেও এর সবগুলোই এখন পরিত্যক্ত। তিন গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদটির একটি গম্বুজে বড় ফাটল দেখা দিয়েছে। ঐ ফাটল দিয়ে গত বর্ষায় বৃষ্টির পানি মসজিদের ভিতরে পড়েছে বলে জানিয়েছেন মুসল্লিরা। মসজিদের পশ্চিম ও পূর্ব প্রাচীর প্রায় ৬ ফুট পুরু। উত্তর ও দক্ষিণ প্রাচীর ৪ ফুট পুরু। চার দেয়াল, ছাদ এবং গম্বুজ— সবকিছুতেই দীর্ঘদিন ধরে শেওলা জমে কালচে হয়ে গেছে। মসজিদের দুই মূল স্তম্ভে বড় ধরনের ভাঙন সৃষ্টি হয়েছে।
ইতিহাসবিদ আহমদ হাসান দানীর ‘ঢাকা:অ্যা রেকর্ড অব ইটস চেঞ্জিং ফরচুনস’ গ্রন্থে উল্লেখিত বর্ণনামতে, মসজিদটি মুসা খাঁর নামে হলেও স্থাপত্যশৈলী অনুযায়ী এটি শায়েস্তা খাঁর আমলে বা তারপরে নির্মিত হয়েছিল। মুসা খাঁ ছিলেন বাংলার বার ভুঁইয়াদের নেতা ঈসা খাঁর (মৃত্যু ১৫৯৯) পুত্র।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের ঢাকা অঞ্চলের পরিচালক রাখি রায় বলেন, মসজিদটি জীর্ণ অবস্থায় রয়েছে, এতে কোন সন্দেহ নেই। আসলে এর সংরক্ষণ ও সংস্কার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় না অধিদপ্তর করবে, এ নিয়ে দোদুল্যমনতা ছিল। এখন সেটি কেটে গেছে। শিগগিরই এর সংরক্ষণ ও সংস্কার কাজ শুরু হবে।
নামই হারিয়ে ফেলেছে মান্ডা মসজিদ
ঢাকার মুগদা থানায় মান্ডা ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডে অবস্থিত মান্ডা মসজিদ। ইতিহাসে এটি মান্ড্রা মসজিদ নামেই খ্যাত। ড. আবদুল করিমের ‘মোগল রাজধানী ঢাকা’ বইয়ে এ মসজিদের বর্ণনা রয়েছে। ঢাকার স্থাপত্য বিষয়ক গ্রন্থ প্রণয়ন কমিটির মতে, এটিই ইতিহাস বিখ্যাত মান্ডা মসজিদ। মসজিদের শিলালিপি অনুযায়ী মসজিদটি ১৪৩৩ সালের জানুয়ারিতে নির্মিত হয়েছিল। এটি তার আদি আকৃতিতে এখন আর নেই। হারিয়ে গেছে গম্বুজও। স্থানীয়ভাবে মসজিদটি এখন নান্দু বেপারী মসজিদ নামে পরিচিত। আহমদ হাসান দানী ও আবদুল করিমের মতে, বিলুপ্ত দোলাই নদীর তীরে ছিল মান্ডার অবস্থান। সুলতানি ও মোগল আমলে দোলাই নদী ছিল ঢাকার অন্যতম প্রধান নৌপথ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপক ড. হাবিবা খাতুনের ডক্টরাল থিসিসে এ মসজিদের বর্ণনা আছে। তিনি জানান, ১৯৮২ সালে তিনি মসজিদটি প্রথম পরিদর্শন করেন। তখন মসজিদের স্থাপত্যশৈলী দেখে তিনি নিশ্চিত হয়েছিলেন, এটি সুলতানি আমলের মসজিদ। মসজিদটিতে আগে গম্বুজ ছিল। গম্বুজ ভেঙে পড়লেও মসজিদে সুলতানি আমলের আদি কাঠামোর অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল।
নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে নসওয়াল গলি মসজিদ
আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া লিখিত ‘বাংলাদেশের প্রত্ন সম্পদ’ গ্রন্থপাঠে জানা যায়, ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের পশ্চিম দিকে প্রাচীন গিরদী-কিলা এলাকায় নসওয়াল গলি নামক রাস্তায় একটি প্রাচীন তোরণ ও মসজিদ ছিল। বর্তমানে এ সবের কিছুই নেই। ঐ স্থানে গড়ে উঠেছে স্থানীয়দের বাড়ি ও দোকানপাট। এলাকাবাসীর সাথে কথা বলে জানা গেল, মসজিদের কথা তারা জানেন না। তবে প্রবীণ একজন জানালেন, মসজিদ থাকার কথা তিনি শুনেছেন, তবে দেখেননি। নসওয়াল গলি মসজিদের শিলালিপির অনুলিপি জাতীয় আর্কাইভসে সংরক্ষিত রয়েছে। মূল শিলালিপিটি ছিল ঢাকা জেলা প্রশাসকের অফিসে। শিলালিপির বর্ণনা অনুযায়ী ১৪৫৯ সালে মসজিদ ও তোরণটি নির্মিত হয়েছিল।
বিনত বিবির মসজিদ
পুরান ঢাকার নারিন্দায় অবস্থিত দুই গম্বুজ বিশিষ্ট বিনত বিবির মসজিদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৪৫৬ সালে। পশ্চিম দিকের দেয়াল ও মিম্বর এবং দক্ষিণ দিকের দেয়াল ভেঙ্গে মসজিদটি সম্প্রসারণ ও বহুতল করা হয়েছে। এর আদি কাঠামো সংরক্ষণে যত্ন নেই। অনেক স্থানেই পলেস্তারা খসে পড়ছে। ফাটল ধরেছে গম্বুজসহ দেয়ালের বিভিন্ন স্থানে।
মসজিদের গায়ে কালো পাথরে অঙ্কিত শিলালিপি অনুযায়ী, জনৈক মরহমতের মেয়ে মোসাম্মত্ বখত বিনত নামে একজন নারী মসজিদটি নির্মাণ করেন। বর্তমানে একটি পঞ্চায়েত কমিটি মসজিদটি পরিচালনা করছেন। কমিটির বর্ণনা অনুযায়ী, আরাকান আলী নামক এক সওদাগর তত্কালীন ঢাকায় বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে বসবাস শুরু করেন। সওদাগরদের এ সময় নামাজ পড়তে অসুবিধা হতো বিধায় আরাকান আলী এখানে একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। এখানে বসবাসকালীন আরাকান আলীর মেয়ে বিনত বিবির আকস্মিক মৃত্যু ঘটে। তাকে মসজিদের পাশেই সমাধিস্থ করা হয়। এর ঠিক ছয় মাস পরই আরাকান আলী মারা যান। তাকেও বিনত বিবির কবরের পাশে সমাধিস্থ করা হয়। পরবর্তী সময়ে বিনত বিবির নামে এ মসজিদটির নামকরণ করা হয়। বাংলা ১৩৩৭ সালে (১৯৩০ খ্রিষ্টাব্দ) মসজিদটির দ্বিতীয় সংস্কার করা হয়। তখনই দ্বিতীয় গুম্বুজটি স্থাপন করা হয়। ওই সময় মসজিদের পূর্ব দিকের দেয়াল ঘেঁষে একটি বারান্দাও সংযুক্ত করা হয়। ফলে ঢাকা পড়ে গেছে আদি মসজিদের দেয়াল।
জমি বেহাত হচ্ছে হায়াত বেপারী জামে মসজিদের
নারিন্দার ঋষিকেষ দাস রোডে ১৬৬৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় হায়াত বেপারী জামে মসজিদ। বর্তমানে মসজিদের আদি ভবন নেই। আদিতে একটি গম্বুজ থাকলেও সেটি নেই। আগের ভবন ভেঙ্গে বহুতল মসজিদ করা হয়েছে। মসজিদের সামনে নিচতলায় স্থাপন করা হয়েছে দোকানপাট। মসজিদের অধিকাংশ জমিই বেহাত হয়ে গেছে। এমনকি মামলা দিয়ে ও প্রভাব খাটিয়ে অযুখানাও বন্ধ করে দিয়েছেন একজন স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যবসায়ী। মুনশী রহমান আলী তায়েশের ‘তাওয়ারিখে ঢাকা’ গ্রন্থ এবং পুরনো দলিল-পত্র সূত্রে জানা যায়, মসজিদটি নির্মাণ করেন সওদাগর হায়াত বেপারী। তিনি নারিন্দা পুলও তৈরি করেন। এ মসজিদের জন্য তখনকার সুবেদার ১০০ বিঘা জমি দিয়েছিলেন।
মসজিদে মুফতী-এ আযম
সুত্রাপুর থানার কুলুটোলায় মসজিদে মুফতী-এ আযম অবস্থিত। মসজিদের দেয়াল স্থাপিত ফার্সি ভাষায় লিখিত শিলালিপি থেকে জানা যায়, মসজিদটি ১২৩২ হিজরী বা ১৮১২ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত করা হয়। আদিতে এটি এক গম্বুজ বিশিষ্ট থাকলেও বর্তমানে আদি ভবন নেই। মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি সাইয়্যেদ মুহাম্মাদ ঈয়ামান জানান, ১৯৪৭ পরবর্তী সময়ে হিন্দু মুসলিম দাঙ্গায় মসজিদে মুফতী-এ আযম ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর আদিভবন প্রায় ধ্বংস হয়ে যায়। দেশ বিভাগের পর মুফতী-এ আযম সাইয়্যেদ মুহাম্মদ আমীমুল ইহসান বারকাতী (রহ.) কলকাতা থেকে ঢাকায় আসেন। পরবর্তী সময়ে তিনি ছোট ভাই মুহাম্মদ নোমান বারকাতীকে (রহ.) সাথে নিয়ে মসজিদটি পুনর্নির্মাণ করেন। বর্তমানে বহুতল মসজিদটি নিচতলায় সাইয়্যেদ মুহাম্মদ আমীমুল ইহসান বারকাতীর মাজার রয়েছে।
চুড়িহাট্টা মসজিদ
চকবাজারের পশ্চিম দিকে চুড়িহাট্টা মসজিদ অবস্থিত। মসজিদের শিলালিপি অনুযায়ী, ১৬৪৯ সালে বাংলার সুবাদার শাহ সুজার কর্মচারী মোহাম্মদ বেগ মসজিদটি নির্মাণ করেন। আদিতে এর উপরের ছাদ ছিল চৌচালা ঘরের মত। পূর্ব দেয়ালে ছিল তিনটি দরজা। কয়েকদফা সংস্কারের পর এটি আর আদি রূপে নেই। বর্তমান মসজিদের দোতলার মেহরাবে আদি মসজিদের স্মৃতি ফলক স্থাপন করা হয়েছে।
হাজী বেগের মসজিদ
মসজিদটি রাজধানীর পলাশী এলাকায় ১৬৮৩ সালে নির্মিত হয়। আদি ভবনটি এখনও টিকে থাকলেও বিভিন্ন সময়ের সংস্কার কাজে এর ভিতরের ও বাইরের নকশায় পরিবর্তন এসেছে। মসজিদের ভিতরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নিহত একজন সেনা কর্মকর্তার মাজার রয়েছে। মসজিদের সম্প্রসারণ ও বহুতল করতে গিয়ে আদি স্থাপত্য নকশায়ও পরিবর্তন এসেছে। এর কিছু জমি নিয়েও মামলা চলছে।
শায়েস্তা খাঁর মসজিদ
মিটফোর্ড হাসপাতালের পিছনে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে মসজিদটি অবস্থিত। মসজিদের প্রাচীন শিলালিপি থেকে এর নির্দিষ্ট নির্মাণ তারিখ পাঠোদ্ধার করতে পারেননি ঐতিহাসিকরা। বাংলাপিডিয়ার বর্ণনা মতে, শায়েস্তা খানের প্রথম সুবাহদারি কালে (১৬৬৩-৭৮) মসজিদটি নির্মিত হয়। ব্রিটিশ শাসনামলে বিশ শতকের প্রথম দিকে মসজিদটি অগ্নিকাণ্ডে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে এটি পুনর্নির্মাণ করা হয়। নতুন বারান্দা সংযুক্ত করা হয়। এ মসজিদের ভূমি নকশা ঠিক থাকলেও আদি কাঠামোতে পরিবর্তন এসেছে। অভ্যন্তরীণ ও বহির্ভাগের বিভিন্ন নকশাও মুছে গেছে। কয়েকবছর আগে মসজিদটি রং করা হলেও এর আদি রংয়ের বিষয়টি গুরুত্ব পায়নি।
চকবাজার শাহী মসজিদ
চকবাজার শাহী মসজিদ ১৬৭৬ সালে বাংলার সুবেদার শায়েস্তা খাঁ নির্মাণ করেন। বর্তমানে এটি অনেক বড় আকার ধারণ করেছে। পশ্চিম দিকে এটি সম্প্রসারণের উদ্দেশ্যে নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছে। কয়েকদফায় সম্প্রসারণে মসজিদের আদি রূপের পরিবর্তন হয়েছে। এটি ১০ ফুট উঁচু একটি প্লাটফর্মের উপর নির্মিত হয়। আয়তন ছিল ৫৩ বাই ২৬ ফুট। প্লাটফর্মের কক্ষগুলো দোকান হিসেবে ভাড়া দেয়া হত। আদিতে মসজিদটি তিনটি গম্বুজবিশিষ্ট ছিল। পরে আরো কয়েকটি গম্বুজ ও দুইটি মিনার সংযুক্ত হয়েছে। বর্তমান মসজিদটি পশ্চিমদিকে সম্প্রসারিত হচ্ছে। মসজিদের আদি দেয়াল ও মিম্বর যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেজন্য সংশ্লিষ্টদের সচেতন থাকার আহবান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
বেগম বাজার জামে মসজিদ
চকবাজারের পূর্বদিকে ও মৌলভীবাজারের উত্তরদিকে বেগমবাজার রাস্তার মোড়ে মসজিদটি অবস্থিত। ৫ গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদের পূর্ব দেয়ালে ছিল ৫টি প্রবেশপথ। পথগুলোর পাশে ছিল ছোট মিনার। আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়ার ‘বাঙলাদেশের প্রত্নসম্পদ’ বইয়ের বর্ণনা মতে, মুর্শিদ কুলী খান ১৭০০ থেকে ১৭০৪ সালে ঢাকায় অবস্থানকালে মসজিদটি নির্মাণ করেন। মসজিদের আদি ভবনের বাইরে ও ভিতরে নতুন পলেস্তারা করা হয়েছে। এতে আদি স্থাপত্যকৌশল অনুসরণ করা হয়নি। ফলে দেয়ালের আগের নকশা-শৈলি নষ্ট হয়ে গেছে।
অব্যবস্থাপনায় আরো মসজিদ
মোগল, প্রাক মোগল, সুলতানি আমলের মসজিদগুলো নগরীর অলঙ্কার। অসচেতনতা ও অযত্নের কারণে মসজিদগুলো নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কয়েকটি ব্যতিক্রম বাদে মসজিগুলোতে স্থাপনা সম্পর্কে কোন বর্ণনা নেই। তাই নতুন প্রজন্ম ও মুসল্লিরা জানেন না মসজিদের আদি ইতিহাস। এক্ষেত্রে আরমানিটোলার তারা মসজিদের সংরক্ষণ ব্যবস্থা উদাহরণ তৈরি করতে পারে। আদি স্থাপত্য সঠিক গুরুত্ব পাচ্ছে না এবং অবকাঠামোতে পরিবর্তন এসেছে ঢাকায় অবস্থিত এমন মসজিদগুলোর মধ্যে রয়েছে তিন নেতার মাজারের পেছনে খাজা শাহাবাজের মসজিদ, মোহাম্মদপুরের সাত গম্বুজ মসজিদ, লালবাগ কেল্লা সন্নিহিত লালবাগ শাহী মসজিদ, আতিসখানা এলাকায় খান মোহাম্মদ মৃধার মসজিদ, বাংলাবাজার প্যারিদাস রোডের সিতারা বেগম মসজিদ,  নীলক্ষেত এলাকায় মরিয়ম সালেহ মসজিদ,  বাহাদুর শাহ পার্কেও নান্নী বিবি মসজিদ, আরমানিটোলার হিন্দা বিবি মসজিদ, ইসলামপুরের জব্বু খানম মসজিদ।
ঐতিহ্য জানে না প্রজন্ম
ঐতিহ্যবাহী মসজিদগুলোতে নিয়মিত নামাজ আদায় করলেও এসবের ঐতিহ্য ও ইতিহাস সম্পর্কে জানেন না মুসল্লি ও নতুন প্রজন্মের নাগরিকরা। কোন মসজিদেই তার ঐতিহাসিক তথ্য সংরক্ষিত ও প্রকাশ্য নেই।

এ প্রসঙ্গে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের ডেপুটি পরিচালক (প্রকাশনা) এবং ঢাকা অঞ্চলের সদ্য বিদায়ী পরিচালক ড. মো. আতাউর রহমান বলেন, ঢাকার ঐতিহ্যবাহী মসজিদগুলোসহ বিভিন্ন স্থাপনা সংরক্ষণের বিষয়ে একটি গেজেট শিগগির প্রকাশ হবে। মসজিদগুলোতেও সেগুলোর নির্মাণ ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে বর্ণনা সম্বলিত পত্র সরবরাহের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এটিও দ্রুতই বাস্তবায়িত হবে।